বৃষ্টি মাসুদ যেন শব্দের আকাশে এক উজ্জ্বল তারা
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ আগস্ট ২০২৫, ২:২৯ অপরাহ্ণ
জৈষ্ঠ্য-আষাঢ়ের এক দুপুরে, আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি আর হাওয়ার দমকা ঝড়। ছোট ভাইয়ের হাত ধরে ছুটে যায় বাড়ির পেছনের আমবাগানে। চারদিক ভিজে একাকার, গাছ থেকে ঝরে পড়ছে টসটসে আম! চোখ-মুখে তখন আনন্দের ঝিলিক, যেন ছোট এক যুদ্ধ জয় করেছে আজকের গল্পের নায়িকা। ভিজে কাপড়, কাঁপতে থাকা শরীর আর কাদা মাখা পা নিয়ে বাড়ি ফেরা। আর বাড়িতে ফিরেই সেই বিজয়ের পুরস্কার ছিল দারুণ এক ধোলাই! তবু সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের স্মৃতি আজও হাসি ফোটায় কবি বৃষ্টি মাসুদের মুখে। সবচেয়ে মজার ছিলো, কুড়ানো সেই আম দিয়েই আচার বানিয়েছিলেন বৃষ্টির মা ।
বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা কেটেছে দেশের নানা প্রান্তে, আর তাই স্কুলজীবন ছিল রঙিন অভিজ্ঞতায় ভরা। শেষমেশ বরিশালে থিতু হয়ে কড়াপুড় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে এইচএসসি, আর ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স ও মাস্টার্স, জ্ঞানচর্চায় তার পদচারণা ছিল গভীর ও নিরলস।
২৪ আগস্ট জন্ম হওয়া বৃষ্টি মাসুদের এই গল্প কেবল একজন কবি বা মা’র নয়,
এই গল্প একজন সংগ্রামী নারীর,
যিনি হেরে যাননি, বরং প্রতিটি বাঁধাকে গ্রহণ করেছেন হাসিমুখে। তিনি বিশ্বাস করেন, হতাশা নয়, আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় পাথেয়।
আর তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন
নিজের সন্তানকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা,
যার মাধ্যমে সমাজ উপকৃত হবে।
ছোটবেলা থেকেই দুইটি পেশা তাকে টানত, ডাক্তার আর শিক্ষকতা। তবে বাবার কণ্ঠে গান শুনে আর সুরে সুরে বড় হতে হতে নিজের ভিতরেই জন্ম নেয় সংগীতশিল্পী হওয়ার এক নিঃশব্দ সাধ। শিল্প আর অনুভবের সেই বীজই ধীরে ধীরে তাকে আজকের বৃষ্টি মাসুদ করে তোলে।
বৃষ্টি মানেই প্রেম, এই কথাটা যেন তার জীবনকেও ছুঁয়ে যায়। কদম আর বেলী ফুলের মতো কোমল ভালোবাসা আছে তার বর্ষাময় হৃদয়ে। পছন্দের রং নীল ও কালো, যেগুলো ঠিক তার মনের গভীরতা আর রোমান্টিকতার প্রকাশ।
নজরুলপ্রেম থেকে কবিতার পথচলা
বৃষ্টি মাসুদের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর জায়গা দখল করে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তার গান, তার বিদ্রোহ আর ভালোবাসার সুরই বৃষ্টির অন্তর্গত সত্তায় সজীব হয়ে বেঁচে আছে।
“আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়” এই গান যেন তার আত্মার স্বর।লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা জন্মায় আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের অনুপ্রেরণায়। সেই ছোটবেলার সাহিত্যপ্রীতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় কবিতায়, গানে, গল্পে। কখনো ভাবেননি কবি হবেন, কিন্তু গানের মাঝে কবিতার প্রতি ভালোবাসা বাড়তে থাকে। ছোট ছোট করে লেখা শুরু, কখনো পঙক্তি, কখনো অনুভব। সেই পথকে দৃঢ় করে তার জীবনসঙ্গীর নিঃশর্ত অনুপ্রেরণা। তার উৎসাহেই একসময় বৃষ্টি মাসুদ সাহস করে কবি পরিচয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন।জন্ম ও জীবনের প্রেরণা ।
বৃষ্টির নিজের ভাষায়
জীবনের যত প্রাপ্তি, তার সব অবদান বাবার, পরে বৃষ্টির জীবনসঙ্গীর হাত ধরেই আজকের পথচলা।নিঃসন্দেহে তার বাবা ছিলেন জীবনের পথপ্রদর্শক। যিনি ছিলেন ধৈর্য, কোমলতা আর নির্ভরতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
বৃষ্টি মাসুদ মনে করেন, জীবন যুদ্ধ বলে আলাদা কিছু নেই, প্রতিদিনের বেঁচে থাকা, কাজকে ভালোবেসে মনপ্রাণ দিয়ে করে যাওয়া, এটাই আসল যুদ্ধ।
জীবনকে তিনি দেখেন মেঘে ঢাকা তারার মতো, মেঘ কেটে গেলে সে জ্বলে উঠে নিজের আলোয়।বৃষ্টি মাসুদ বিশ্বাস করেন, স্বপ্ন, শ্রদ্ধা আর আত্মবিশ্বাস নিয়েই একজন নারী এগিয়ে যায়।
বিরক্তি বা রাগ যেন ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়। যখন কোনো কাজ করতে ভালো না লাগে, তখন একটু বিরতি নিলেই সেই কাজটিই আবার আপন হয়ে যায়। এই কথাটিকে হৃদয়ে লালন করে চললে জীবন সহজ ও সুন্দর।
বৃষ্টি মাসুদের লেখালেখির পথচলা বেশ সফল। এপর্যন্ত তার ৫টি একক বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি ছোটগল্পের এবং চারটি কবিতার বই।
এছাড়া কিছু যৌথ বইতেও তার অবদান রয়েছে। নিজের বইগুলোকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসেন। বিশেষ করে প্রথম কবিতার বই “নারী ও স্বপ্ন” তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও বিশেষ, কারণ সেটি তার লেখক জীবন শুরু করার স্মৃতি এবং স্বপ্নের প্রতীক।
লেখালেখির জগতে বৃষ্টির যাত্রা থেমে নেই। এবার তিনি কাজ করছেন জীবনমুখী ছোটগল্পের বই নিয়ে। যেখানে থাকবে জীবনের গভীর ছোঁয়া।
সেই সঙ্গে পরিকল্পনায় আছে নতুন একটি কবিতার বই ও। নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে পাঠকদের জন্য এটি হবে হৃদয়ের খুব কাছের কিছু কথা ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়।
বৃষ্টি মাসুদ একজন কবি, এক সংগ্রামী নারী। ভালোবাসা, স্বপ্ন ও সাহস দিয়ে জীবন গড়েছেন তিনি। শব্দেই খুঁজে পান আশ্রয়, আর শিল্পেই খুঁজে নেন মুক্তি। তাঁর পথচলা যেন হয়ে ওঠে আরও অনেকের প্রেরণা।








