জাফলং নিয়ন্ত্রণে নেমে আলোচনায় স্ট্যালিন থারিয়াং
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জুলাই ২০২৫, ২:৩৬ অপরাহ্ণ

ওয়েছ খছরুঃ
সম্প্রতি জাফলংয়ে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, সেটি হচ্ছে- স্ট্যালিন থারিয়াং। বালু লুটের ঘটনার নেপথ্যে ব্যক্তি হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এ নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে এলাকায়। সিলেট ও ঢাকায় সমানভাবে আলোচিত হচ্ছে তার নাম। গোয়াইনঘাটের ছাত্র সমন্বয়ক দাবিদার চাঁদাবাজির মামলার আসামি আজমল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি বালু লুটের নেপথ্যের ব্যক্তি হিসেবে স্ট্যালিনের নামে অভিযোগ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সহ একাধিক দপ্তরে অভিযোগ করেছেন গোয়াইনঘাটের মুকতলা পাথর ও বালু সমবায় সমিতির সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার। এই অভিযোগে তিনি অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে স্ট্যালিন থারিয়াংয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। স্ট্যালিনকে এক নামেই চিনেন জাফলংয়ের মানুষ। সিলেট নগরের রাজনীতিবিদদের কাছে তার পরিচিতি রয়েছে। এক সময় তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। পরে হন জেলা যুবদলের নেতা। বর্তমানে সিলেট জেলা বিএনপি’র বর্তমান কমিটির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক। জাফলংয়ের সংগ্রাম বস্তিতে বর্তমান তার আবাসস্থল। মূল বাড়ি শ্রীমঙ্গলে। বিএনপি’র রাজনৈতিক নেতা হলেও বিগত দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র নেতারা। সংগ্রাম বস্তিতে বসবাস করলেও তিনি নীরবই ছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করে জাফলংয়ের ‘অঘোষিত শাসক’ হয়ে ওঠেন এই স্ট্যালিন।
আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচন করায় জেলা বিএনপি’র কোষাধ্যক্ষের পদ হারান জাফলংয়ের বাসিন্দা ও গোয়াইনঘাটের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন। ৫ই আগস্টের পর পদ হারান জাফলংয়ের বাসিন্দা ও সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম শাহ্পরাণ। ফলে জাফলংয়ে বিএনপি’র শীর্ষ নেতা হিসেবে একমাত্র টিকে থাকেন স্ট্যালিন থারিয়াং। প্রথম দিকে পাথর লুটে এগিয়ে আসেননি। শুস্ক মৌসুমের শেষদিকে এসে তিনি তার ম্যানেজার কামালের মাধ্যমে জিরো পয়েন্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণে নামেন। তখন জাফলংয়ের নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি, লাখেরপাড়ের লোকজনের সঙ্গে তার গ্রুপের লোকজনের জাফলং কোয়ারিতে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে বার বার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় জাফলং কোয়ারি। আর এই সংঘর্ষের পর জাফলং কোয়ারি নিয়ন্ত্রণে নেন স্ট্যালিন থারিয়াং ও তার লোকজন। আর ওই সময় থেকে মুলত জাফলংয়ে আলোচনা আসেন তিনি। ব্যাপক সমালোচনা হয় তাকে নিয়ে। বিশেষ করে গোয়াইনঘাটের উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। ফলে রাতারাতি তার বলয় বড় হয়। বর্তমানে গোয়াইনঘাটের বালু ও পাথর লুটপাটকারীদের একটি বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাথর লুটের পর সিলেটে বালু লুটের পরিকল্পনা সাজান স্ট্যালিন থারিয়াং।
অনুগতদের দিয়ে তিনি সারি-১. বড়গাঙ ও লেঙুরা বালুমহালের লিজ নেন। তার ব্যবসায়িক অংশীদারদের মতে; প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি বালুমহালের ইজারা নেন স্ট্যালিনের লোকজন। গতবার এসব বালুমহাল যে দামে লিজ নিয়েছিল এবার তার দ্বিগুণ টাকায় লিজ নেন ইজারাদাররা। এরপর জৈন্তাপুরের সারি-১ নামের বালুমহালের নামে গোয়াইনঘাট সদরের কালা মিয়ার ঘাটে রয়্যালিটি আদায় করা হয়। এই রয়্যালিটিকে কেউ কেউ চাঁদাবাজি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। গোয়াইনঘাটের সব মানুষ জানে; এই রয়্যালিটির নেপথ্যের ব্যক্তি স্ট্যালিন। তিনি নিজেও এই রয়্যালিটি ঘাটে একাধিকবার এসে বসেছেন। ঘাটের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এছাড়া কালা মিয়ার ঘাটের উজানের ঘাট বাংলাবাজারে নিজে গিয়েও কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্ট্যালিন। সেই বৈঠকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফলে গোয়াইনঘাটের বালু লুটে স্ট্যালিনের নিয়ন্ত্রণ অনেক আগেই পরিষ্কার হয়েছে। এই অবস্থায় সম্প্রতি সময়ে গোয়াইনঘাটের ছাত্র সমন্বয়ক দাবিদার আজমল হোসেন জৈন্তাপুরের সারি-২ নামের একটি বালুমহালের ইজারার রিসিপ্ট নিয়ে নদীতে নামেন। তিনিও সারি-১ মহালের মতো সারি-২ দিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করেন। এ সময় সারি-১ অংশের ইজারাদার কামরুল ইসলাম চৌধুরীর লোক স্থানীয় জিয়ারত খান ও জাহিদ খানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধে। সারি-১ অংশের লোকজন জানান- সারি-২ এর ইজারাদার জৈন্তাপুরের প্রভাবশালী এক জামায়াত নেতার ভাই। নেপথ্যে জামায়াতের ইন্ধনে নদী অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় আলোচনার ভিত্তিতে সমন্বয়ক দাবিদার আজমলকে রয়্যালিটি ঘাট থেকে চার আনা অংশ দেয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি মানেননি।
তিনি আট আনা অংশীদার দাবি করেন। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় একপর্যায়ে তিনি লেঙুরা এলাকায় কয়েকশ’ ভলগেট আটকে দিলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরে গত সপ্তাহে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে আটক ভলগেট ছাড়িয়ে নেন। এ ঘটনায় সমন্বয়ক আজমলকে প্রধান আসামি করে গোয়াইনঘাট থানায় চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। তবে অভিযানের পর আজমলের অভিযোগের তীর স্ট্যালিনের দিকে। এক ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে; আজমল সম্পূর্ণ ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন স্ট্যালিনকে। এ সময় তিনি স্ট্যালিনের পক্ষ নেয়ায় প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আজমল গত বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি জাফলং সহ গোয়াইনঘাটে বালু লুটের জন্য স্ট্যালিন ও স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশকে দায়ী করেন।
এদিকে- বৃহস্পতিবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্ট্যালিন সহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন বাংলাবাজারের মুকতলা পাথর ও বালু সমবায় সমিতির সভাপতি ও ইউপি সদস্য রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার। ওই অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন; জৈন্তাপুরের সারি-১ এর ইজারাদারের কাগজ নিয়ে গোয়াইনঘাটে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে বালু লুট ও রয়্যালিটির নামে ইতিমধ্যে ১০-১২ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করা হয়েছে। রিয়াজ উদ্দিন জানান- নদীতে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে পরপর দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গোয়াইনঘাটের পুলিশ এসপি নয়, স্ট্যালিনের কথায় চলে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে মুঠোফোনে একাধিক ফোন দেয়া হলেও স্ট্যালিন থারিয়াং ফোন রিসিভ করেননি।
তবে স্ট্যালিনের ঘনিষ্ঠজন কামাল আহমদ মেম্বার জানিয়েছেন- বালু লুটপাটে স্ট্যালিন থারিয়াং জড়িত নন। বরং তিনি বালু লুটের বিপক্ষে। তবে গোয়াইনঘাটের রয়্যালিটি ঘাটের ব্যবসায় স্ট্যালিনের শেয়ার রয়েছে। আর এ বিষয়টিকে পুঁজি করেই একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। এছাড়া বাংলাবাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাওয়াতে তিনি একদিন গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা করার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। স্ট্যালিন থারিয়াংকে নিয়ে চক্রান্ত চলছে বলে দাবি করেন কামাল আহমদ।







