করোনা: লকডাউনে লন্ডনবাসীর ঘরবন্দী দিনকাল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ এপ্রিল ২০২০, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
করোনা মহামারীর কারণে অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতিতে পড়েছে সারা দুনিয়ার মানুষ। ঘরবন্দি দিন কাটাচ্ছেন লকডাউনে। চার দেয়ালের মাঝে কেমন কাটছে দিন। প্রতিদিন তারা কি ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই নিয়ে কথা বলেছেন লন্ডনের কয়েকজন বাসিন্দা। যারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র পেশার। তাদের বক্তব্যের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে লকডাউনে লন্ডনের জীবন। লকডাউনে কেবল ঘরবন্দি নয়, ঘরের মধ্যেও নিজ নিজ রুমে সীমিত হয়ে পড়েছে তাদের জগত।
লন্ডন স্টার্টফোট অলিম্পিক ভিলেজের বাসিন্দা সায়েক এম রহমান। তিনি একজন ব্যবসায়ি। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে লেখালেখিও করেন। একটি ইতালিয়ান কফি শপ চালান। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই কাটতো তার সময়। কিন্তু লকডাউনে শপ বন্ধ তাই ঘরবন্দি। ঘরে তার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কয়েকজন সন্তান। তিনি বলেন, করোনা মহামারী লকডাউনের কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একধরনের হলিডের মতো সময় কাটছে ঘরে। তবে এটা আনন্দময় হলিডে নয়, বিভিষীকাময়। স্বাভাবিক সময়ে হলিডের সময় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা পরস্পরের বাসাবাড়িতে যাতায়াত করতেন, একসঙ্গে সবাই বসে খাওয়া-দাওয়া ও আড্ডাবাজি হতো। কিন্তু এখন অনেকটা কারাবন্দীর জীবন। বাসায় দমবন্ধ হয়ে আসে তাই আমি কিছুক্ষণের জন্য হাঁটতে বের হই প্রতিদিন। কিন্তু সাথে আমার সন্তানদের নিতে পারি না। সায়েক রহমান বলেন, সবচেয়ে কঠিন সময় কাটছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের। তারা দিনের বড় একটি সময় স্কুল কলেজে কাটাতো। এখন ঘরে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনই তাদের ভরসা। ঘরের মধ্যে তাদের জন্য একটি স্পেস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে বাসায়ও নিজেদের রুমেই আমাদের জগত সীমাবদ্ধ। সায়েক এম রহমান বলেন, স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারে অ্যাপসভিত্তিক একটি গ্রুপ তৈরি করেছে। মাঝে মাঝে তারা তাদের সহপাঠীদের সাথে হাই-হ্যালো করে। স্কুল থেকে তাদের হোমওয়ার্ক দেয়া হয়। সাংঘাতিক বিরক্তিকর একটি সময় কাটাতে হচ্ছে সবমিলিয়ে।
স্টার্টফোট অলিম্পিক ভিলেজের বাসিন্দা এমডি ইকবাল হোসেন। তিনি একজন ব্যারিস্টার ও সলিসিটার। তার অফিস হোয়াটস চ্যাপেলে। লকডাউনের কারণে অফিস বন্ধ থাকলেও তাকে চালিয়ে যেতে হচ্ছে পেশাগত কাজ। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে হোম অফিসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বন্ধ এখন। কিন্তু কোর্ট খোলা আছে। ফলে হেয়ারিং হচ্ছে স্কাইপের মাধ্যমে। অনলাইনে যাবতীয় কাজ সারতে হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। আবার ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ফাইল রেডি করে দিতে হয়। স্কালিটন আর্গুমেন্ট লিখতে হয়। লকডাউনের কারণে আমরা ক্লায়েন্টদের সাথে সামনাসামনি কথা বলতে পারছি না। ক্লায়েন্টদের বাসায় তো স্ক্যানার নেই। দোকানপাঠ বন্ধ হওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে পারছেন না। পোস্ট অফিসের কার্যক্রমও সীমাবদ্ধ। এখন ক্লায়েন্ট যদি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে না পারেন তবে আমরা কিভাবে ভালো করে ফাইল সাবমিট করবো। ক্লায়েন্টদের প্রয়োজনে ব্যারিস্টার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে হয়। কিন্তু ক্লায়েন্টরা অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ার ব্যারিস্টার অ্যাপয়েন্টন্টে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া তারা সাক্ষ্য জবানবন্দী দেবে কিভাবে। ফোনে ফোনে তো তা সঠিকভাবে দেয়া যায় না। কোর্ট এসব শুনতে চায় না। অন্যদিকে ক্লায়েন্টদের কাছে জীবনের ঝুঁকির চেয়ে ইমিগ্রেশন সমস্যা বড় বিবেচ্য। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের উপর বাড়ছে তাদের চাপ। এখন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে না পারায় আমাদের যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি ক্লায়েন্টরাও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ছেন। ব্যারিস্টার ইকবাল বলেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনের তাগিদে পুরোপুরি লকডাউন নীতি মেনে চলা সম্ভব হয় না। কারণ মানুষজনকে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে বাইরে যেতে হয়। দোকানে কোন দ্রব্যের প্যাকেটে ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ লেগেছে কিনা সেটা বুঝার উপায় নেই। আবার যারা ডেলিভারি দিচ্ছেন তারা তো রীতিমতো পটেনশিয়াল থ্রেট হয়ে উঠেছেন। কারণ তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন, কোথায় তারা আক্রান্ত হয়ে তার বিস্তার ঘটাচ্ছেন কিনা কিভাবে বুঝবেন। তিনি বলেন, কিছু বয়স্ক মানুষ রয়েছেন যাদের শারীরিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত শরীর চর্চা প্রয়োজন। তারা ঘরে থাকলেও সমস্যা আবার বাইরে গেলেও আক্রান্ত হবার ঝুঁকি। তারপরও মানুষকে বাইরে যেতে হচ্ছে, এক ধরনের ভীতির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছেন। সবমিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিক ব্রেকডাউনে পড়েছে মানুষ।
ইস্টলন্ডনের বেথনাল গ্রিনের বাসিন্দা আতিকুর রহমান পাপ্পু। তিনি বলেন, পেশাগত কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় আমাকে ঘরে বাইরে থাকতে হতো। কিন্তু লকডাউনের পর কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। একেবারেই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছি। কারাভোগের চেয়েও কঠিন সময় কাটছে এখন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও বাচ্চাদের জন্য এই পরিস্থিতি পার করা অত্যন্ত কঠিন। সারাদিন তাদের ছোট পরিসরের ঘরের মধ্যে অবস্থান করতে হয়। নামাজ পড়ে ও মোবাইল- কম্পিউটার গেমস খেলেই সময় কাটছে। এতে তাদের উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ছে। বাচ্চাদের কাছে করোনা যেন এক আজরাইলের নাম হয়ে উঠেছে। তারা ভয়ে বাইরে যেতে বাধা দেয়। পাপ্পু বলেন, লকডাউনের কারনে কাজকর্ম বন্ধ হওয়ায় সবাই কমবেশী অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন। তার উপর শুরু হয়েছে খাবার সংকট। কোনো ব্যক্তি কোন আইটেম তিনটির বেশি কিনতে পারছেন না। ফলে এক দুইদিন পরপর বাজারে যেতে হচ্ছে। আবার প্রতিটি সুপার শপের সামনেই লম্বা কিউ। এতে কেনাকাটার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ। বাচ্চাদের রেডিমেট খাবার, শুকনো খাবার, ডিম আর স্যানিটাইজার আইটেমসহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলো সকাল সাড়ে ১০টা থেকে তিনটা পর্যন্ত খোলা রাখা হচ্ছে কেবল মানি ইন-আউটে। অন্য সবধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ। প্রয়োজনে টেলিফোনে তা সারতে হয় এবং সেখানে লম্বা কিউ সবসময়। পাপ্পু বলেন, বাঙালী কমিউনিটির নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ দিন শেষে ইস্টলন্ডনের রেস্টুরেন্টগুলোতে সামাজিক আড্ডা দিতেন। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। রাজনীতি ও সামাজিক সংগঠনের কাজকর্মও বন্ধ হয়ে গেছে। যা মানুষের মনস্তত্ত্বের উপর প্রভাব ফেলছে।
ইস্টলন্ডন আপটন পার্কের বাসিন্দা মাহবুব সৈয়দ একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, অনেকটা বাধ্যতামুলকভাবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঘরবন্দী হয়ে আছি। অদৃশ্য আতংক গ্রাস করেছে আমাকে এবং বলা যায় সবাইকে। প্রথমদিকে মানুষজনদের খাদ্য মজুদের তাড়া এবং কয়দিনের মাঝে রাস্তাঘাটের নিরব নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার সাক্ষী হয়ে বসে আছি। অসহ্য সময় এটি। একান্ত প্রয়োজনে দিনে একবার বাইরে গেলেও মুখ হাত সব বেঁধে বেরুতে হচ্ছে। বাসায় ঢুকে ছোট্ট মেয়েটির কোলে উঠার আহ্বানকে ঠেলে দিয়ে প্রথমে হাত ধোয়ার কাজ করতে হচ্ছে। বাইরে থেকে আনা দ্রব্যাদি ভালো করে ধোয়ার পরই কেবল স্পর্শ করছি বা খাচ্ছি। সপ্তাহের বার বা তারিখের কোন খেয়ালই থাকছে না। বাইরে রৌদ্রজ্জ্বল দিন। পার্কে গিয়ে মেয়ের টুকটুক হাত ধরে একটু ঘুরে বেড়াতে কার না ইচ্ছা হয়। কিন্তু অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে অন্যসবের মতো আমিও যে বন্দীদশায় আছি।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের ডারলাসটনের বাসিন্দা কবির আহমেদ একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। তিনি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করেন উইলেনহলে। লকডাউনে রেস্টুরেন্ট বন্ধ হলেও চালু রয়েছে টেকওয়ে সার্ভিস। লকডাউনের পর তিনি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করেছেন। টেকওয়ে সার্ভিস চালু ছিল। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে শেপ ও কর্মচারিরা ঝুঁকি নিয়ে কাজে যোগ দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় টেকওয়ে সার্ভিসও বন্ধ করে দিয়েছেন।







