হাতকড়া-শেকল পরিয়ে আরও ৩০ বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৬:৫৭ অপরাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্কঃ
হাতকড়া ও শেকল পরিয়ে আরও ৩০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। তাদেরকে বহনকারী বিশেষ ভাড়া করা বিমানটি বৃহস্পতিবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। রানওয়ে পর্যন্ত শেকল পরিয়েই তাদের আনা হয়েছে। এরপর রানওয়ে থেকে শেকল খুলে অ্যারাইভাল গেটে আনা হয়। এসময় কাউকে তাদের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। কাউকে কোনো ধরনের ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি। ফেরত আসাদের মধ্যে একজন নারীও আছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দীর্ঘযাত্রা ও শেকল পরে থাকায় আগতরা ছিলেন বিধ্বস্ত। ওই সময় নোয়াখালীর ২২ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ্ বিমানবন্দরে হতাশা প্রকাশ করে বলতে থাকেন, এ লম্বা যাত্রায় পুরোটা সময় হাতে পায়ে আসামিদের মতো শেকল পরিয়ে রেখেছিল, একে তো দেশে ফেরত আসার হতাশা তার ওপরে টেরোরিস্টের মতো হাতেপায়ে শেকল পরিয়ে মাতৃভূমিতে আসার ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কারো না হোক। ফেরত আসা ব্যক্তিরা জানান, প্রায় ৬০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রায় তাদের হাতকড়া ও শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রণা নিয়ে বসে থাকতে হয়েছে। খেতে দেওয়া হয়েছে শুধু রুটি আর পানি। এমনকি টয়লেটে যাওয়ার সময়ও একজন অফিসার নিয়ে যেতেন, আবার শেকলে বেঁধে দিতেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র বলছে, রাত ১১টার পরপর বিমানটি নামলেও তিন ঘণ্টা সেটি রানওয়েতে ছিল। এ ৩ ঘণ্টায় তাদের হাতকড়া ও শেকল খোলা হয়। বিমান বন্দরের অ্যারাইভাল এরিয়াতে পৌঁছানোর আগেই সবাইকে শেকলমুক্ত করে দেওয়া হয়। পরে রাত ২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে তাদের বিমানবন্দরে আনা হয়। এসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ টিম, কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ টিম এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের পক্ষ থেকে তাদের বাড়ি পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় কয়েক দফায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসে অন্তত ১৮০ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর তথ্য জানা গেছে। প্রথম দিকে হাতকড়া ও শেকল না পরানো হলেও ২ আগস্ট একটি সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ সি-১৭ করে এক নারীসহ ৩৯ বাংলাদেশিকে দেশে পাঠানো হয়। তাদের সবার হাতকড়া ও শেকল ছিল। বৃহস্পতিবারও সবার হাতে হাতকড়া ও শেকল ছিল।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও এইচএসআইএ’র ইমিগ্রেশন বিভাগের সূত্র বলছে, চলতি বছরের ৮ জুন একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে আরও অন্তত ৩৪ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ১৮০ ছাড়িয়েছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশে দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হলে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কারণে চার্টার্ড ও সামরিক ফ্লাইটের ব্যবহার বেড়েছে। বেশির ভাগ অভিবাসী মেক্সিকো বা লাতিন আমেরিকার দেশ বা অন্য কোনো পন্থায় ৩০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। বৃহস্পতিবার ফিরে আসা কর্মীদের বড় একটি অংশ জানিয়েছিল তারা মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে মেক্সিকোতে মাফিয়াদের কাছে আটক হয়। অন্তত ৬ জন জানিয়েছে তাদের জিম্মি করে, অত্যাচার করে পরিবারের থেকে ৪০-৫০ লাখ টাকা করে আদায় করে।
২০১৬ সালে ২৭ বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে। তারা বিশেষ ফ্লাইটে এসেছিলেন, আর যাত্রাপথে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল। এ দৃশ্য তখন দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এভাবে শেকল পরানোয় মানবাধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন, যা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে আলোচনাও হয়েছিল। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রত্যাবাসনের সময় হাতকড়া ও শেকল ব্যবহার পরানো উচিত নয়। সাধারণ অভিবাসীদের হাতকড়া বা শেকল পরিয়ে ফেরত পাঠানোটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থি।







