জটাধারী সেই বৃদ্ধের আর্তনাদ ‘আল্লাহ তুই দেহিস’
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৭:০৬ অপরাহ্ণ
সুরমা নিউজ ডেস্কঃ
‘আল্লাহ তুই দেহিস’- এভাবে আর্তনাদ করছিলেন জটাধারী এক বৃদ্ধ। এমন আর্তনাদের কারণ, দু’জন ইসলামী পোশাক ও একজন সাধারণ পোশাক পরিহিত লোক জটাধারী বাউলবেশি এক বৃদ্ধকে জোর করে ধরে চুল কেটে দিচ্ছিল। সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে- সেখানে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় জটাধারী একজন মধ্যবয়স্ক লোককে ধরে তার মাথার চুল কেটে দিচ্ছে কয়েকজন। নিরুপায় লোকটি বলছেন, আল্লাহ তুই দেহিছ। হেনস্তার শিকার জটাধারী বৃদ্ধের নাম হালিম উদ্দিন আকন্দ (৭০)। তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে হালিম ফকির হিসেবেই চেনেন।
জানা যায়, কয়েক বছর আগ থেকে এসব ঘটনা শুরু হলেও গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত নানা পরিস্থিতিতে এর মাত্রা যেন বেড়ে গেছে। ফলে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়েছে। শুরুতে একটা দলের বেশ কয়েকটি ভিডিও বেশ প্রচার হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে তারা লোকদের ধরে ধরে চুল কেটে দিয়ে, গোসল করিয়ে, নতুন জামাকাপড় পরিয়ে, সেই কাজের ভিডিও করে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। এ ঘটনাগুলো ফেসবুকে কনটেন্ট আকারে প্রকাশ পেলে বেশ ভিউ হয়, মানুষ আলোচনা করে, আর তাতে যিনি প্রকাশ করেন, তার কিছু টাকা আয় হয়।
জটাধারী বাউল হালিম উদ্দিন পাগল বা মানসিক বিকারগ্রস্ত নন। সংসার জীবনে তিনি পুত্র ও কন্যাসন্তানের জনক। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে জট ছিল তার মাথায়। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহ্ পরানের (রহ.) ভক্ত তিনি। আগে পেশায় কৃষক থাকলেও এখন ফকিরি হালে আছেন। টুকটাক কবিরাজিও করেন। গত কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে হঠাৎ করেই একদল লোক এসে তার মাথার জট, দাড়ি ও চুল জোরপূর্বক কেটে দেন। ঘটনার সময় বাধা দিতে গেলে এই বৃদ্ধ মানুষের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও বল প্রয়োগ করা হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর হালিম উদ্দিনকে দেখতে যান ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। তখন সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন হালিম উদ্দিন। বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন বলেন, ঘটনার দিন সকালে বাজারে একটি দোকানে বসেছিলাম। কোদালিয়ার একটা লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি কোথায় যাবো? তখন আমি বলি বাড়িতে চলে যাবো। এই বলে, আমি বাড়ির দিকে রওনা হই। এরপর ওই লোক মোবাইল করে দু’জনকে আসতে বলে। পরে তারা এসে আমাকে আটকে জোর করে ধরে মাটিতে ফেলে আমার চুল কেটে দেয়। তখন আমি বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, সেই থেকে আমি কোনো কাজ করতে পারি না। এখন আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকি। মাঝে মাঝে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে মাথায় পানি ঢেলে আমার জ্ঞান ফিরাতে হয়। আমি কোনো কিছু বলবো না, যা করে মালিকে করবো।
ময়মনসিংহ বাউল সমিতির বক্তব্য: ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, হালিম ভাই তরিকায়ে নকশবন্দিয়া ধারায় অনুরক্ত। বর্তমানে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, আমরা ময়মনসিংহ বাউল সমিতির পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পক্ষ থেকে আমরা শুধু ময়মনসিংহে নয়, যেন বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
যা বলছে প্রশাসন: তারাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ টিপু সুলতান বলেন, বৃদ্ধ ব্যক্তিটি এলাকায় হালিম ফকির হিসেবেই পরিচিত। তিনি কবিরাজি করেন। গত ঈদুল আজহার আগে কয়েকজন কটি পরা লোক এসে তার চুল কেটে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়ে চলে যান। ওই সব লোককে স্থানীয় কেউ চিনতে পারেনি। বৃদ্ধের খোঁজখবর নিয়েছি। তারা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে চাইলে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসাইন বলেন, বৃদ্ধ ব্যক্তিটি সম্পর্কে থানার ওসিকে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। যদি ও রকম ঘটনা হয়, তাহলে থানায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
দেশের আইন কী বলে: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘প্রতিটি নাগরিককে আইনের আশ্রয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে।’ ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে’ এবং ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। এ ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ অমানবিক, বেআইনি এবং সংবিধান ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।








