আদালতের জব্দকৃত সম্পদ বিক্রি করছে পলাতক সাবেক এমপি রণজিৎ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:২২ অপরাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্কঃ
যশোর-৪ আসনের সাবেক এমপি ও বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রণজিৎ কুমার রায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে উপার্জিত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এসব সম্পদ বর্তমান সরকার জব্দ করলেও তা গোপনে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি রণজিত রায়ের ছেলে পলাতক রাজিব কুমার রায় নিজ মালিকানাধীন তিনটি ট্রাক বিক্রি করেছেন। আহাদ পার্সেল এন্ড কুরিয়ার সার্ভিস নামের প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যে এই তিনটি ট্রাক ক্রয় করেছে। আহাদ পার্সেল এন্ড কুরিয়ার সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী আহাদ আলী এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, যশোর-৪ আসনের সাবেক এমপি রণজিত কুমার রায়, তার স্ত্রী নিয়তি রানী রায়, ছেলে রাজিব কুমার রায় ও সজিব কুমার রায়ের নামে থাকা ৪টি ফ্ল্যাট, ২টি বাড়ি, ৩টি ট্রাক, ৬০টি দোকানসহ ৭৯ দশমিক ৬২ বিঘা জমি ও ১৩৭টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ২ কোটি ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৭ টাকা ও জনতা ব্যাংক যশোরের জেস টাওয়ার শাখাসহ বিভিন্ন ব্যাংকের লকারে থাকা প্রায় সাড়ে ৬শ’ ভরি স্বর্ণালঙ্কার অবরুদ্ধের আদেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। কিন্তু আদালতের সেই রায় মানা হচ্ছে না। আদালতের রায়কে তোয়াক্কা না করে রণজিত রায় ও তার সন্তানরা তাদের বৈধ-অবৈধ সব সম্পত্তি গোপনে বিক্রি করে দিচ্ছে। ব্যাংকের বিভিন্ন একাউন্টস ও লকার থেকে টাকা সোনা তুলে নিয়ে তাদের সেকেন্ড হোম ভারতে নিয়ে যাচ্ছে।
রণজিত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যশোর উপশহরে ১৩৫৬ বর্গফুটের ২টি ফ্ল্যাট ও যশোর শহরে ১২২৪ বর্গফুটের আরও ২টি ফ্ল্যাট, চার ও তিনতলার ২টি বাড়ি, ৩টি ট্রাক, অভয়নগর উপজেলায় ৬ হাজার ৬ বর্গফুটের নির্মাণাধীন ৬০টি দোকান ও ৭৯ দশমিক ৬২ বিঘা জমি অর্জনের অভিযোগ ওঠে।
এসব জমির মধ্যে রণজিত কুমার রায়ের নামে রয়েছে ৩১ দশমিক ৪৮ বিঘা, তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১ দশমিক ৭৫ বিঘা ও তাদের সন্তানদের নামে রয়েছে ৪৬ দশমিক ৩৯ বিঘা জমি। এসব জমির মোট দলিল মূল্য ১৭ কোটি ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৫০ টাকা।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রণজিত কুমার রায়ের ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ৭১ লাখ ৪১ হাজার ৩৭৮ টাকা, তার স্ত্রীর ২১টি ব্যাংক হিসাবে ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬ টাকা ও ৩শ’ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, তাদের সন্তান রাজীব কুমারের ৪৪টি ব্যাংক হিসাবে ৬৮ লাখ ৭ হাজার ৬০২ টাকা ও সাড়ে ৩শ’ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, তার নিয়তি ট্রেডে আছে ১৪ হাজার ৩০১ টাকা, রাজীবের স্ত্রী রিশিতা সাহার ২০টি ব্যাংক হিসাবে ৪০ লাখ ৭ হাজার ৯৮৪ টাকা, রণজিতের ছেলে সজীব কুমারের ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৬৪ টাকা ও সজিবের স্ত্রী অনিন্দিতা মালাকার পিউ’র ব্যাংক হিসাবে ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ২৫২ টাকা রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকার একটি আদালত এসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে জমাকৃত টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার জব্দ করলেও তা আর সরকারের আয়ত্তে থাকছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের ম্যানেজার বলেছেন, আদালত রণজিত রায় ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করেছে কিনা তার কোনো চিঠি বা আদেশ আমরা পাইনি। যে কারণে চেক দিলেই আমরা টাকা দিতে বাধ্য।
আদালত কতৃর্ক জব্দকৃত এসব সম্পত্তির মধ্যে সমপ্রতি রণজিত কুমার রায়ের ছেলে রাজিব রায় আহাদ পার্সেল এন্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কাছে ৫০ লাখ টাকা মূল্যে তিনটি ট্রাক বিক্রি করে দিয়েছেন। ট্রাক ৩টির নম্বর হলো যশোর-ট ১১-৬০৮২, যশোর-ট-১১-৩৮৫৪ ও ঢাকা মেট্রো-ড-২০-৩৩৯৯। ট্রাক ৩টি বিক্রির ক্ষেত্রে রণজিত কুমার রায়ের পালিত ছেলে দুর্গা নাথ রাজিব রায়কে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। শুধু তাই নয়, পালিত ছেলে দুর্গা নাথ পলাতক রাজিব রায়ের স্বাক্ষরিত চেক দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসার থেকে জমাকৃত টাকা তুলে তা ভারতে অবস্থানরত রাজিব রায়ের কাছে পাঠাচ্ছেন। একই ভাবে সাবেক এমপি রণজিত কুমার রায়, নিয়তি রানী রায়, সজিব কুমার রায় ও তাদের দুই ভাইয়ের স্ত্রীদ্বয়ের স্বাক্ষরিত চেক দিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এছাড়া রাজিব রায় ও তার মায়ের ব্যাংকের লকার থেকেও স্বর্ণালঙ্কার তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রতি মাসে জব্দকৃত বাড়ি, ফ্ল্যাট ও দোকান থেকে ভাড়া আদায় করছেন দুর্গা নাথ। সমপ্রতি যশোরের বাঘারপাড়ায় ও অভয়নগরের তিনটি মৌজার ১২ বিঘা ২০ শতক জমি বিক্রয় করে সমুদয় টাকা রণজিত কুমার রায়ের কাছে পাঠিয়েছেন এই দুর্গা নাথ। কথা উঠেছে সাবেক এমপি রণজিত কুমার রায় ও তার স্ত্রী, ২ ছেলে ও ছেলেদের বউ সকলেই পালিয়ে ভারতে অবস্থান করলেও কীভাবে তাদের নামে থাকা জমি বিক্রি হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। আর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব সম্পত্তি কীভাবে হাতবদল হচ্ছে- তা নিয়ে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যশোর বারের একাধিক আইনজীবী। তাছাড়া এই দুর্গা নাথ রণজিত কুমার রায় ও তার পরিবারের সদস্যদের পালিয়ে যেতেও সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে দুর্গা নাথের সঙ্গে শহরের বারান্দি নাথ পাড়ায় গিয়ে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আইন মেনেই সব চলছে। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি।







