পিআর কোনো জাদুর কাঠি নয়
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০৫ অপরাহ্ণ

তাইয়িব আহমেদঃ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার সেই পুরোনো বিতর্ক সামনে এসেছে , পরবর্তী নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হবে। এই বিতর্কের মূল কেন্দ্র হলো সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর ব্যবস্থা। ভোটাধিকার প্রয়োগের চেয়ে বরং এ নিয়েই বেশি আলোচনা করছে, ব্যালট যখন শেষ পর্যন্ত কাস্ট করা হবে, তখন কে লাভবান হবে আর কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু ইসলামপন্থী দল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে পিআরের জন্য তাদের দাবি আবার জোরালো করেছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বরাবরের মতোই সন্দিহান, এ দাবি সংস্কারের চেয়ে বরং জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার একটি সুবিধাজনক অজুহাত হিসেবে দেখছে।
বিজ্ঞাপন
মজার বিষয় হলো, এতসব কোলাহলের মধ্যে কোন দল কি ধরনের পিআর মডেল চায় তার সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি। সম্প্রতি এক সমাবেশে জামায়াত নেতৃত্ব পিআরকে বাংলাদেশের সব সমস্যার এক মিরাকল সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছে : এমন একটি ব্যবস্থা, যা কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং স্বৈরাচারকে দূর করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
জামায়াত তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ঘোষণা করেছে, ‘যারা এর বিরোধিতা করে, তারা জনগণের বিরুদ্ধে।’ তাদের এই দাবিকে একটি জনপ্রিয়তাবাদী মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বাগাড়ম্বর লোভনীয়, তবে এটি রাজনৈতিক বিজ্ঞানের চেয়ে বরং আশাবাদী চিন্তাভাবনার (wishful thinking) একটি ইশতেহারের মতো শোনাচ্ছে।
ইতিহাস কিন্তু ভিন্নকথা বলে। পিআরের স্থপতিরা এটিকে স্বৈরাচারের প্রতিষেধক হিসেবে ডিজাইন করেননি; তারা এটিকে ডিজাইন করেছিলেন প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য, বিভিন্ন কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার জন্য, যাতে সংসদগুলো তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সমাজের মতোই দেখতে হয়।
১৯৯১ সালে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউতে রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আন্দ্রে ব্লেইস লিখেছিলেন, ‘সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রধান গুণ হলো একটি বিস্তৃত এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব।’ আরেকজন পণ্ডিত, ক্যাম্পবেল শারম্যান, আরো সরাসরি বলেছেন, পিআর এই নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি যে, ‘বৈচিত্র্যকে অবশ্যই প্রতিনিধিত্বমূলক পরিষদে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে হবে।’
সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আসল ভিত্তি এটাই : এটি রাজনৈতিক পচনের কোনো নিরাময় নয়, বরং বহুত্ববাদ নিশ্চিত করে, জেরিমান্ডারিংয়ের বিকৃতিকে সীমিত করে এবং ছোট কণ্ঠস্বরগুলোকেও যাতে ডুবিয়ে দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষাব্যবস্থা। একে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একটি সিলভার বুলেট হিসেবে ভুল বোঝা মানে হলো, এই হাতিয়ার এবং রোগ—উভয়কেই ভুল বোঝা।
সূক্ষ্মতা অনুধাবন
এর মূল উদ্দেশ্য প্রতিনিধিত্বকে সর্বোচ্চ করা ছাড়া সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের তৃতীয় কোনো কাজ নেই। অবশ্যই, এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে, সেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো প্রায়ই বিপজ্জনক রূপ নেয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে সেগুলোর তালিকা তৈরি করেছেন । এরমধ্যে রয়েছে অস্থিতিশীল জোট সরকার, ছোট উগ্রপন্থি দলগুলোর হাতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষমতা চলে যাওয়া, জবাবদিহির দুর্বলতা, অতিরিক্ত জটিল ব্যালট এবং পর্দার আড়াল থেকে সিস্টেমের মধ্যে কারসাজি করে ‘কিংমেকারদের’ উত্থান। অন্য কথায়, পিআর কোনো জাদুর কাঠি নয়।
প্রকৃতপক্ষে, পিআর এমন একটি ব্যবস্থা, যা পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত, যা এর জটিলতাগুলো মোকাবিলা করতে পারে।
তাহলে কেন বাংলাদেশের মতো একটি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামো এই ঝুঁকিগুলো গ্রহণ করবে? আমরা ঠিক কী লাভ করব? কঠোর সত্য হলো : কিছুই না, আরো খারাপ।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শাসনের সমস্যা হলো প্রতিনিধিত্বের অভাব নয়, বরং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। নির্বাচন যেভাবে হোক না কেন, সংসদগুলো ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
কোনো পিআরব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে ক্ষমতা সংহত করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। এমনকি ভারসাম্যপূর্ণ আমেরিকান ব্যবস্থাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বৈরাচারী মনোভাব ও কাজগুলো আটকাতে পারেনি। সমস্যা নির্বাচনি গণিত নয়; সমস্যা হলো শক্তিশালী, স্বাধীন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর অনুপস্থিতি, যা নির্বাহী ক্ষমতার বাড়াবাড়ি রোধ করতে পারে।
মূল সমস্যা চিহ্নিতকরণ
পিআরের সমর্থকরা দাবি করেন, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করবে। বাস্তবে, এটি এর উল্টোটা করার ঝুঁকি তৈরি করে—দলগুলো আরো বেশি অগণতান্ত্রিক মেশিনে পরিণত করবে।
যদি আজ মনোনয়নগুলো পণ্যের মতো লেনদেন হয়, তবে আগামীকাল পুরো সংসদীয় আসন বিক্রি হবে। দলগুলোকে পিআর দিয়ে আটকানো যাবে না; বরং তারা আরো বেপরোয়া এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
পিআর বাংলাদেশের ভোটকেন্দ্র দখলের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিকেও নিরাময় করবে না। এ ধারণা রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে ভেঙে পড়ে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি—উভয়ই আদর্শিক সংগঠনের চেয়ে বরং অর্থনৈতিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে গঠিত পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। নেতা এবং কর্মীরা কোনো আদর্শ দিয়ে নয়, বরং তার রাজনীতি করে টাকা ও ক্ষমতাচর্চার জন্য । এমন কাঠামোতে, ভোটকেন্দ্র দখল কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং রাজনীতির প্রাণশক্তি। পিআর এই সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে পারে—এমনটা ভাবা একটি বড় ভুল হবে।
এই ব্যবস্থা যতটুকু জবাবদিহি অবশিষ্ট আছে, সেটুকুও কমিয়ে দেবে। বর্তমান মডেলে, স্থানীয় প্রতিনিধিদের অন্তত পাঁচ বছর পরপর তাদের ভোটারদের মুখোমুখি হতে হয়। একটি পিআরব্যবস্থা সেই সংযোগকে ঝাপসা করে দেয়, জনগণের পরিবর্তে দলকে প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্রে রাখে। এটি গণতন্ত্রের দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং আরো একধাপ পিছিয়ে যাওয়া। এছাড়া, পিআর একটি জটিল ব্যবস্থা, যা উচ্চ সাক্ষরতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানযুক্ত সমাজে সফল হয়।
জার্নাল অব গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘানার ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টব্যবস্থা তুলনামূলক সফল হয়েছে, কারণ এটি মূলত নিরক্ষর ভোটারদের মধ্যে পরিচালনা করা সহজ ছিল। বাংলাদেশও এর থেকে আলাদা নয়। রাজনৈতিক সাক্ষরতার অভাবযুক্ত একটি দেশের জন্য ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টব্যবস্থা ব্যাপক গ্রহণযোগ্য এবং সহজে বোঝা যায় এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
এটিকে পিআর দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে বিশাল নতুন সম্পদের প্রয়োজন হবে—বর্ধিত সংসদীয় কক্ষ, নতুন আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, কর্মকর্তা এবং ভোটারদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি—তবে এর সমর্থকরা যে গণতান্ত্রিক সুফলের প্রতিশ্রুতি দেয়, তা পাওয়া যাবে না।
সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ নয় যে বিলাসিতা বহন করতে পারে। এটিকে দুটি স্ফীত সংসদ এবং ৫ শতাধিক সদস্যের বোঝা চাপানো অনেকটা গরিবের হাতি পালার মতো। আমরা যদি কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে সত্যিই সিরিয়াস হই, তবে অন্তত উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলি। আবার যদি পিআরই করি, তাইলে আমাদের ৩০০ আসনের কেন দরকার পড়বে। এটা তো পার্টি বেইজড সিস্টেমই হলো। তাহলে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই তো যথেষ্ট, তাহলে তাদের কেন জনগণ বেতন দিয়ে পালবে। তাহলে ১০০ আসনের দাবি তোলেন। রাষ্ট্রের অনেক খরচ কমে যায়। এমনকি বাংলাদেশের জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টরই দরকার নেই। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশ ৫০০ থেকে ৬০০ এমপিকে পালন করা সংগত নয়।
আমেরিকান মডেলটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ভারসাম্যের জন্য একটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরা হয়। শুধু দুটি কক্ষ থাকা নয়, বরং নির্বাচন স্ট্যাগার্ড ভিত্তিতে হয় বলে কোনো একক দল একবারে সব আসন দখল করতে পারে না, যা শাসনব্যবস্থাকে জনপ্রিয়তাবাদী ঢেউয়ের অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে।
যদি বাংলাদেশকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পথ অনুসরণ করতেই হয়, তবে তা এ ধরনেরই হওয়া উচিত, এমন অর্ধ পদক্ষেপ নিয়ে নয়, যা আমাদের সরকারি দলকে কে আরো মজবুত করবে।
একটি নিম্নকক্ষ—১০০ থেকে ১৫০ সদস্যের—পিআর বা পিআর-এসটিভি ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচিত হতে পারে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীও তাদের পাশাপাশি নির্বাচিত হবেন। আইনপ্রণয়নের ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে এই কক্ষের হাতে থাকবে।
অন্যদিকে, উচ্চকক্ষটি রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতার ওপরে নয়, বরং ভূগোলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে : প্রতিটি জেলা থেকে দুজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, যারা দুই বা আড়াই বছর পর চক্রে নির্বাচিত হবেন, যা মার্কিন সিনেটের মতো হবে, যাতে করে একটি একক নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো আইনসভার ভাগ্য নির্ধারণ করতে বাধা দেয়।
এমন একটি ব্যবস্থা সরকারি দল এবং বিরোধী দলের বেঞ্চের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে, বিশেষ করে যদি সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রস করার অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এটি মেরামত করতে হলে আমাদের অবশ্যই স্বাধীন, নির্বাচিত নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। এমন একটি নির্বাচন কমিশন, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে জবাবদিহি করে না। এই নির্বাচিত নির্বাচন কমিশনও স্ট্যাগার্ড ভিত্তিতে হতে হবে, যাতে সব নির্বাচন কমিশনার একই দলের না হয়ে যায়। এ রকম করা সম্ভব হলে আমাদের আর কেয়ারটেকার সরকারের দরকার হবে না এবং প্রত্যেকবার নির্বাচনের আগে এই কেয়ারটেকার সরকার গঠন নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে না।
এর পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সংস্কারকে টেকসই করতে হলে আমাদের একটি সাংবিধানিক মিডিয়া কমিশনও তৈরি করতে হবে, যা রাষ্ট্রের দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ থেকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে ।
লেখক : সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরেডো স্টেইট ইউনিভার্সিটিতে সংবাদের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে ডক্টোরাল ক্যান্ডিডেট।






