লোভাছড়া পাথর লুটে শতকোটি টাকার সম্পদ তমিজের
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১১:১০ অপরাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্কঃ
লোভাছড়া পাথর কোয়ারির তীরে দাঁড়ালে চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি বাড়ি। এর মধ্যে একটি বাড়ি চেয়ারম্যান তমিজ উদ্দিনের। বাকি সব বাড়ি তার ভাইদের। বাড়িগুলোর দিকে তাকালে চোখ আটকে যায়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়িগুলো। টাইলস নিয়ে আসা হয়েছে বিদেশ থেকে। তমিজের বাড়ি জুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরার জাল। ঘরে বসেই তিনি দেখেন বাড়ির বাইর, ভেতর সব। বাড়ির ভেতরে থেকেই তিনি পর্যবেক্ষণ করেন বাইরের দৃশ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলেই ‘হাওয়া’ হয়ে যান। পরে আবার প্রকাশ্যে আসেন। তমিজের এই বাড়িকে ঘিরে নানা কথা প্রচলন আছে লোভাছড়ায়। বাড়ির ভেতরে রয়েছে গোপন কক্ষ। চেয়ারম্যান তমিজ ওই কক্ষে আশ্রয় নেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চলে গেলে ফের বাইরে আসেন। সিলেটের লোভাছড়া। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। নদীবেষ্টিত এলাকা। সিলেট কিংবা কানাইঘাট থেকে যেতে হলে নৌকাই ভরসা। আর এই লোভাছড়ায় নিজের সিংহাসন গড়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান তমিজ উদ্দিন। তিনি লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও ইউনিয়নের সভাপতি। পাশেই দেশ জুড়ে আলোচিত ডোনা সীমান্ত। যে সীমান্ত দিয়ে ভারত পালাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিচারপতি মানিক ও রায়হান হত্যা মামলার আসামি সাবেক এসআই আকবর হোসেন। এটিও তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা। চোরাকারবারের স্বর্গরাজ্য ওই সীমান্ত। পাথরেরও খনি। সেই খনি লুটে এবং চোরাকারবারি করে তমিজ এখন শতকোটি টাকার মালিক। তার সম্পদের শেষ নেই। স্থানীয়দের মতে তার টাকার জোর এতটাই যে- আওয়ামী লীগের লুটেরাদের নেতা হয়েও তমিজ এখনো বহাল তবিয়তে। দু’হাতে টাকা বিছিয়ে ধরপাকড় থেকে নিজেকে রেখেছেন নিরাপদ। তবে; বর্তমান সময়ে তমিজ চেয়ারম্যান কানাইঘাটে বেশ আলোচিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি জনপ্রতিনিধিরা। গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন তারা। দপ্তরে দপ্তরে দিয়েছেন অভিযোগও। ইউনিয়ন পরিষদে করা হয়েছে অপদস্থ। এতে কিছুটা ভয় পেয়েছেন তমিজ। গত ১৫ দিন ধরে রয়েছেন আড়ালে। কেউ বলছেন; ভারত পালিয়েছেন, আবার কেউ বলছেন আত্মগোপনেই আছে এলাকায়। লোভাছড়ার তীরবর্তী সাউদ গ্রামে বাড়ি তমিজ উদ্দিনের। এক সময় অখ্যাত হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সাধারণ একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সম্পদ বলতে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্য খুলে যায়। কানাইঘাটের বাসিন্দা ও সিলেট আওয়ামী লীগের নেতা মোস্তাক আহমদ পলাশের সঙ্গে জুটি বাঁধেন তিনি। এরপর থেকে তাকে আর পিছু তাকাতে হয়নি। ২০১৩ সালে ইউপি নির্বাচনে মেম্বার নির্বাচিত হন। এতে এলাকায় দাপটবাজ হয়ে উঠেন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন ডোনা সীমান্তের চোরাচালানে। সীমান্তের রাজা নিজে ভারত থেকে নিয়ে আসতেন চিনি, পার্টস, গরু, মহিষ সহ নানা পণ্য। অর্ধশতাধিক যুবককে নিয়ে গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে গড়ে উঠে সখ্যতা। এই সুযোগে সীমান্ত চোরাকারবারি করে তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। দাপটের সঙ্গে করেন মেম্বারগিরিও। দুইবার তিনি মেম্বার নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২২ সালে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই সিলেট অঞ্চলের পরিচিত পাথর কোয়ারি লোভাছড়ার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেন তিনি। সীমান্তের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ৫ই আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতারা ডোনা সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তমিজ আলোচিত হন। ২০১৫-১৬ সালের দিকে তার নেতৃত্বে শুরু হয় লোভাছড়ার পাথর লুট। আর এতে তাকে সহযোগিতা করেন সিলেট ও কানাইঘাটের আওয়ামী লীগ নেতারা। পাথর লুটে কোটি কোটি টাকার মালিক হন। পরে যখন লোভাছড়া কোয়ারি ইজারা দেয়া হয় তখনো তিনি ইজারায় সম্পৃক্ত হন। স্থানীয়দের মতে; ইজারার আগে ও পরে লোভাছড়া থেকে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। আর এই লুটের টাকার বড় অংশটি গেছে তমিজ ও তার ভাইদের পকেটে। তখন বিএনপি ও জামায়াতের যেসব নেতাকর্মী প্রতিবাদ করেছেন তাদের মামলার আসামি করে হয়রানি করা হয়। তবে পাথর ও চোরাকারবারির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়ের করা অন্তত ৬টি মামলার আসামি হন তমিজ। এসব মামলা তিনি টাকার জোরে তদন্তেই শেষ করে দেন। তমিজের সম্পদ কতো- এ প্রশ্ন করা হলে কানাইঘাটের লোকজনের ভাষ্য হচ্ছে; শতকোটি টাকার মালিক তমিজ। সাউদপাড়া গ্রামে তার প্রাসাদসম বাড়িটির মূল্য হবে ৭-৮ কোটি টাকা। সিলেট নগরের প্রাণকেন্দ্র সুরমা মার্কেটের পাশে রয়েছে ৫ তলাবিশিষ্ট নুরজাহান হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। এটির মূল্যও ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। পাথর লুটের টাকা দিয়ে তিনি বাড়ি ও নগরে হোটেল কিনেছেন। তার সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- চার কোটি টাকা মূল্যের দু’টি বড় ভলগেট, ৭ কোটি টাকা মূল্যের ১৫টি স্টিলবডির বড় নৌকা, প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ১৮টি পাথর টানার গাড়ি, আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ৫টি ফেলুডার, তিন কোটি টাকা মূল্যের ৪টি এক্সেভেটর, অর্ধকোটি টাকা মূল্যের দু’টি স্পিডবোট, সড়কভাঙ্গি এলাকায় ৫ বিঘা জমিতে গরুর খামার (৫ই আগস্টের পর ওই খামার থেকে শতাধিক গরু বিক্রি করেন), মোলাগুল বাজারে ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩০টি দোকান, নয়া বাজারে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ২৫টি দোকান, মন্তাজগঞ্জ বাজারে কোটি টাকা মূল্যের ৫টি দোকান, কোটি টাকা মূল্যের কয়েকটি নোহা মাইক্রোবাস ও কোটি টাকা মূল্যের ৩টি ট্রাক। এ ছাড়া সাউদগ্রাম, তেরআলী, বড়গ্রাম, লোভা কোয়ারিতে রয়েছে তার ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা মূল্যের ভূমি। এসব সম্পদ তমিজ ২০১৩ থেকে ২৫ সালের মধ্যে করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গ্রেপ্তার হয় না তমিজ: ৫ই আগস্টের পর সিলেট ও কানাইঘাটের আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে গেলেও তমিজ রয়েছে বহাল তবিয়তে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সে বর্তমানে পুলিশের তালিকাভুক্ত আসামি। এরপরও সে ইউনিয়ন অফিসে যাতায়াত, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক সবখানেই সরব ছিল। পাথর কোয়ারি, চোরাচালানের রাজ্য পরিচালনা করছিল দাপটের সঙ্গে। অবশেষে তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা। তারা একাধিক দপ্তরে তমিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। ইউনিয়ন অফিসে তাকে অবরুদ্ধ করেন। তাকে ঘিরে এলাকায় হুলস্থুল শুরু হওয়ায় বর্তমানে সে আত্মগোপনে রয়েছেন। এক সপ্তাহ তমিজ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এরপর থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন ও সাবেক সদস্য মোস্তাক আহমদ জানিয়েছেন- তমিজের সম্পদের শেষ নেই। সে লোভাছড়ার পাথর লুটে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছে। এখনো সে সরব রয়েছে। এ কারণে আমরা বিভিন্ন দপ্তরে লুটপাট সহ তার অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু মামলার আসামি হলেও তাকে পুলিশ ধরছে না। কানাইঘাট থানার ওসি আব্দুল আউয়াল জানিয়েছেন- তমিজকে গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। অকশনে পাথরের আড়ালে তমিজের বাণিজ্য: কানাইঘাটে লোভাছড়া থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর কয়েক মাস আগে অকশনে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। মেসার্স পিয়াস নামে সিলেটের ব্যবসায়ীরা ২২ কোটি টাকা দিয়ে ওই পাথর নিলামে নেন। কিন্তু তমিজ পাথর বিক্রি করতে স্থানীয়দের দিয়ে বাধা প্রদান করেন। শেষে তার নেতৃত্বে আলোচনার মাধ্যমে ২৫ টাকা ফুটে রয়্যালিটি আদায়ের মাধ্যমে পাথর নেয়ার সুযোগ দেয়। মেসার্স পিয়াসের স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান তুহিন বলেছেন- তমিজ চেয়ারম্যান তাদের পার্টনার। জেলা প্রশাসন থেকে নিলাম দেয়ার পর সে প্রায়ই শরিকদের দূরে রেখে কয়েক লাখ ফুট পাথর বিক্রি করে ফেলে। ওই সময় তার কাছে হিসাব চাইলেও দেয়নি। এখন সে পালিয়ে যাওয়ায় তারা বেকায়দায় পড়েছেন। সময়মতো পাথর বিক্রি করতে না পারায় যেমনি ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছেন, তেমনি তারাও প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। কানাইঘাটের পাথর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ইজারার বাইরের অনেক পাথর তমিজ নিজের লোক দিয়ে উত্তোলিত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তমিজের বক্তব্য: এ ব্যাপারে কথা বলতে গত কয়েকদিন ধরে তমিজের সঙ্গে চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। গতকাল তার ফোন রিসিভ করেন মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান-২-৩ দিন আগে চেয়ারম্যান বাড়িতে মোবাইল রেখে চলে গেছেন। এখন কোথায় আছেন জানেন না। তবে মাসখানেক আগে মানবজমিনের সঙ্গে কথা হয়েছিল চেয়ারম্যান তমিজের। তিনি তার বিরুদ্ধে পাথর লুটপাট ও চোরাকারবারের অভিযোগ অস্বীকার করেন। এত টাকা এলো কোথা থেকে প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন- তিনি ব্যবসা করে সম্পদ করেছেন। এখন তার সম্পদ লুটে নিতে ও হেনস্তা করতে একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। -মানবজমিন







