ইসলামপন্থী সমঝোতার রাজনীতিতে অনাস্থা: জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩০ অপরাহ্ণ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনা শুরু হয়েছিল ঐক্য ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রত্যাশা নিয়ে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই উদ্যোগ এখন গভীর অনাস্থা ও পারস্পরিক অভিযোগে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে খেলাফত মজলিস ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সমঝোতা প্রক্রিয়া ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে।
খেলাফত মজলিস সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দলটি শুরু থেকেই বৃহত্তর ইসলামপন্থী ঐক্যের স্বার্থে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছিল। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চললেও নমিনেশন সাবমিশনের সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দীর্ঘসূত্রতা কার্যত আলোচনাকে অকার্যকর করে তোলে।
শেষ পর্যায়ে এসে খেলাফত মজলিসকে মাত্র পাঁচটি আসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়—যা দলটির ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা ও কর্মীর ভাষায়, এটি সমঝোতার চেয়ে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে। দীর্ঘ সময় আলোচনায় রেখে শেষ মুহূর্তে এমন প্রস্তাব দেওয়াকে তারা রাজনৈতিকভাবে একধরনের বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা বলে মনে করছেন।
যদিও এ বিষয়ে খেলাফত মজলিসের আমির বা মহাসচিবের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো গণমাধ্যমে আসেনি, তবে দলীয় সূত্রে জানা যায়—শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় শূরা বৈঠকে একাধিক নেতা জামায়াতের অতীতের ‘চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি’র অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেন। সে সময় কিছু শীর্ষ নেতা ‘জনগণ চায় ইসলামপন্থীদের ঐক্য’—এই যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য একক প্রার্থীভিত্তিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। বর্তমানে এই সিদ্ধান্তই তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের হতাশার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অসন্তোষ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। খেলাফত মজলিসের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুমিল্লা অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছেন যে, জামায়াত পরিকল্পিতভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে। এসব পোস্টে ‘ব্ল্যাকমেইল’ শব্দের ব্যবহার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা ইসলামপন্থী রাজনীতির ভেতরে অস্বাভাবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সমঝোতা প্রক্রিয়ার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জামায়াত আমিরের উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বিদেশ সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও এটি ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয়, তবে চলমান রাজনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে।
এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের সমঝোতামূলক রাজনীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। দলটির নেতারা ও মিডিয়া উইং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে বলেছেন, জামায়াত আলোচনায় আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী আন্দোলনের কয়েকটি মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম স্পষ্টভাবে মত দিয়েছে—সমঝোতা হলেও জেনে যদি জামায়াত নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার না পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনেরও একতরফাভাবে নমিনেশন প্রত্যাহার করা রাজনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হবে না।
ইসলামী আন্দোলনের এই দীর্ঘদিনের অভিযোগের সঙ্গে এখন খেলাফত মজলিসের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় ইসলামপন্থী রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুই দলের তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতকে ঘিরে সন্দেহ ও অনাস্থা যে বাড়ছে, তা আর গোপন থাকছে না।
বিশ্লেষকদের মতে বর্তমানে খেলাফত মজলিসের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—একদিকে কর্মীদের দাবি উপেক্ষা করে ঐক্য ধরে রাখা, অন্যদিকে কর্মীদের মনোবল রক্ষায় স্বতন্ত্র নির্বাচনী কৌশলে এগিয়ে যাওয়া। দলীয় সূত্র জানায়, খেলাফত মজলিস ২৫০টির বেশি আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও সমঝোতার অংশ হিসেবে মাত্র ৭৬টি আসনে মনোনয়ন জমা দিতে হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতরে ভেতরে প্রশ্ন উঠছে।
খেলাফত মজলিসের এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে দল এখনো ক্যাম্পাসে ছাত্র মজলিসের নাম সহ্য করতে পারে না, তারা কীভাবে মূলধারার মজলিসকে রাজনৈতিকভাবে সমানভাবে বিবেচনা করবে?” তাঁর দাবি, জামায়াত খেলাফত মজলিসকে একটি ‘প্যারালাল দল’ হিসেবে দেখে এবং ঐতিহাসিকভাবে ছোট দলগুলোকে কোণঠাসা করে রাখার নীতি অনুসরণ করে।
একাধিক রাজনৈতিক সূত্র আরও জানায়, জামায়াত তাদের কৌশল এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে ছোট দলগুলোকে শেষ পর্যন্ত ‘থাকবে না বের হবে’—এই সিদ্ধান্তে বাধ্য হতে হয়, অথচ ঐক্য ভাঙনের দায় নিজেদের ওপর নিতে হয় না। এরই মধ্যে জামায়াতের কর্মীরা গ্রাম-গঞ্জে প্রচার করছে যে, এবার জামায়াতের নেতৃত্বে সব ইসলামপন্থী দল ঐক্যবদ্ধ—যা রাজনৈতিকভাবে তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। সমঝোতার রাজনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অন্যথায়, তা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথকে আরও সংকীর্ণ করে তোলে।
বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—ইসলামপন্থী রাজনীতিতে এখন কেবল ঐক্যের স্লোগান নয়, বরং আস্থা, দায়বদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।







