সিলেটের শারপিন টিলার পাথরখেকোরা এখনো সক্রিয়
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ৫:২৩ অপরাহ্ণ

ওয়েছ খছরু:
সাদাপাথর কাণ্ডের পর সিলেটের পাথর সাম্রাজ্য ডেডলক করে দিয়েছিল প্রশাসন। পাথরখেকোরা পিছু হটে। নিজেদের বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপও চালায় তারা। গ্রেপ্তার এড়াতে পালায় অনেকেই। এতে করে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে পাথররাজ্যে। সিলেটে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তার নামেই অনেক কিছু হয়ে যায়। সিলেটের শারপিন টিলা। আলোচিত একটি পাথর কোয়ারি। এটি আসলে কোয়ারি নয়, একটি পাহাড়। আউলিয়ার নামে টিলার নাম ছিল ‘শাহ আরেফিন টিলা’। এই টিলা থেকে গত দেড় যুগে অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়েছে। এখন সেখানে টিলার কোনো অস্বিত্ব নেই। বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। সর্বদলীয় পাথরখেকো চক্রের সদস্যরা ঐক্য গড়ে এই পাথর লুট করেছে। শারপিন টিলার পাথর লুটের ঘটনায় আলোচিত পাথরখেকো মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা চলছে। দুদকের তরফ থেকে ইতিমধ্যে তদন্ত করে আড়াইশ’ কোটি টাকার পাথর লুটের প্রমাণ পেয়েছে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে।
দুদকের মামলার পর মোহাম্মদ আলী আর দৃশ্যপটে নেই। তবে পাথরখেকোরা রয়েছে সক্রিয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাদাপাথর লুটের ঘটনার পর পাথরখেকোরা শারপিন টিলায়ও লুটপাট চালিয়েছে। মাত্র দুই মাসে ওই এলাকা থেকে কয়েক’শ কোটি টাকার পাথর লুটপাট করা হয়েছে। উত্তোলিত পাথরের মধ্যে বেশির ভাগই নৌপথে সিলেট থেকে পাচার করা হয়। কিছু অংশ বিক্রি করা হয় স্থানীয় ক্রাশার মিলে। সাদাপাথরের ঘটনায় প্রশাসন সক্রিয় হওয়ার পর এলাকা ছেড়ে পালায় শারপিন টিলার পাথরখেকোরা। দেয় গা ঢাকাও। অনেকেই সিলেট ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করেন। মাসখানেক আগে থেকেই পাথরখেকোরা ফের এলাকায় ফিরেছে। এরপর থেকেই তারা শারপিন টিলা লুটপাট শুরু করে। বিষয়টি যায় সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের কানেও। খবর পেয়ে তিনি ১০ই নভেম্বর শারপিন টিলা পরিদর্শন করেছেন। সরজমিন পাথর উত্তোলনে সরঞ্জামাদিও পান তিনি। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, যেকোনো মূল্যে শারপিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা হবে। সেইসঙ্গে আইনের আওতায় আনা হবে লুটেরাদের। জেলা প্রশাসকের এমন হুঁশিয়ারির পর কিছুটা বন্ধ হয় পাথর উত্তোলন।
পাথরের গর্ত থেকে উঠিয়ে নেয়া হয় লিস্টার মেশিন। তবে এরমধ্যেও ব্যতিক্রম ছিলেন দু’চারজন যারা ডিসি’র হুঁশিয়ারির পরেও মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করতে থাকেন। এদিকে জেলা প্রশাসক ফিরে আসার পর শারপিন টিলায় অভিযান জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে পাথর উত্তোলন পরিবহন মজুত ও ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রায় ১৫ জনকে জেল-জরিমানা দেয়া হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জালিয়ারপাড়ের বাবুল আহমদ ও চিকাডহরের আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে চলছে এই লুটপাট। এতে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা হুঁশিয়ারও। তার ভাই ও স্বজনরা মিলে নেতৃত্ব দিচ্ছে লুটপাটের। ইতিমধ্যে তারা অর্ধশতাধিক গর্ত খুঁড়ে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর লুট করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
পাথর লুট বন্ধ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে টিলা থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে রাস্তায় লোহার পাইপ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের ভোলাগঞ্জ পয়েন্টে রাস্তার সংযোগ স্থানে বসানো হয়েছে এই ব্যারিকেড। দু’পাশে লোহার খুঁটি ও উপরে লোহার পাইপ দিয়ে বসানো এই ব্যারিকেড দিয়ে সিএনজি-অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারবে। তবে বড় গাড়ি পার হতে হলে উপরের লোহার পাইপ খুলে দিতে হবে। এ জন্য সেখানে আনসার ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ইউএনও মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানিয়েছেন, শারপিন টিলার পাথর যাতে কেউ পরিবহন করতে না পারে সেজন্য রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া, টিলার সঙ্গে সংযুক্ত সকল রাস্তা এস্কেভেটর দিয়ে কেটে দেয়া হবে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি রতন শেখ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, টিলার পাথর লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। এরমধ্যে ১৫ জনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।







