সিলেটের অপরাধ জোন বালুচরে ফের খুনাখুনি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ৫:০৪ অপরাহ্ণ

ওয়েছ খছরু:
অপরাধ জোন বালুচরের একটি পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নাড়া দিয়েছিল সিলেটবাসীকে। তখন আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতায়। বালুচরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচিত আরিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। দোষ পড়ে স্থানীয় কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা হিরণ মাহমুদ নীপুর ওপর। সেই থেকে পলাতক নীপু। মাঝখানে কিছুদিন জেলবাসের পর ফের তিনি ফেরারি হয়েছেন। এখন নীপু এলাকায় নেই। এলাকার নিয়ন্ত্রণও হাত বদল হয়েছে। বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের মূল স্রোতের নেতারা বালুচরে এসবে নেই। ছাত্রলীগের সঙ্গে থাকা কিশোর গ্যাং কর্মীদের গোপনে কেউ কেউ শেল্টার দিচ্ছেন। এ নিয়ে নতুন করে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বালুচর। আর অপরাধ জোন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঘটেছে আলোচিত আরও একটি হত্যাকাণ্ড। নিহত হয়েছে বালুচরের এক সময়ের নিয়ন্ত্রক বুলেট মামুনের ভাই ফাহিম আহমদ। এ ঘটনায় ফের সক্রিয় বালুচরের আন্ডারওয়ার্ল্ড। তবে এলাকার মানুষ এখন নড়েচড়ে বসতে চাইছেন। ইতিমধ্যে কয়েকটি পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সভাও করেছেন। ঘটনাটি ১০ই নভেম্বরের। স্পট দুই নম্বর মসজিদের আলোচিত সেই গলি। যে গলি ‘অপরাধ গলি’ হিসেবে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত। গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই গলি নিয়ন্ত্রণ করতো ছাত্রলীগের ক্যাডাররা।
শেল্টারে ছিলেন কাউন্সিলর নীপু। এখন নিয়ন্ত্রণ করে নুরুজ্জামানসহ কয়েকজন। তারা সরাসরি বিএনপি’র সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। ঘটনার দিন উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন ফাহিম আহমদ। ওখান থেকে উদ্ধার করে তাকে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ১২ই নভেম্বর সে মারা যায়। তবে মারা যাওয়ার আগে ফাহিম বলে গেছে ঘাতকদের নাম। তার ভাষ্যের ভিডিও ফুটেজ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এরমধ্যে একটি নাম হচ্ছে মাইল্লা। ভয়ঙ্কর অপরাধী সে। কথা আগে অস্ত্র চালায়। ফাহিমের দেয়া ভাষ্য মতে; মাইল্লা, পেটকাটা ফাহিম, আলম, সবুজ, নুরুজ্জামান, তুহিন, দুবাই মুন্না, রনি, কুদ্দুস, জুয়েল ও রশিদসহ কয়েকজন তার ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। তারা দল বেঁধে এসে ফাহিমকে ছুরিকাঘাত করে। ঘটনার পর থেকে ফের কাঁপছে বালুচর। আরিফ হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে ভয় ঢুকেছিল ফাহিম হত্যাকাণ্ডের পর সেই ভয় এখন নতুন করে তাদের তাড়া করছে। তবে এখন এলাকা অনেকটা শূন্য। অপরাধীরা গা ঢাকা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানা, বালুচর এখন আর আগের বালুচর নয়। গোটা এলাকাই অপরাধীদের অভয়ারণ্য। ২ নম্বর মসজিদ গলির সড়ক হচ্ছে অপরাধের হেড কোয়ার্টার। এ ছাড়া জোনাকি গলি, সোনাবাংলা এলাকায় প্রতিদিন শত শত যুবক আড্ডা দিতো। বালুচর হয়ে উঠেছিল ছিনতাইয়ের স্পট। কখন কে ছিনতাইয়ের শিকার হয় সে নিয়ে মানুষ তটস্থ থাকতেন। মাদকের সাম্রাজ্যও। এতে করে সাধারণ মানুষের জীবন বিষিয়ে উঠেছে। তারা জানান, এক সময় যারা ছাত্রলীগের ছায়াতলে বসে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতো এখন তারাই যুবদল বা ছাত্রদলের নামে নিয়ন্ত্রণ করে।
নাম পাল্টেছে কিন্তু মানুষ পাল্টেনি। যারা ছিল তারাই আছে। পাশেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বালুচর এলাকায় বসবাস করেন। এলাকার পরিবেশের কারণেই অনেকেই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। ফাহিম হত্যাকাণ্ডের পর বালুচরে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এলাকাবাসী। তারা জানান, যারা অপরাধী তাদের সঙ্গেই পুলিশের সখ্যতা। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবে কে? নিহত ফাহিমের ভাই বুলেট মামুনের ভয়ে এক সময় সবাই তটস্থ থাকতেন। মাসখানেক আগে বুলেট মামুন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন মাইল্লা দিচ্ছে নেতৃত্ব। নুরুজ্জামানসহ কয়েকজন শেল্টার দিচ্ছে। ঘটনার পর পুলিশের কার্যক্রমও রহস্যজনক বলে জানান তারা। বলেন, ডাকলেও পুলিশ মিলে না। অনেক ঘটনাই ঘটে এলাকায়। কিন্তু পুলিশ আসে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর। বালুচরবাসী যেন প্রাণ হাতে নিয়ে ঘোরেন। এলাকার প্রতিটি গলিতে মাদক বিকিকিনি, সেবন, সশস্ত্র মহড়া সবই চলে। আর এসব হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঢিলেমির কারণে। ফাহিম হত্যাকাণ্ডের পর এলাকার মানুষ প্রতিবাদী হয়েছে। ইতিমধ্যে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করে ফাহিমের খুনিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমে পুলিশ সক্রিয় না হলেও মামলা দায়েরের পর আসামিদের ধরতে অভিযানে নেমেছে। বৃহস্পতিবার রাতে থানায় হত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন তার পিতা মো. হারুন রশীদ। মামলার এজাহারে ৭ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৭-৮ জনকে অজ্ঞাত হিসেবে আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়ের করার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে সবুজ আহমদ রেহান নামের এক আসামিকে নগরের ইকোপার্ক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রেহান জৈন্তাপুর থানার যশপুর গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও মাসুমা বেগমের ছেলে।
গ্রেপ্তারকৃত সবুজকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও বলেছে জানান এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সিলেটের শাহপরান থানার ওসি মনির হোসেন মানবজমিনকে জানান, মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযানে রয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। নিহত ফাহিম সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের হারুন রশীদের ছেলে। পরিবারসহ সিলেট নগরীর শাহপরান থানার বালুচর ছড়ারপাড় এলাকায় থাকতেন তিনি। ফাহিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বালুচরের সামাজিক নেতৃবৃন্দ সরব হয়েছে। অন্যতম অপরাধ জোন জোনাকী এলাকার মানুষ সন্ত্রাস, মাদক প্রতিরোধ একটি ঐক্য পরিষদ গঠন করেছেন। সিলেটের সাংবাদিক বদরুর রহমান বাবর ওই এলাকার বাসিন্দা। তিনি জানান, তার আহ্বানে গত শুক্রবার রাতে বৈঠক হয়েছে। এলাকার স্বার্থে সবাই এক হয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার তাগিদ অনুভব করেছেন। ফলে সার্বিক বিষয় নিয়ে বড় পরিসরে বসা হবে, আসবে সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে কর্মসূচি দেয়া হলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে নামবেন বলে জানান তিনি।







