নিউইয়র্কে করোনায় বিপন্ন মানুষের পাশে এক সাহসী বাংলাদেশি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ৯:৩০ অপরাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
২৮ বছর আগে মায়ের হাত ধরে সদ্য কৈশোর পেরোনো মোতাসিম বিল্লাহ হোসেন ওরফে তুষার আমেরিকায় এসেছিলেন। ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবেন বলে মা আমেরিকায় এসেছিলেন। ছেলে কতটা মানুষ হয়েছে, তা আর মায়ের দেখে যাওয়া হয়নি। ২০১২ সালে একমাত্র ছেলের মাথায় হাত দিয়ে মা বলেছিলেন, ‘যেখানেই যাও, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছপা হবে না।’
বিল্লাহ হোসেন মায়ের কথা রেখেছেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। একবার নয়, বারবার।
আমেরিকায় হামলা হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ধসে পড়েছিল আমেরিকার শৌর্যবীর্য। নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে তখন মানুষের আহাজারি। অন্যদের সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছিলেন বিল্লাহ হোসেন। একজন প্যারামেডিকস হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে ফার্স্ট রেসপন্সার হিসেবে কাজ করেছেন গ্রাউন্ড জিরোতে। তখনকার সেই কঠিন সংকটের সময়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকটাই বদলে যান বিল্লাহ হোসেন।
বিল্লাহ হোসেন এখন কাজ করছেন করোনাভাইরাসের কবলে নাকাল হয়ে পড়া নিউইয়র্কে। নগরীর অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানি ‘অ্যাম্বুলেনজ’-এ প্যারামেডিকস হিসেবে ফার্স্ট রেসপন্সার হিসেবে কাজ করছেন দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা করে। মৃত্যুপুরী নিউইয়র্কের বিপন্ন নাগরিকেরা সাহায্য চেয়ে ফোন করেন। আর বিল্লাহ হোসেনের মতো মানুষেরা বিপন্ন লোকজনের দরজায় দ্রুত কড়া নাড়েন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে।
বিল্লাহ হোসেন এখন ফার্স্ট রেসপন্সারদের লাইসেন্সধারী একজন প্রশিক্ষক হিসেবে নগরীর ব্রঙ্কসের প্রবাসীবহুল এলাকায় থাকেন। তাঁর শখ ফটোগ্রাফিতে। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সংস্করণ চালু হলে বিল্লাহ হোসেন এগিয়ে আসেন। স্বেচ্ছাকর্মী হিসেবে এই পত্রিকার জন্য ফটোগ্রাফি করেন। জনসমাজের নানা অনুষ্ঠানে যান। এম বি তুষার নামে তাঁর ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা পরিবারের নানা আয়োজনে নিজের মতো করে যোগ দেন। অনেকেই জানেন না, বিল্লাহ হোসেন ঠিক কী করেন।
মার্চের শুরু থেকে নিউইয়র্কে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়াতে থাকে। এ নগরী হিমশিম খেতে থাকে সমস্যা মোকাবিলায়। নগরীর মেয়র, অঙ্গরাজ্যের গভর্নর আকুতি জানান, স্বাস্থ্যকর্মীদের যে যেখানে আছেন, যেন এগিয়ে আসেন। কারও আহ্বানের অপেক্ষা করেননি বিল্লাহ হোসেন। নিজের তাগিদেই ফ্রন্ট লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
করোনার রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বিপন্ন মানুষের আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেওয়ার কাজ করছেন দিনরাত। কর্মব্যস্ততার মধ্যে ১২ এপ্রিল সন্ধ্যার আগে যোগাযোগ হয় বিল্লাহ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, দীর্ঘ কর্মঘণ্টার শিফট শেষ করেছেন। গত কয়েক দিন নগরীর নার্সিং হোমে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ডাকে ছুটতে হয়েছে।
নিজের জীবনকে কি বিপন্ন মনে করেছেন কখনো? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিল্লাহ হোসেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজের দুজন সহকর্মীর মৃত্যুর কথা জানালেন। বলেন, যতটা পারা যায় নিজেকে সুরক্ষিত রেখে কাজ করছেন।
বিল্লাহ হোসেন জানান, করোনায় আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে অনেকের মুখে অক্সিজেন ধরে রাখতে হয়। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন—এমন লোকজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর দেখা যায়, বেড খালি নেই। ক্ষেত্রবিশেষে ভেন্টিলেশনে যাওয়ার আগে হাসপাতালের করিডরে রোগীদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ভেন্টিলেশনে গিয়ে কেউ ফেরত আসছেন, কেউবা আসছেন না। মর্গের গাড়িতে লাশের সারি দেখে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তবে আবার ঝাঁপিয়ে পরেন নিজের কাজে।
করোনার রোগী বহন করার পর অ্যাম্বুলেন্স ভাইরাসমুক্ত করার জন্য এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে বলে জানালেন তিনি। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে, এমনকি নাইন-ইলেভেনের সময়ও নিউইয়র্কের হাসপাতালে এমন চিত্র দেখেননি বিল্লাহ হোসেন।
ঢাকার ছেলে বিল্লাহ হোসেন করোনায় বিপর্যস্ত নিউইয়র্কে নিজের জীবন বিপন্ন করে কাজ করার ফাঁকে দেশের খবর নেন।
কাজে করতে ভয় লাগে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিল্লাহ হোসেন বলেন, ‘ভয় হয় না বললে ভুল হবে। কিন্তু কাজটা কে করবে? যুদ্ধে তো ভয় আছেই। এ কাজটি আমার। আমাকেই করতে হবে। এই বিবেচনাই প্রধান। পরিণামে কী হবে, এ ভাবনা নিয়ে যুদ্ধে নামে না কোনো সৈনিক। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে ডাক্তার, যে নার্স, যে স্বাস্থ্যকর্মীরা মারা যাচ্ছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁরাও এই প্রশ্ন করেননি। করার সুযোগও নেই। এই দুর্যোগের সময় নিজের পেশার ডাক, দায়িত্বকে উপেক্ষার কোনো সুযোগ নেই।’
একপর্যায়ে বিল্লাহ হোসেনের কণ্ঠ ধরে আসে। তিনি বলেন, ‘কাজ করতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে মনে পড়ে, আমার মা বলে গেছেন, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে যেন কখনো পিছপা না হই।’







