হঠাৎ কুয়েতের ফ্লাইট বন্ধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ মার্চ ২০২০, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
হাতে পাসপোর্ট, বিমানের টিকিট। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। ট্রলির উপরে একটি ব্যাগে বসে তাকিয়ে আছেন অপলক। স্বজনরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তবুও যেন নিরাশায় কাটছে প্রতিটা মুহূর্ত। ২৫ বছর বয়সী নুরনবী। বাড়ি নওগাঁ শহরে। পরিবারের অভাব গুছানোর জন্য কাজের সন্ধানে কুয়েত যাবেন।
সব প্রস্তুতি শেষ করে স্বজনদের সঙ্গে এসেছেন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার ফ্লাইটে কুয়েত যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আর কুয়েত যাওয়া হলো না। বিমানবন্দরে এসে তিনি জানতে পারেন কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিমানবন্দন কর্তৃপক্ষ বলেছেন এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আর টিকেট রিফান্ডের জন্য এয়ারলাইন্স কোম্পানি ব্যবস্থা নিবে। তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নুরনবী বলেন, অভাবের সংসারে অর্থের যোগান দিতে কুয়েত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বেশি টাকা দিয়ে একটি জব ভিসা কিনেছি। বিমানবন্দরে এসে জানতে পারলাম কুয়েতের ফ্লাইট বন্ধ। আমার সঙ্গে নঁওগা থেকে আরো পাঁচজন এসেছেন। তাদেরও গন্তব্য কুয়েত। আমাদের সবার একই অবস্থা। কেউ যেতে পারছি না। সময়মত না গেলে ভিসা বাতিল করে দিবে। টাকা ও সময়তো নষ্ট হবে পাশপাশি আবার নতুন করে ভিসা খুঁজতে হবে।
শুধু নুরনবী নন। শুক্রবার থেকে কুয়েত সরকার বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাই কুয়েতগামী এমন শত শত যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। করোনা ভাইরাস যেন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে সেই সতর্কতার অংশ হিসেবে কুয়েত সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো হচ্ছে, মিশর, ফিলিপাইন, সিরিয়া, লেবানন, শ্রীলঙ্কা ও ভারত। কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়া কুয়েত সরকারের এমন ঘোষণার পর বাংলাদেশের কুয়েতগামী যাত্রীরা পড়েছেন রীতিমত বিপাকে। যেসব যাত্রীরা বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে কুয়েত যাওয়ার টিকেট কেটেছিলেন তারা শুক্রবার রাত থেকে বিমানবন্দরে এসে ভীড় করছেন। বিমানবন্দরে আসার পর অনেকেই জানতে পেরেছেন কুয়েতের ফ্লাইট বন্ধ। কাউন্টার থেকে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে আগামী এক সপ্তাহ ঢাকা থেকে কুয়েতের উদ্দেশে কোনো ফ্লাইট ছেড়ে যাবে না। সকল ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে। এক সপ্তাহ পর যাত্রীরা যেনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এতে করে কর্মের সন্ধানে কুয়েতের যাচ্ছেন এমন যাত্রীরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অনেক কুয়েত প্রবাসী ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন। ছুটি শেষ করে কাজে যোগ দেয়ার সময় এমন নিষেধাজ্ঞা তাদের ভোগান্তিতে ফেলেছে। অনেক যাত্রীরা নির্ধারিত সময়ে কুয়েত পৌঁছে কাজে যোগ দেবার কথা ছিল। দেরী করে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক ভিসা বাতিল করবে বলে আশঙ্কা করছেন প্রবাসীরা। এদিকে কুয়েতের এ ঘোষণার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নির্ধারিত দুটি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
গতকাল সরজমিন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ তে গিয়ে দেখা যায় কুয়েতগামী যাত্রীরা হতাশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। নোয়াখালীর সেনবাগের ইউসুফ আলী বলেন, আগে থেকেই বাংলাদেশ বিমানের টিকেট কেটেছিলাম। আজ (গতকাল) সন্ধ্যায় আমার ফ্লাইট ছিল। বিমানবন্দরে এসে জানতে পেরেছি কুয়েতের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ। তিন মাসের ছুটি ছিল। পুরো ছুটি শেষ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম সোমবার থেকে কাজে যোগ দিবো। এখন যেতেই পারছি না। ভিসা বাতিল হয়ে গেলে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপদে পড়তে হবে। আমার আয়েই সংসার চলে। নতুন করে ভালো ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এছাড়া বিমানের টিকেট করেছি। যদি কর্তৃপক্ষ কোনো সুযোগ না দেয় তবে অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়বো। একই ফ্লাইটের যাত্রী ফেনীর আলাউদ্দিন বলেন, কুয়েতের ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। বছরে নির্দিষ্ট কিছুদিন ছুটি পাই। ছুটি শেষে এখন কাজে যোগ দেবার কথা। বিমানবন্দরে এসে শুনছি কুয়েতের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ। আমাদেরকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। এখন এত দুর থেকে এসে ভোগান্তিতে পড়েছি। এখানে কথা বলার লোক খোঁজে পাচ্ছি না। শুধু কাউন্টার থেকে বলছে কুয়েতের ফ্লাইট বন্ধ। এছাড়া বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি। এখন আমরা অপেক্ষা করবো না বাড়ি চলে যাবো সেটাও বুঝতেছি না। যে এজেন্সি থেকে টিকেট কেটেছি তারাও আশানুরুপ কিছুই বলতে পারছে না। এখন বুঝে উঠে পারছি না কি করবো।
সাতক্ষীরার মাহমুদপুরের জাহিদুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইট বন্ধ আমি জানি না। কালকেই রওয়ানা দিয়েছি। এখানে এসে শুনি যাওয়া যাবে না। কবে যেতে পারবো সেটিও কেউ বলছে না। চার মাসের ছুটিতে আসার আগেই ১৩০ কুয়েতি দিনার দিয়ে আসা যাওয়ার টিকেট করেছি। এখন সেটি রিফান্ড হবে কিনা জানিনা। বলা হয়েছে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে। মাগুরা সদরের বাসিন্দা কুয়েত প্রবাসী নুর ইসলাম বলেন, ২০/২২ বছর ধরে আমি কুয়েত থেকে আসা যাওয়া করছি। কখনই এরকম হয়নি। ফ্লাইট দেরী হলে আগে থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি ১ সপ্তাহের জন্য বন্ধ। আমরা যারা দেশে আসি তারা সময় হিসাব নিকাষ করে টিকেট কাটি। যাতে নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে কাজ যোগ দিতে পারি। অনেক সময় দেরী করে গেলে মালিক কাজে যোগ দিতে দেয় না। অনেক সময় ভিসা বাতিল করে দেয়। যদি ভিসা বাতিল হয়ে যায় তবে অর্থনৈতিক ও মানসিক সমস্যায় পড়বো। তিনি বলেন, গতকাল মাগুরা থেকে এসেছি। এখন আবার মাগুরা চলে যেতে হবে। এক সপ্তাহ পরে যাওয়া যাবে কিনা সেটি জানিনা। কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা কুয়েতগামী যাত্রী মুজিবুর রহমান বলেন, ছুটিতে এসেছি। গত মাসেই আমার ছুটি শেষ হয়েছে। মালিককে বলে পীড়াপিড়ি করে ছুটি বাড়িয়েছি। এখন বর্ধিত ছুটিও শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে যাওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ আগেই টিকেট কেটেছি। এখন মনে হচ্ছে বড় সমস্যায় পড়ে গেছি। ভালো কোম্পানিতে কাজ করতাম। এটি হারালে কঠিন সমস্যায় পড়ে যাবো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ্ইচএম তৌহিদ-উল আহসান বলেন, কুয়েতগামী যাত্রীদের আমরা শান্তনা দিয়েই বলছি, কুয়েত সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি কুয়েত থেকেও কোনো ফ্লাইট আসছে না। এ ব্যাপারে আমাদের আসলে কিছুই করার নাই। তারা যেনো টিকেটের বিষয়ে বিমান কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কোম্পানিগুলো টিকেট রিফান্ড করে দিবে। আমরা এরকম পরামর্শ দিয়ে দিচ্ছি।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে কুয়েত যাওয়া যাত্রীদের করোনা ভাইরাস নেই এমন সনদ নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক করে কুয়েত। এমন সংবাদে প্রবাসীরা বিভিন্ন স্থানে সনদের জন্য দৌঁড়ঝাপ করার মধ্যেই কুয়েত এ ঘোষণা বাতিল করেন।







