জামায়াত আমীরের যুক্তরাজ্য ঝটিকা ভ্রমণ ঘিরে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জল্পনা ও অস্বস্তি
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ১৮ ডিসেম্বরের সংক্ষিপ্ত যুক্তরাজ্য ভ্রমণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি মাত্র দুই দিনের জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন, তবে এ ভ্রমণের বিষয়ে চলমান আন্দোলনে সম্পৃক্ত ৮ দলীয় ইসলামপন্থী জোটের কোনো শরিককে পূর্বানুমতি বা অবহিতকরণ দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে একজন সংবাদকর্মীর মাধ্যমে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি হালকা করতে জামায়াতে ইসলামী ‘মিট দ্য প্রেস’ কর্মসূচির আয়োজন করে। কিন্ত কিছুদিন পূর্বেই সমান প্রোগ্রাম করা হয়। এই সংবাদ সম্মেলনে নতুন কোনও তথ্য ছিল না।
এ ভ্রমণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘মিট দ্য প্রেস’ হলেও অনুপস্থিত ছিল ৮ দলীয় নেতৃত্ব
জামায়াতের ডাকা ‘মিট দ্য প্রেস’ কর্মসূচিটি শেষ পর্যন্ত একটি সুধী সমাবেশের রূপ নেয়। সেখানে ৮ দলীয় জোটের কোনো নেতা বা প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত কয়েকজন প্রবীণ ও সক্রিয় ইসলামী রাজনৈতিক নেতার দাবি, তাদেরও এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে একটি ইসলামপন্থী দলের একজন শীর্ষ নেতা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “এটি জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। ডা. শফিকুর রহমানের এই ভ্রমণের বিষয়ে আমাদের আগে কিছুই জানানো হয়নি। আমরা বিষয়টি জানার উদ্যোগও নিইনি।”
এই বক্তব্য থেকে জোটের শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
এ ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মন্তব্য আলোচনাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহের ফেসবুক স্ট্যাটাস ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি লেখেন—
“একবাক্স নীতি ভেঙে জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে যায়, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ ২০–২৫টি আসনের বেশি পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ একবাক্স নীতি বজায় থাকলে শতাধিক আসনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ভোটের ঐক্য বিনষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট দল ইতিহাসে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত হবে।
যদিও ওই স্ট্যাটাসে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে, তবে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বড় কোনো দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়নি।
অন্যদিকে, বিএনপি অ্যাক্টিভিস্ট আসিফ শাইকাত তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন—
“৮ দলীয় জোটকে না জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান তারেক রহমানের সঙ্গে শেষ বৈঠক করতে লন্ডনে গেছেন। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, জামায়াত ২০টি আসনেই সন্তুষ্ট থাকতে চায়।”
তিনি আরও দাবি করেন, ৮ দলীয় জোট জামায়াতের কাছে ২০০টির বেশি আসন দাবি করায় জামায়াত জোট ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আপাতত আলাদাভাবে ক্ষমতার অংশীদার হতে আগ্রহী।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইসলামপন্থী রাজনীতিতে “এক বাক্স এক ভোট” নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। এ নীতির লক্ষ্য হলো—ভোট বিভাজন রোধ করে একক প্রার্থীর মাধ্যমে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করা।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আব্দুল কাদির এই নীতির অন্যতম প্রবর্তক ও প্রচারক হলেও, মাঠপর্যায়ে জামায়াতের সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া মাওলানা নোমানী পরোক্ষভাবে মন্তব্য করে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও কওমি মাদ্রাসার স্বার্থ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে জোটের ভেতরে আসন বণ্টন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্য এবং দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশেষ করে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ধারার সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো অনুপস্থিত
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি কিংবা ৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য ভ্রমণ, সম্ভাব্য বৈঠক বা রাজনৈতিক সমঝোতা বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো বিষয়টি এখনো জল্পনা ও অনানুষ্ঠানিক দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি দেওয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, তিনি ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তবে ভ্রমণের কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।








