পাথরখেকোরা নিরুদ্দেশ, ডিসির নোটিশ এবং…
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

ওয়েছ খছরু:
সিলেটের শুধু সাদাপাথর নয়, জাফলং, রাংপানিসহ যেসব কোয়ারি থেকে পাথর লুট করা হয়েছিল সেসব পাথর ফেরত দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক। এই সময়ের মধ্যে অনেকেই পাথর ফেরত দিয়েছেন। অন্তত ৩০ লাখ ঘনফুট পাথর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে লুটপাটকারীরা নিজ উদ্যোগেই প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ ঘনফুট পাথর ফেরত দিয়েছেন। পাথরগুলো এখন প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। পাথর ফেরত দেয়ার পরদিনই বুধবার সিলেটের জেলা প্রশাসক এক নোটিশ জারি করেন। নোটিশে সিলেট জেলার সবখানে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। একইসঙ্গে অভিযান জোরদারের জন্য নির্দেশনা জারি করেন। আর এই নোটিশের পর লুটপাট এখন বন্ধ। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন পাথর ও বালুখেকোরা। একের পর এক তদন্ত শুরু এবং অভিযান চলার কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন সবাই।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন; নোটিশ জারির পর পরই অভিযান জোরদার করা হয়। প্রতিদিনই লুট হওয়া পাথর উদ্ধার চলছে। লুটেরাদের বসতবাড়ি, পুকুর, জঙ্গল, ক্রাশার মিল, গর্তে মিলছে পাথরের স্তূপ। এসব পাথর উদ্ধার করে স্বস্থানে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আগস্টের প্রথম ১০ দিনেই সিলেটের সাদাপাথর লুট করা হয়। তৃতীয় সপ্তাহে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়। এরপর থেকে ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে বালু ও পাথর লুট বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- প্রশাসন সক্রিয় হওয়ার পরপরই বালু ও পাথরখেকোরা এলাকা ছেড়ে পালায়। এর মধ্যে অনেকেরই নাম উঠে আসে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তদন্ত রিপোর্টে। ফলে পাথর ও বালুখেকোরা পিছু হটে। এবার ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে কয়েক হাজার টাকার বালু ও পাথর লুট করা হয়েছে বলে জানান তারা। কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদীতে এখন পিন-পতন নীরবতা। কেবলমাত্র সরব রয়েছে লিজ অধিভুক্ত এলাকা।
তবে উপরে লুটপাট বন্ধ হওয়ার কারণে লিজের স্থান নিয়ে বালুবাহী নৌকা ও ভলগেট যাতায়াত কমে গেছে। দয়ারাবাজার ও উৎমা এলাকায়ও লুটপাট বন্ধ। এসব লুটপাটে ব্যবহার করা হয় বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের। প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ায় তারাও এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। অভিযানের কারণে ভোলাগঞ্জ, আদর্শগ্রাম, কালাইরাগ, কালিবাড়ি, কলাবাড়ি, দয়ারবাজারসহ কয়েকটি এলাকার বাড়িঘরে কেবল মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধরা ছাড়া বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই। ইতিমধ্যে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা চিহ্নিত পাথরখেকোদের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেছে। এদিকে- সাদাপাথর লুটের ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ নীরব হলেও সরব ছিল পাশ্বর্বর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট। উপজেলার বিছনাকান্দি, লেঙ্গুরা বালুমহাল লিজে আছে। বিছনাকান্দিতে পাথর উত্তোলন চললেও লেঙুরা ছিল বন্ধ। তবে সরব ছিল বিছনাকান্দির পাশ্বর্বর্তী এলাকা হাজীপুর এলাকা। ওই এলাকায় চিহ্নিত বালুখেকোরা বড় বড় নৌকা দিয়ে বালু লুটপাট চালায়। হাজীপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই এলাকার বালু মূল্য বেশি। প্রতি ফুট বালু ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাথরখেকোরা হাজীপুর এলাকা থেকে অর্ধকোটি ঘনফুট বালু লুট করেছে। পুলিশ এবং ইউএনও অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওখানে লুটপাট চালানো হয়। জেলা প্রশাসকে নোটিশ জারির পর প্রশাসনের তরফ থেকে অভিযান চালিয়ে ওই এলাকায় বালু লুট বন্ধ করা হয়। একইসঙ্গে যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে এলাকায় অভিযান চালানোর কারণে বালু লুটেরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। জাফলং কোয়ারিতেও চলছিল বালু লুটপাট। গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই জাফলং কোয়ারি ও আশপাশ এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। এ কারণে এখন জাফলং কোয়ারিতে বারকি নৌকাও চলছে না। বৃহস্পতিবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ও পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান জাফলং কোয়ারি এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
এ সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয় স্থানীয়দের। জেলা প্রশাসক বলেন, জাফলং কোয়ারির একটি পাথরেও কেউ হাত দিতে পারবে না। শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। এর আগে কয়েক দিনের অভিযানে কয়েক হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করেছিল উপজেলা প্রশাসন। এগুলো ফের জাফলং জিরো পয়েন্ট এলাকায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি জাফলং জিরো পয়েন্ট এলাকায় পাথর লুটের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। জাফলংয়ের অদূরে বাংলাবাজার, বালিরহাওর, মুকতলাসহ কয়েকটি এলাকায় এবার নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয় বালিরহাওর এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রয়্যালিটি ঘাটের নিয়ন্ত্রকদের শেল্টারে ওই এলাকা থেকে কয়েকশ’ কোটি টাকার বালু লুটপাট করা হয়। তিনদিন আগে যৌথবাহিনীর একটি টিম ওই এলাকায় অভিযান চালায়। বাংলাবাজার ও আশপাশ এলাকায় বালু লুটে সক্রিয় থাকা কয়েকটি ভলগেট নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর থেকে ওই এলাকায় বাইরে থেকে ভলগেট উঠছে না। একইসময় গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই অভিযানে বালু লুটের ঘটনায় তিন শ্রমিককে আটক করা ছাড়া ভলগেট আটক করা হয়। পরে ৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে সে ভলগেট ছেড়ে দেয়া হয়। প্রশাসন সক্রিয় হওয়ায় জাফলং ও বাংলাবাজারমুখী ভলগেট কমে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পুকুরে মিলছে পাথর: সিলেটে এবার পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ ঘনফুট সাদাপাথর। সেগুলো প্রতিস্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে অভিযান চালিয়ে পাথরগুলো উদ্ধার করে সিলেট সদর উপজেলা প্রশাসন। এ সময় তাদের সহযোগিতা করে এপিবিএন সদস্যরা। সদর উপজেলার ধোপাগুল ও লালবাগ এলাকায় আগে থেকে জব্দ করা কিছু পাথর কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে প্রতিস্থাপনের জন্য প্রশাসন কাজ করছিল। তখন এই দুই এলাকার পাঁচটি পরিত্যক্ত পুকুরে পাথর থাকার বিষয়টি তারা ধারণা করেন। পরে এক্সেভেটরের সাহায্যে তারা পাথরগুলো উত্তোলন করতে সক্ষম হন। উদ্ধারকৃত পাথর এখনো পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি তবে সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরকার মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, ধোপাগুল ও লালবাগ এলাকার মোট পাঁচটি পরিত্যক্ত পুকুরে পাথরগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইৎ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, প্রায় দেড়লাখ টন পাথর পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।







