একটি সেতুর অপেক্ষায় অর্ধশতাব্দী, নবীগঞ্জে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হাজারো পরিবার
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
মোহাম্মদ সুমন আলী খাঁন:
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে সেতুর অভাবে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজলোর দেবপাড়া ও গজনাইপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার বাসিন্দারা। ওই এলাকায় বিজনা নদীর ওপর একটি সেতু না থাকায় এ দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে জনসাধারণকে। এমনকি প্রতি বছর বোরো ধানের সিজনে ফসল কেটে ঘরে তুলতে দূর্ভোগ পোহাতে হয় কৃষকদেরও।
উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী দেবপাড়া ইউনিয়নের দেবপাড়া, উত্তর দেবপাড়া, পূর্ব দেবপাড়া, সদরঘাট, নলসুজা ও গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রাম, লোগাঁও, মামদপুর, শংকরসেনা, নিশাকুড়ি, শিয়ালের পুঞ্জি, কান্দিগাঁও, বনগাঁও, গজনাইপুর, রামলোহ, শতক ও কামারগাঁও গ্রামগুলো অবহেলিত জনপদে পরিনত হয়েছে। এসব গ্রামের মাঝখানে রয়েছে প্রাইমারী স্কুল, মাদ্রাসা, বীর প্রতীক সাবেক প্রয়াত এমপি মাহবুবুর রব সাদী, সাবেক প্রয়াত এমপি ফরিদ গাজী এবং উনার সন্তান সাবেক এমপি গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদ এবং দুই ইউনিয়নের বিশেষ ব্যক্তিবর্গসহ কয়েক হাজার লোকের বসবাস।
সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনের জনপ্রতিনিধিরা বারবার নদীর উপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের মধ্যে সাবেক প্রয়াত এমপি ফরিদ গাজী উনার সময়ে সদরঘাট গ্রামের ইসলাম নামক এলাকার বিজনা নদীর উপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন। পরে সাবেক এমপি এমএ মুনিম চৌধুরী বাবু, সাবেক এমপি গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদ পূর্ব দেবপাড়া গ্রামের ইমামগঞ্জ নামক এলাকার বিজনা নদীর উপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
স্থানীয় সুত্রে আরো জানা যায়, শেষমেষ সাবেক এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী কায়েস্তগ্রাম গ্রামের মুন্সিবাজার এলাকার বিজনা নদীর (গোপলা নদী নামেও পরিচিত) উপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ৯০ মিটার দীর্ঘ ও সাড়ে ৫মিটার প্রস্থ সেতু নির্মাণে ডিও দেন। ডিও সূত্রে প্রকাশ ছিল, নদীর এক প্রান্তে গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থ গ্রাম এবং অপর প্রান্তে পূর্ব কায়স্থ গ্রামের সড়ক অবস্থিত। সেতুটি নির্মাণ হলে ১০/১৫টি গ্রামের লোকজন খেয়া (নৌকা) ও বাঁশের সাঁকো ছাড়া পারাপার করতে পারবে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। স্থানী লোকজনের দাবির প্রেক্ষিতে পূর্ব কায়স্থগ্রাম পরিদর্শন শেষে ওই ব্রিজ নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীবর্গের নিকট ডিও প্রদান করেন। যা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অর্থে ব্রিজ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করবে বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু সেই কাজ আর সম্পন্ন হয়নি। যার কারণে মাঝখানে বিজনা নদী থাকায় দু’পাড়ের মানুষের যাতায়েতে পোহাতে হচ্ছে চরম দূর্ভোগ।
নদীর ওপারে থাকা বড় হাওরে প্রতি বছর কয়েক হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করা হয়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষত বোরো মৌসুমে, যেখানে কৃষকরা বোরো ধান চাষ করে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে। বর্ষায় নৌকা এবং হেমেন্তে বাঁশের সাঁকো নিয়েই যেন তাদের জীবন আষ্টেপৃষ্টে বাধা। নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতে ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার করতে গিয়ে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাসহ পথচারীরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আসছেন।
এছাড়াও স্থানীয় নারী পুরুষ চিকৎসা, ইউনিয়ন পরিষদে জরুরী কাজকর্মসহ ব্যবসা, বানিজ্য ও হাটবাজার করতে স্থানীয় সদরঘাট নতুন বাজার, ইমামগঞ্জ বাজার, মুন্সি বাজার এমনকি দেবপাড়া বাজারে যেতে হয়। তার মধ্যে যুগ যুগ ধরে ওই এলাকার ছাত্র-ছাত্রী, নানা প্রেশার হাজারো মানুষদের নিত্য প্রয়োজনে নদী পারাপার করতে হয় জীবনের ঝুকি নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীটি দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র প্রাকৃতিক বাধা। সেতু না থাকায় প্রতিদিন শতশত মানুষকে নৌকা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে পারাপার হতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা বারবার বিজনা নদীর উপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও নির্বাচন শেষ হলেই সে প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আজও সেতুবিহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন নদীর ওই পারের বাসিন্দারা। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহনে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। নদী পার হতে গিয়ে অনেক সময় নৌকা না পাওয়ায় চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, ফলে ঝরে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এই জনগোষ্ঠির জন্য ওই নদীর উপরে নেই কোন সেতু। তাদের জীবন যেন বর্ষায় নৌকা এবং হেমন্তে বাশের সাঁকো নিয়েই আষ্টে-পৃষ্টে বাধা। একটি সেতুর অভাবে অবহলেতি এই জনপদের মানুষের দুঃখের শেষ নেই। কোন মানুষ মারা গেলেও তাকে কবর স্থানে নিয়ে দাপন করতে গেলেও পরতে হয় নানান সমস্যায়।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর উপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে ৩০কিলোমিটারের স্থলে মাত্র ৪ কিলোমিটার পরই মৌলভীবাজার জেলার সাথে সংযুক্ত হবে ওই এলাকার বাসিন্দাসহ দিনারপুর পরগণার লোকজন। তাহলে পর্যটন এলাকায় পরিণত হবে ওই এলাকার জনপদ। এতে করে মৌলভীবাজার জেলার সাথেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। চলমান নির্বাচনে হবিগঞ্জ-১ আসনের যে প্রার্থী মিথ্যা আশ্বাস না দিয়ে বাস্তবে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিবেন সেই প্রার্থীকেই সফল ভাবে সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তারা।







