নিভৃতচারী শেখ রেহানার জীবন সংগ্রামের টুকরো টুকরো ঘটনা (২য় পর্ব)
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জানুয়ারি ২০১৭, ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
লন্ডন অফিসঃ একটি ফল, খাদ্যপ্রাণসমৃদ্ধ মৌমাত-করা ঘ্রাণযুক্ত ফল। আরবি শব্দ ‘রেহানা’র অর্থ এরকমই। শেখ রেহানা, তাঁর একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে। হয়তো এই পরিচয়েই নিভৃতে নিস্তরঙ্গভাবে আনন্দে-সুখে সারাটা জীবন পার করতেন, যদি পঁচাত্তরের নির্মম-নৃশংস ঘটনা না ঘটত। সেই ১৫ আগস্ট চিরদিনের জন্যে উলটেপালটে দিয়েছিল তাঁর ও তাঁর আপা শেখ হাসিনার জীবন। সে এক মহাবৈরী সময়। পাথরসময়। যেন সেই পাষাণের ভার আর নামবে না কোনোদিন। বলা যায়, ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন নতুন সংগ্রামে। তারপরের ঘটনার পরিক্রমা হার মানায় অতি কল্পঋদ্ধ উপন্যাাসকেও। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহার সাথে আলাপচারিতার ৪ পর্বের এ সপ্তাহে ২য় পর্ব। সুরমা নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা।
তাসমিমা হোসেন : কিন্তু তোমার দেখা পরিবারের যে ঘটনাগুলো- সেটাতো আমাদের ইতিহাস। এর একটা বিরাট মূল্য আছে। সেই দিক থেকে তোমার আত্মজীবনীও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ রেহানা : অনেক ঘটনা আমি অল্প অল্প করে লিখে রাখি। আর বেবী (মওদুদ) আপা জোর করে বসে থেকে লিখিয়ে নিত। বলত, আমি উঠব না। আর, অনেক সময় ঘটনা যখন দেখি মানুষ পেপারে মিথ্যা কথা লেখে, তখন আপাকে (শেখ হাসিনা) বলি- ‘আপা, এটাতো ডাহা মিথ্যা কথা।’ উনি বলেন, ‘তুমি লিখো না কেন?’ আমি তখন লিখে রাখি- ঘটনা এটা না, ওটা। আমি তখন ছোট হলেও অনেক ঘটনার সাক্ষী। আর বঙ্গবন্ধুর কোনো গুণ না পেলেও স্মরণশক্তিটা এই বয়সে এসেও আল্লাহর রহমে খুব ভাল আছে। একবার যেটা দেখি বা শুনি সেটা আর ভুলি না। কিন্তু অনেক জিনিস চোখের দেখা- এখন মনে পড়ে- ঐ যে সাতই মার্চের ভাষণ- আমি, আপা, দুলাভাই, আমরা তো সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। আব্বাতো কখনো ‘জয় পাকিস্তান’ বলে নাই। আব্বা নেমে যাওয়ার পরে আমরা বের হয়ে শহীদ মিনারের কাছে চলে আসলাম। স্পষ্ট মনে আছে। মানুষ যখন এই কথাগুলো বলে, সবাই না, কিছু লোক, তখন মনে হয় এই লোক এমন মিথ্যা কেন বলে? আব্বা বেঁচে নেই। যেই লোকটা বেঁচে নেই তার সম্পর্কে কেন মিথ্যা কথা বলছে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়- ছোট হলেও দেখতাম, কিভাবে কি ঘটনা ঘটছে, জানতাম দাঁড়ি। অনেক সময় মা আলোচনা করতেন। তারপর ৬ দফার সময় খুব ছোট ছিলাম। বাড়িতে তো একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। তারপর তাজউদ্দিন চাচাকে নিয়ে কত ধরনের কথা, সত্য- মিথ্যা মিশিয়ে। আব্বা ও তাজউদ্দিন চাচার মধ্যে যে একটা সম্পর্ক ছিল যেই যাই লিখুক, তাদের সম্পর্ক আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি ছিল। আব্বা জেলে কেন- এই প্রশ্নটা মনে আসত। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে, মানুষকে ভালবেসে- মায়ের মুখে দাদির মুখে শুনতাম। শুনতাম, কিন্তু মুখ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ বাড়ির সামনে সবসময় আইবি’র লোক।
তাসমিমা হোসেন : রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাও তো রাজনৈতিক ট্রেনিংয়ের মতো।
শেখ রেহানা : হ্যাঁ, আমিও আমার বাচ্চাদের রাজা-রানির গল্পের পাশাপাশি রাজনীতির কথা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখে যা শুনেছি- সেগুলো বলতাম। ওরা তখন অনেক ছোট, ওরা তো বুঝবে না যে কীভাবে ঘটেছে পঁচাত্তরের নৃশংস ঘটনা, ওরা তো গুলি বুঝত না। এটাকে অন্যভাবে বলতাম। বড় হয়ে তো ওরা নিেেজরাই বুঝতে পেরেছে। আমরাও মায়ের কাছে থেকে এভাবেই শিখেছি। মা-দাদির কাছ থেকেই বেশি শেখা। নানা ধরনের লোকজন আসত। এসবির লোকজন বাড়ির সামনে-পিছনে নানা জায়গায় থাকত। মা বলত. কেউ কিছু দিলে হাতে নিবে না, বাড়ির কোনো কথা কাউকে বলবে না। আমরা দুই ভাইবোন স্ট্যাম্প কালেক্ট করতাম। যখন মিরপুর রোডে আবাহনী বা সোবহানবাগে খেলতে যেতাম, কেউ প্রশ্ন করলে আমরা চুপ করে থাকতাম, বলতাম না। জিজ্ঞেস করত, বাড়িতে কে কে? কে আসে না আসে। যার জন্য একেক জনের বিশেষ কোড নাম ছিল। এ ইটওয়ালা, ও সিমেন্টওয়ালা, ও বালিওয়ালা।
তাসমিমা হোসেন : আমি সব সময় দেখেছি যে, তোমার কথার মধ্যে দারুণ সেন্স অব হিউমার প্রকাশ পায়। তুমি কোনো ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করো, ওটা যদি কষ্টেরও হয়, তার মধ্যেও একটা হিউমার থাকে।
শেখ রেহানা : হ্যাঁ, এভাবে নিজেকে আমি হাল্কা রাখি।
তাসমিমা হোসেন : তোমাদের তখন এত কষ্ট এত সংগ্রামের মধ্যেও কিন্তু মা তোমাদের ভাইবোনদের মানুষ করেছেন। এখনকার দিনে দেখা যায়, পাঁচটা বাচ্চা থাকলে অনেক সময় তিনটাই বখে যায়। আবার বাবা-মা যখন বিখ্যাত হন তখন অনেক সময় বাচ্চাদের মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু তোমরা একদম মাটির সাথে মিশে বড় হয়েছ। এই যে তোমার বাচ্চারা বিদেশে লেখাপড়া করে, তাদের নিয়েও মাটির সাথে গ্রামের সাথে একটা সংযোগ তৈরি করেছে। এই বৈশিষ্ট্য কি তুমি মা-বাবার কাছ থেকে পেয়েছ? না কি ভিতর থেকেই- বাংলার মাটি, বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকে পেয়েছ?
শেখ রেহানা : ভিতর থেকে তো অবশ্যই। দাদির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা। আর আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার মায়ের জীবনে এত কষ্ট, এত সংগ্রাম! ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য মাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। কিন্ডার গার্টেন, শাহীন স্কুল, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পড়ানো, নাচ শেখানো, বুলবুল একাডেমিতে ভর্তি করানো- সবই মায়ের উৎসাহে। অনেকে বলতেন- হ্যাঁ মেয়েকে নাচাবো নাকি। মা বলতেন- না, শিখুক সবকিছু, কখন কী দরকার হয়। মা সব সময় একটা কথা বলতেন, ঐ কার্পেট, ঐ ঝাড়বাতি- এগুলো কিন্তু কিছুই না। তোমার নিজস্ব যেটুকু, সেটুকুই তোমার। আমার বাচ্চাদেরকেও ঠিক সেভাবেই গড়েছি। যেদিন আপা (শেখ হাসিনা) পাওয়ারে আসলেন, আমরা গণভবনে গেলাম। আমার বাচ্চাগুলো তখন ছোট ছোট। ববি ছোট, টিউলিপ ছোট, রুপন্তী তো একেবারেই ছোট। আমি বললাম যে, এইগুলা কিন্তু নাট্যমঞ্চ, আসল না। আমার ছেলেকে বললাম, অনেক বয়স্ক লোক তোমাকে স্যার বলে সালাম দেবেন, তুমি কিন্তু নীচের দিকে তাকিয়ে সম্মান করবা। তুমি ববি, তুমি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাতি- এই কথাটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। এই দামি গাড়ি, এই চাকচিক্য- এগুলো কিছুই না। ওরা এখন পর্যন্ত সেই রকমই আছে। এটুকুই আমাদের জীবনের সার্থকতা। আর টাকা-পয়সা হিসেব করে চলার বিষয়টিও ছিল। দোকানে গেলে বেশি না, একটা মাত্র ভালো জিনিস কেনো- হয় চকলেট, আইসক্রিম বা অন্য কিছু। কিন্তু একটার বেশি নয়। এখন পর্যন্ত এটা ওরা ধরে রেখেছে। এখন তো ওরা নিজেরাই উপার্জন করে। কিন্তু এখনও বলি, একদিনে বেশি খুশি হয়ো না, কালকের জন্য রাখো। আজকে আইসক্রিম খাবে তো কেক হবে না।
তাসমিমা হোসেন : দারুণ ব্যাপার। এই সংযমটা আজকাল বাচ্চারা পারে না। শুধু বলে- দাও দাও। আর মায়েরা খুশি করার জন্য দিয়েও দেয়, সংযম শেখানোর কষ্টটা মায়েরা নিতে চায় না।
শেখ রেহানা : নতুন কিছু হাতে দেখলে প্রশ্ন করতাম, এটা কোথায় পেলে? ওরাও আমার কাছে নতুন কিছু দেখলে প্রশ্ন করে, মা এটা কোথায় পেলে? আমার মাও তাই করতেন। আমাদের সময় গল্পের বই আর গানের রেকর্ড- উপহারের মধ্যে তো এই দুটোই ছিল। এখন তো কত ধরনের উপহার!
তাসমিমা হোসেন : বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, সেই নৃশংসতার মধ্যেও কিছু মানুষ কুৎসা রটাল- ওই বাড়িতে অনেক সোনা-দানা, সোনার মুকুট। কিন্তু যখন বাড়ি সার্চ করা হলো-তখন এসব কুৎসা মিথ্যা প্রমাণিত হলে। কোথাও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কাগজপত্র- কিছুই দেখাতে পারল না। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িটি ছাড়া আর কোথাও কেউ কিছু দেখাতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলেও না। তোমরা বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে তখন দেশেও আসতে পারতে না। এই যে বলে, বাক্স ভর্তি টাকা এসেছে। লন্ডনে রেহানার বিপুল অর্থসম্পদ! এই যে একেবারে বানোয়াট কথা, এসব শুনলে তোমার কেমন লাগে? কতটা রাগ লাগে? আর তোমার বাচ্চাদের যে এত সুন্দর করে মানুষ করলে, সেটা দেখলেও আমাদের দেশের অনেকে ভাবে- এইসব অর্জন বুঝি বাংলাদেশে যেমন একে-ওকে ফোন করে পাওয়া যায়, তেমনি করে পাওয়া। বাংলাদেশে যেভাবে নমিনেশনও পেয়ে যায়, ভোটও পেয়ে যায়- ব্রিটেনে তো সেটা সম্ভব নয়। তাই, এসব মিথ্যা কথা তুমি কি করে সহ্য করো?
শেখ রেহানা: আগে খুব কষ্ট হতো, অভিমান হতো। আমরা এত কষ্ট করলাম- আব্বা প্রধানমন্ত্রী থাকার পরও বকশিবাজারে রিকশা করে যেতাম।
তাসমিমা হোসেন : তোমরা যখন লণ্ডনে গেলে, ঐ সময়? চেনা মানুষরাও তোমাদের পাশ দিয়ে যেত, তাকাত না। কিন্তু তুমি চাকরি করেছে, পাবলিক বাসে যাতায়াত করেছ-
শেখ রেহানা : হ্যাঁ আমি এখনো বাসে চড়ি, আমার একটুও লজ্জা করে না। আমার চাচা, আব্বার কাজিন, উনি বলতেন, মা আমি তোকে ট্যাক্সি করে দেই। আমি বলেছি, না আমি চলে যাব। ঐ তো স্টপেজ। বলেছি, চাচা, আব্বা যদি টাকা চুরি করে রেখে যেত এত জোরে কথা বলতে পারতাম? আমার বুকটা এত বড় হয়ে যায়। মাঝেমাঝে মনে হতো- বাচ্চাদের জন্য এটা-ওটা করতে পারছি না! আব্বা বলতেন ‘দেখো, অন্য লোকদের দেখো- তারা কত কষ্টে আছে। তোমরা তো তাও দুই বেলা ভাত পাচ্ছ।’ ঐ সব কথা চিন্তা করি, মায়ের কথা, দাদির কথা চিন্তা করি। আমার তো বাচ্চার দুধের টিনের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে না। আমি ওদের মুখে তাও তো কিছু দিতে পারছি। দাম কম হলেও একটা খেলনা তো কিনে দিতে পারছি, অন্যরা তো তাও পারেও না। আমরা তো মাটির পুতুল বা বিদেশ থেকে একটা উপহার আনলে ওটা শোকেসে রেখে দিতাম।
সুত্র ইত্তেফাক







