ঘামে ভেজা রেমিট্যান্সের অন্তরালে লুকানো অশ্রুর গল্প
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৫:৫২ অপরাহ্ণ

ফারজানা মৃদুলা:
স্বপ্নের দেশ নয়, সংগ্রামের মাটি
প্রবাসীর অজানা গল্প কজনই বা জানি।
তারা যায় ঘর ছেড়ে, শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের মুখে একচিলতে হাসি ফোটানোর জন্য। কেউ যায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে, কেউ যায় সুদের টাকায় ঋণ মাথায় নিয়ে। গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রোদ, অচেনা ভাষা, অমানবিক পরিশ্রম।
দেশে যাদের বলে প্রবাসী ভাই বা বোন তাদের অনেকেই বিদেশের মাটিতে নীরবে গিলে নেয় চোখের পানি আর হতাশার ঢেকুর। শুকনো রুটি মুখে দিয়ে ভিডিও কলে বলে “ভালো আছি, চিন্তা কইরো না।”
কিন্তু পরিবারের কিছু সদস্য তখন হিসাব করতে ব্যস্ত কে কত টাকা পাঠালো, কখন জমি কিনবে, কার বিয়েতে কত খরচ দিলো।
প্রবাসীর ঘাম তখন হয়ে যায় সম্পদের প্রতিযোগিতা। স্বামী, ভাই, বাবা তার আত্মীয়তা তখন মাপা হয় কত টাকা পাঠাচ্ছে, কত ঘর তুললো, কারে কী দিয়ে দিলো। অথচ কেউ ভাবে না, দিন শেষে একাকিত্বে জর্জরিত মানুষটা কেমন আছে!
একটা দিন ছুটি পেলে সারাদিন ঘুমায়, ক্লান্ত শরীরে বুক চাপা কষ্ট নিয়ে। হাতের তালু ফাটে, কিন্তু ছবি আসে স্যুটেড-বুটেড, ফিটফাট হাসিমাখা মুখে কারণ ওটাই পরিবার চায় দেখতে।
আর সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত?
প্রাণ হারালে কেউ লাশটাও আনতে চায় না।
কারণ তখন যে বেতনটা বন্ধ হয়ে যাবে…!
প্রবাস জীবন মানেই সোনালি ভবিষ্যৎ নয়, বরং শেকড় বিচ্ছিন্ন এক বেদনার অধ্যায়। এই মানুষগুলোর কষ্ট আমাদের সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্র, কেউই ঠিকমতো বোঝে না। আমরা শুধু দাবি করি, ভাগ বসাতে চাই, অথচ তাদের একাকিত্বে পাশে দাঁড়াই না।
তারা শুধু অর্থ প্রেরণকারী নয়, তারা হলো জীবন্ত ইতিহাস, ত্যাগ আর ভালোবাসার প্রতিমূর্তি। তাদের সম্মান দিন, বোঝার চেষ্টা করুন কারণ, একটা পরিবারের হাসির পেছনে হয়তো এক প্রবাসীর হাজারটা অশ্রু লুকানো।
প্রবাস শব্দটা আমাদের কাছে গর্বের, অথচ যাঁরা এর ভিতরে আছেন, তাদের কাছে এটা এক বিষাদের নাম। এক সময় যারা ঈদে বাড়ি আসত, দৌড়ে মায়ের কোলে মুখ রাখত, পিঠা-পুলির গন্ধে শীত কাটাত
আজ তারা অনেকেই আর ফেরে না।
সময় নেই? না, আসলে সম্ভব নেই।
চাকরির ভয়, ছুটির সংকট, টিকিটের দাম, আর পারিবারিক চাহিদার বিশাল চাপের নিচে তারা মাটিতে গেঁথে থাকে।
ঈদের নামাজ শেষে কান্না চেপে ফোন করে বলে, সবাই ভালো থাকো, আমার জন্য দোয়া কইরো
শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে হাহাকার, যে হাহাকারে শামিল হয় বুকফাটা লুকানো চাপাকান্নায়।
পরিশেষে বলা, প্রবাসীরা আমাদের দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তারা অর্থ পাঠায় ঠিকই, কিন্তু এর চেয়েও বেশি পাঠায় বেদনা, বিসর্জন, আত্মত্যাগ। যাদের ঘামে ভিজে দেশের অর্থনীতি সচল, তাদের চোখের জল কখনো কি হিসাব রাখে কেউ? প্রবাসীদের গল্প শুধু টাকা-পয়সার নয়, ওটা হারিয়ে যাওয়া শৈশবের, দূরে ফেলে আসা সংসারের, বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিজেকে হারিয়ে ফেলার এক নীরব লড়াইয়ের নাম।
তারা শুধু রেমিট্যান্স নয়, ভালোবাসাও পাঠাতে চায়
আমরা কি সেই ভালোবাসা গ্রহণে প্রস্তুত?
চলুন, তাদের সম্মান করি কেবল অর্থ রোজগারের জন্য নয়, বরং মানুষ হিসেবে তাদের গল্পটা বুঝে, পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বলি তুমি মানুষ হিসেবে অনেক বড়, তোমার কষ্ট আমি বুঝি। এইটুকুই কৃতজ্ঞতা, এইটুকুই মানবতা। এইটুকুই তাদের একাকিত্বে একটু সান্ত্বনা। এইটুকু মানবিকতা বদলে দিতে পারে একজন প্রবাসীর মন। তাদের পাশে থাকি, সম্মান করি, অন্তত একজন মানুষ হিসেবে ।
লেখক: সঞ্চালক ও কলামিস্ট






