সিলেটে প্রশাসনের যে সিদ্ধান্তে বিতর্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:১৩ অপরাহ্ণ
সিলেটে এতদিন যা হয়নি, তাই করে দেখাচ্ছেন জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এতে করে বাহবা কুড়াচ্ছেন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ও পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। কী করেননি তারা? হকার পুনর্বাসন থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মতো দুঃসাহসিক কাজে তারা নগরের মানুষের কাছে প্রিয়জন হয়েছেন। আর সেটি হয়েছে স্বল্প সময়ের মধ্যেই। তবে তাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রথমে সবাই নীরব থাকলেও এখন ধীরে ধীরে মুখ খুলছেন। প্রশাসনের নেয়া সিদ্ধান্তটিকে ‘বিতর্কিত’ বলেও দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সিলেটে এসেছিলেন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ও পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। সিলেটের শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা কঠোর থেকে কঠোরতর হন। জেলা প্রশাসক সিলেটে যোগদান করেই সাদাপাথর কাণ্ডের ইতি ঘটান। পাথর ও বালু লুট বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। এরপর তিনি একেক করে নগরের সমস্যা সমাধানে হাত দেন। তার এক হুমকিতেই সার্কিট হাউসের সামনে থেকে সরে যায় ট্রাকস্ট্যান্ড। কীন ব্রিজ থেকে হকার উচ্ছেদ, নগরের প্রায় ৫ হাজার হকারকে নির্ধারিত স্থান হকার্স মার্কেট মাঠে নিয়ে যাওয়া, অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ সহ নানা কাজে তিনি সফল হয়েছেন। প্রশাসনেও এসেছে গতি ও শৃঙ্খলা। ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ডকে ফিরিয়ে এনেছেন। পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী যোগদান করেই নগরে চালিত অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আল্টিমেটাম দিয়ে তিনি বন্ধ করে দেন ব্যাটারি রিকশা চলাচল। এখন আর ওইসব রিকশা চলছে না। দীর্ঘদিন পর নির্ধারণ করা হয়েছে রিকশা ও অটোরিকশা ভাড়া। হোটেল-মোটেলে অসামাজিক কাজ বন্ধের চেষ্টা করছেন। নগরের কয়েকটি হোটেল সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। জুয়া, তীর খেলার স্থানে পুলিশ হানা দিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। তবে নগরের ছিনতাই সহ নানা সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
সর্বশেষ পুলিশ কমিশনার সিলেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দু’টি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে নগরের দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া। আর অপরটি হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের উদ্যোগে পার্কিং প্লেসের ব্যবস্থা করা। দু’টি সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্কিং প্লেসের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যানজট এড়াতে পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন নগরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসায় ভাসছেন তারা। তবে রাত সাড়ে ৯টায় দোকানপাট বন্ধ করা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পুলিশের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে রোববার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এতে করে নানা সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন, যে সিদ্ধান্তটি এসেছে সেটি কেবল সিলেটের জন্য কেন? গোটা দেশেই ব্যবসায়ীরা নিজেরা নিজেদের সুবিধামতো মার্কেট কিংবা দোকান বন্ধ করে যেতে পারেন। আর সিলেটের ব্যবসায়ীরা সাড়ে ৯টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। যদি কেউ বন্ধ না করেন তাহলে পুলিশ এসে জোরপূর্বক বন্ধ করে দিয়ে যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যবসায়ীদেরও এই কড়াকড়ির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এই অবস্থায় পুলিশ কমিশনারের সিদ্ধান্তের পর একই ইস্যুতে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমও কঠোর হয়েছেন। আদেশটি সরকারি আদেশ বলে গণ্য হওয়ার পাশাপাশি আদেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসকের আদেশে উল্লেখ করা হয়; সিলেট শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিদ্যুতের লোডশেডিং কমানো, ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় মনোযোগ বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমানোর লক্ষ্যে হাসপাতাল, ফার্মেসি, আবাসিক হোটেল, খাবার রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকান ব্যতীত সকল প্রকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রাত সাড়ে ৯টা থেকে বন্ধ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। এর আগে গত ১লা ডিসেম্বর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিলেটে রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে হোটেল-রেস্তরাঁ ও ওষুধের দোকান ব্যতীত সকল বাণিজ্যিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে গণ-বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিষয়টিকে প্রথমে সাধুবাদ জানালেও দোকান মালিক সমিতি সিলেটের মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন মঙ্গলবার বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সিলেটের বড় বড় মার্কেটের ব্যবসায়ীরা রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করে দেন। এখন সবাইকে এই সিদ্ধান্তটি মানতে হচ্ছে। তবে নিত্যপণ্যের বাজারেও এই বিধিনিষেধ চলে এসেছে। তার সঙ্গে ইতিমধ্যে নগরের লালবাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের কথা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকেও বলে দেয়া হয়েছে মাছ বাজার বন্ধ রাখতে। তিনি বলেন এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বুধবার বৈঠক করবো। এরপর সিলেটের প্রশাসনের সঙ্গে বসা হবে। সিলেটের ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- সিদ্ধান্তের দু’টি দিক আছে। পজেটিভ দিক হচ্ছে এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। আর নেগেটিভ দিক হচ্ছে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়বেন। তিনি বলেন গোটা দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য এই আইন নয়, এটি কেবল সিলেটের জন্য। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। বিষয়টিকে নতুন করে রিভিউ করা যেতে পারে বলে জানান তিনি। সিলেট চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি ও সিলেট ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. জিয়াউল হক মানবজমিনকে জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ৯টায় দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক করা ঠিক হবে না। এ জন্য ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আরও আলোচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন- দোকান বন্ধ রাখার সময় আরও বাড়ানো উচিত। নতুবা ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সিদ্ধান্তে নানা ক্ষেত্রে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে জানান তিনি।








