সিলেট-৬ ও সুনামগঞ্জ-৫: ‘দুর্দিনে’ মনোনীত, ‘সুদিনে’ বঞ্চিত!
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

সুরমা নিউজ ডেস্কঃ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন। ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ওই ভোটে অংশ নিয়ে পরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন প্রার্থী থেকে শুরু করে কর্মী-সমর্থকরা। সেই রাতের ভোট মোকাবিলা করা বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সিলেট বিভাগে আলোচিত ছিলেন দুজন। তারা হচ্ছেন সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনের ফয়সল আহমদ চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনের মিজানুর রহমান চৌধুরী।
ছাত্রদল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এই দুই নেতা ২০১৮ সালের পর থেকে ভোটের মাঠ ছাড়েননি। বিএনপির দলীয় নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ভোটের মাঠে তৎপর ছিলেন। স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও আশা করেছিলেন, এবার তারা মনোনয়ন পেয়ে রাতের ভোট মোকাবিলা করার পুরস্কারও পাবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। তাদের সঙ্গে মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় থাকা সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলন (সুনামগঞ্জ-৫) এবং সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী (সিলেট-৬) মনোনয়ন পেয়েছেন। ২০১৮ সালকে দলের ‘দুর্দিন’ ও বর্তমান সময়য়ে ‘সুদিন’ আখ্যায়িত করে কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, ভোটের মাঠে ‘মেড ইন ছাত্রদল’ জুটিখ্যাত দুই নেতা মিজান-ফয়সল দুর্দিনে মনোনীত হলেও সুদিনে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন।
জানা গেছে, ‘মেড ইন ছাত্রদল’ বলে তাদের যে নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি ঘটে, তার মূলে ছিল ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ফয়সল আহমদ চৌধুরীর বিএনপিদলীয় মনোনয়ন। ভোটের রাজনীতিতে এই দুজন তখন ছাত্রদলের সাবেক নেতার তরুণ জুটি হিসেবে সমাদৃত হন। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে দুজন লড়েছিলেন ডাকসাইটে দুই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। সিলেট-৬ আসনে আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে ফয়সল আর সুনামগঞ্জ-৫ আসনে একাধিকবারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মিজানুর রহমান চৌধুরী।
সে সময় মাঠের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তাদের পক্ষে বিপুল সাড়া পড়েছিল। তবে ভোট শেষে দুজনের অভিযোগ ছিল, ‘রাতের ভোটে তাদের হারানো হয়েছে।’ ভোট বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। তারা বলেছিলেন, প্রভাবিত ভোট বা হারজিৎ যা-ই হোক, ছাত্রদল প্রজন্মও যে ভোটের মাঠে শক্তিশালী, এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং এর সূচনাও ঘটেছে।
মিজানুর রহমান চৌধুরী ভোটের মাঠমুখী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ফয়সল আহমদ চৌধুরীও মাঠছাড়া হননি। প্রথমবার ভোট করা আর পরবর্তী সময়ে মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে দুজন একই সুরে বলেছেন, ‘২০১৮ সালের সেই নির্বাচন যদি রাতে না হয়ে দিনে হতো, তাহলে ধানের শীষের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারত না।’
সেই ‘রাতের ভোট’ পেরিয়ে এখন সুদিন এসেছে। কিন্তু এখন তারা মনোনয়নবঞ্চিত হলেন। এ নিয়ে তারা নীরব থাকলেও তাদের কর্মী-সমর্থকরা সরব। এই দুই নির্বাচনি এলাকার কর্মীদের মতে, জনবান্ধব ও জনপ্রিয় প্রার্থীকে বাদ দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ আলোচনায় উঠে আসছে ২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাও। নির্বাচন করার মাশুল হিসেবে পরবর্তী বছরগুলোতে চরম প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে দুজনকে। মিজানুর রহমান চৌধুরীর সিলেটের বাসায় হামলা হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ১৭টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় নিজেসহ অন্তত দুই শতাধিক নেতা-কর্মী জেল খেটেছেন। অন্যদিকে সজ্জন ভাবমূর্তির ফয়সল আহমদ চৌধুরীর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নানা ছুতোয় দফায় দফায় আক্রমণ হয়েছে।
মনোনয়নবঞ্চনার পর ফয়সল চৌধুরী কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কর্মী-সমর্থকদের ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মিজানুর রহমান চৌধুরীও একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তবে ভোটের মাঠে তাদের নিয়ে আক্ষেপ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মামলায় জেল খাটাদের একজন গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এখন সুদিন! কিন্তু দুর্দিন ভুলি গেলে চলব? কোন বিবেকে তাইন (মিজানুর রহমান চৌধুরী) বাদ পড়লা?’ তার প্রশ্ন ও কথায় ছিল হতাশার সুর। এই কর্মী নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরে জানান, নেতার (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) কথায় আশাবাদী ছিলাম। বলা হয়েছিল, বিএনপির পদে যারা আছেন, মনোনয়নে তাদের নয়, জনবান্ধব এবং জনপ্রিয়তা যাছাই করে প্রার্থিতা দেওয়া হবে। বাস্তবে ঘটল উল্টোটি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোটকেন্দ্রে এজেন্টের দায়িত্ব পালন করা সিলেট-৬ আসনের বিএনপি পদধারী এক নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে প্রথম এসেছিলেন ফয়সল আহমদ চৌধুরী। দলীয় প্রতীক পেয়ে কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটাররাও উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এখন এমন একজনকে প্রার্থী করা হয়েছে, যিনি ওয়ান-ইলেভেনের সময় উপজেলা নির্বাচন করে হতাশাজনক ভোট পেয়ে হেরেছিলেন।’
এদিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুজনের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুরোনো ছক সামনে আসছে। সুনামগঞ্জ-৫ আসনে কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন জাসদ (রব) থেকে এমপি হয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। ২০০১ সালে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে সিলেট-৬ আসনে এমরান আহমদ চৌধুরী ২০১৪ সালে গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে হেরেছিলেন। তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে থাকা জামায়াত পুরোনো ভোটের ফলাফলকে সামনে রেখে নতুন করে অঙ্ক কষছে।
বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণার পর ভোটের মাঠে জামায়াতের অবস্থান সহজ হয়েছে বলে নির্বাচনি পর্যবেক্ষকরা অনুমান করছেন। সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীদের একজন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই মেয়াদে (২০০০-০২) তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির। সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনে জামায়াত প্রার্থী আব্দুস সালাম আল মাদানী। তিনি ফুলতলি ‘আল ইসলাহ’ থেকে জামায়াতে যোগ দেওয়া নেতা। অনুসারীদের ভোট রয়েছে তার। এখন ভোটের পরিস্থিতি সামনে কী দাঁড়ায়, সেটাই দেখার।







