লন্ডনে বাঙালি তরুণ খুনের ঘটনায় গ্রেফতার ৪ : আক্রমণকারী তরুণরাও বাংলাদেশি
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ
লন্ডন অফিসঃ গত ১১ এপ্রিল মঙ্গলবার পূর্ব লন্ডনে নিজ বাসার সামনেই ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ সৈয়দ জামানুর ইসলাম। তার বয়স মাত্র ২০ বছর। জামানুরকে ছুৃরিকাঘাত করে স্বজন ও স্থানীয়দের চোখের সামনে দিয়ে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পালিয়ে যাওয়া আক্রমণকারী তরুণদেরও দেখতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বলে মনে হয়েছে। তবে কী ঘাতকরাও বাংলাদেশি পরিবারের সন্তান? এমন ধারণা সত্যি হলে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য তা এক বড় অশনি সংকেত বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনরা। ২০ বছর বয়সী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ সাইদ জামানুর ইসলাম গত ১৭ এপ্রিল মঙ্গলবার তার নিজ বাসার সামনেই ছুরিকাঘাতে নিহত হন। জানা গেছে, কয়েকজন তরুণ জামানুরকে ঘর থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তায় হট্টগোলের আওয়াজ শুনে জামানুরের মা ও প্রতিবেশিরা বের হয়ে আসেন। তারা জামানুরকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছটপট করতে দেখেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও অ্যাম্বুল্যান্স এসে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ১১ এপ্রিল বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ ঘটনায় মোট চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
জামানুরের বাবা সাইদ আবদুল মুকিত। তাদের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে জামানুর সবার বড়। বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারার মাইলঅ্যান্ড এলাকার ওয়েগার স্ট্রীটে তাদের বাসা। প্রতিবেশি একাধিক ব্যক্তি পত্রিকাকে বলেন, তারা চিতকার চেঁচামেচি শুনে দ্রুত রাস্তায় বের হন। দেখেন একজন রক্তাক্ত তরুণ রাস্তায় ছটফট করছে। আর কয়েকজন যুবক দ্রুত একটি গাড়িতে উঠে সজোরে চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। হামলাকারীরাও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলার শাহাব উদ্দিন আহমদ বেলাল বলেন, একটা সময় ছিল আমাদের কমিউনিটির ছেলেরা বর্ণবাদী হামলায় নিহত হয়েছে বা ঘৃণাজনিত আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে খবর পাওয়া যেত। কিন্তু এখন প্রায়ই দেখা যায়, আমাদের কমিউনিটির ছেলেরাই একে অন্যকে খুন করছে। বিশেষ করে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটছে। এটি চরম উদ্বেগের। তিনি বলেন, পিতা-মাতাকে অবশ্যই এর দায় নিতে হবে। সন্তানকে মানুষ করতে পর্যাপ্ত সময় তারা দিচ্ছেন কি-না, তা নিয়ে ভাবতে হবে। ব্রিটেনের মত এমন সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন দেশে বড় হয়ে আমাদের সন্তানরা যদি খুন হয়, মাদকসেবী হয়-তাহলে এর চাইতে বড় পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে? ১৬ এপ্রিল রবিবার মেট্রোপলিটন পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, সাইদ জামানুর হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে ওইদিন সকালে নর্থ ইয়র্কশায়ার থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে গ্রেফতারকৃতদের বয়স ১৮, ১৫ ও ১৭ বছর। এর আগে ১১ এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের পরপর ১৮ বছর বয়সী একজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জামিনে ছাড়া হয়েছে। এদিকে গত ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পপলার মর্চুয়ারিতে নিহত জামানুরের বিশেষ ময়নাতদন্ত (পোর্স্টমর্টেম) সম্পন্ন হয়েছে। ছুরিকাঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাথমিক ধারণায় পুলিশ মনে করে ভুক্তভোগী জামানুর ওয়েগার স্ট্রীটে বন্ধুদের সাথে ছিলেন। ছেলেদের অন্য একটি দল এসে জামানুরকে উত্যক্ত করে। দুই পক্ষের বাদানুবাদের এক পর্যায়ে জামানুরকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তবে পুলিশ ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণের প্রতি না ঝুঁকে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করছে। ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেকটর টনি লিন্স বলেন, ঘটনার সময় ওই এলাকায় ছিলেন এমন যে কারও সাথে তারা কথা বলতে আগ্রহী।
জামানুরের বাবা সাইদ আবদুল মুকিত এক বিবৃতিতে বলেন, মায়ের চোখের সামনেই তারা তাদের প্রথম সন্তানকে হারিয়েছেন। কেউ চান না এভাবে তাদের সন্তান নিহত হোক। এ ঘটনায় তারা পূর্ণাঙ্গ বিচার দেখতে চান। হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান। ছুরিবকাঘাতের ঘটনা বন্ধে পিতা-মাতাদের সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, নাইফ ক্রাইম বন্ধে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাবেন। জামানুর যেদিন খুন হন, সেদিন লন্ডনে আরও দুজন ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। তাদের একজন লন্ডনের নর্থহলট এলাকায় ১৯ বছর বয়সী আবদুল্লাহি তারাবি এবং প্লামস্টেড এলাকায় ২৪ বছর বয়সী ক্রেসিডা ডিক। ওই তৃতীয় ঘটনার শিকার হয়েছিলেন মাইলঅ্যান্ডের সাইদ জামানুর ইসলাম। ওই একদিনের ঘটনাই প্রমাণ করে লন্ডনে তরুণদের মধ্যে নাইফ ক্রাইম কতটা ভয়াবহভাবে জেঁকে বসেছে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র জন বিগস এক বিবৃতিতে জামানুরে মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ঘটনার পরপরই পরিবারের সাথে দেখা করে তার সমবেদনা জানান এবং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সর্বাত“ক সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে মেয়র আরো বলেন, পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ তদন্ত শুরু করেছে এবং এব্যাপারে কারো কাছে কোন তথ্য থাকলে তা জানানোর জন্য অনুরুধ জানিয়েছে।
মেয়র বলেন, নাইফ ক্রাইম মোকাবেলা আমাদের অন্যতম এজেন্ডা এবং আমার জানা মতে পুলিশ এবং লন্ডন মেয়র সাদিক খান বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন।







