সিলেটে বিএনপি নেতার শেল্টারে মেয়েকে অপহরণ, নিঃস্ব অসহায় পরিবার
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ জুলাই ২০২৫, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ
বালাগঞ্জ প্রতিনিধি:
পাওনা টাকার জন্য চাপ দেওয়ায় কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। মেয়েকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে মামলা করলে ভিকটিমের পরিবারের উপর নেমে আসে নির্যাতন। তাদেরকে সাজানো মামলায় জড়িয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়। হুমকিতে ভিকটিমের ভাই-বোনেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন ভিকটিমের মা হেপি বেগম। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদালত আর থানা পুলিশের কাছে ধর্ণা দিয়ে ওই পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
হেপি বেগম সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের শিওরখাল-বড়জমাত গ্রামের আব্দুল হকের স্ত্রী। ২৮জুলাই বালাগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিগত ৫মাসে তার পরিবারের উপর নির্যাতনের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন হেপি বেগম। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, তার মেয়েকে অপহরণ ও ধার দেওয়া টাকা উদ্ধারে ২৭ মে বালাগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে থানার এসআই শাহ্ ফরিদ আহমদ তার বাড়িতে গিয়ে অভিযোগটি তদন্ত করেন। হেপি বেগম অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করার পর আমাকে থানায় ডেকে পাঠালেও স্থানীয় বিএনপি নেতা তোফায়েল আহমদ সুহেল দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মামলা না নিতে পুলিশকে চাপ দেন। এজন্য মামলার অগ্রগতি করেনি পুলিশ। নিরুপায় হয়ে ৩জুন সিলেটের আদালতে একটি মামলা করেন তিনি, মামলা নং- ২০৬। মামলার উদৃতি দিয়ে হেপি বলেন, ২৫ মার্চ শিওরখাল কদমতলা গ্রামের আব্দুল খালিকের ছেলে কয়েস আহমদ তার আর্থিক সংকটের কথা বলে আমার কাছ থেকে টাকা ধার নেন। বিএনপি নেতা সুহেলের সেল্টারে ২৮এপ্রিল আমার মেয়ে হাবিবাকে অপহরণ করেন লিটনসহ তার সহযোগিরা। এই মামলায় লিটনকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। এছাড়া, লিটনের ভাই কয়েস, সেজন, সাজন, বোন রিতা, হেলিমা, পশ্চিম হায়দরপুর গ্রামের তারিক উল্যার ছেলে কামাল, শিওরখাল বড়জমাত গ্রামের হরুপ মিয়ার ছেলে এমরানকে অভিযুক্ত করা হয়। পিবিআই’র অধিনে মামলাটি তদন্তাধীন। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় হতাশ হেপির পরিবার।
হেপি বলেন, এক পর্যায়ে জানতে পারি আমার মেয়েকে অপহরণ করে উপজেলার নলজুড় গ্রামে লিটন ও কয়েসের মামার বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। মেয়েকে উদ্ধার করতে আবারও থানা পুলিশের দ্বারস্থ হলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয় পুলিশ। ৮ জুলাই আমি আদালতে মামলা দায়ের করি। বালাগঞ্জ সিআর মামলা নং-৯৬। আদালত ভিকটিমকে ১০জুলাইয়ের মধ্যে উদ্ধার করার জন্য ৮জুলাই বালাগঞ্জ থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। বালাগঞ্জ থানার এসআই সৌরভ সাহাকে উদ্ধার তল্লাশীর দায়িত্ব দেয়া হয়।
হেপি অভিযোগ করে বলেন, তল্লাশীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খরছের কথা বলে আমাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেন। আবার বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের সাথে আতাত করে আমাদেরকে না জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা লোক দেখানো তল্লাশী করেন। যথাস্থানে ভিকটিমকে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে অভিযুক্তদের মনোনিত লোকজনের স্বাক্ষর নিয়ে তল্লাশী কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে ৯জুলাই ‘শূন্য তল্লাশী’ নামে আদালতে প্রতিবেদন প্রেরণ করায় আমরা রীতিমত বিষ্মিত হয়েছি। হেপি বেগম বলেন, ২৭ মে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের শেল্টারদাতা বিএনপি নেতা সুহেলের প্রত্যক্ষ উস্কানিতে ওই দিন রাত ৯টার দিকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার বাড়িতে গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে বসতঘরে ইট-পাথর ছুড়ে ভাঙচুর ও ক্ষতি সাধন করেন। টাকা- স্বর্ণালঙ্কার লুট করে বসতঘরে অগ্নি সংযোগ করা হয়। ৯৯৯- এ কল পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। এঘটনায় স্থানীয়ভাবে বিচার না পেয়ে আমি ৪জুন সিলেটের আদালতে মামলা দায়েন করি। বালাগঞ্জ সিআর (দ্রুত বিচার) মামলা নং-৩৭। মামলা করার পর সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকিতে আমার পরিবার গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। আবারও শুরু হয় নির্যাতন। বিএনপি নেতা সুহেলের পত্যক্ষ ইন্ধনে অভিযুক্তরা ১৯ জুন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার বাড়িতে উঠে আমাদেরকে আক্রমণ করেন। ঘর থেকে বের হয়ে দ্রুত দৌড়ে আমরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেই। এসময় আমার ঘরের দরজা ভাঙচুর করে মূল্যবান মালামাল লুটপাট করে গরুর ঘর, খড়ের ঘর ও বসতঘরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। আগুনে ৩টি ষাঁড় গরুসহ সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। লুটপাট, ভাঙচুরের তান্ডব ও অগ্নিসংযোগে আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে এখন নিঃস্ব। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে জানমালের নিরাপত্তার জন্য আমি ফের বালাগঞ্জ থানায় মামলা করতে যাই। কিন্তু হামলাকারী সন্ত্রাসীরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং তারা বিএনপি নেতা সুহেলের আশ্রয়-পশ্রয়ে থাকায় থানা পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে আদালতে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেওয়া হয়। ন্যায় বিচারের আশায় আমার স্বামী আব্দুল হক বাদী হয়ে ২৯জুন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। বালাগঞ্জ সিআর মামলা নং-৮৫।
এই মামলায় দুস্কৃতিকারী সন্ত্রাসীদের গডফাদার বড়জমাত গ্রামের আব্দুস সোবহানের ছেলে বিএনপি নেতা সুহেল, সেজন, লিটন, শিওরখাল গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে সালমান, এমরান, কয়েস, শিওরখাল কদমতলা গ্রামের আপ্তাব উল্যার ছেলে কামিলসহ আরও ৩-৪জনকে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নথিভুক্ত করে বালাগঞ্জ থানার ওসিকে এটি এজাহার হিসেবে গণ্য ও মামলা হিসেবে রুজু করে ৩০ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন। মামলার তদন্তভার দেয়া হয় বালাগঞ্জ থানার এসআই শাহ ফরিদ আহমদকে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা অদৃশ্য ইশারায় ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গ্রেলেও কালক্ষেপণ করে তিনি এখনও তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ না করায় আমিও আমার পরিবার ন্যায় বিচার পওয়া নিয়ে শঙ্কিত। মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তাদের অপেশাদার সুলভ আচরণে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন হেপি বেগম। পুলিশের অসৎ তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি প্রদানে প্রশাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্ঠি আকর্ষণ করেছে।








