চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তারেক রহমানকেই
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:১৮ অপরাহ্ণ
১৯৮১ সালের ৩০শে মে ভোর। যাত্রাবাড়ী ওয়াপদা কলোনির ভেতরের সড়কে হাঁটছিলাম। কলোনির বিভিন্ন ভবনে রেডিও বাজছিল। ভেসে আসছিল গজল আল্লাহু, আল্লাহু, আল্লাহু আল্লাহ/তুমি রহিম, তুমি রহমান, তুমি যে জাব্বার/আমি তোমার নাফরমান বান্দা/বড়ই গুনাহগার…। কিছুক্ষণ পরই কানে ভেসে আসে গতরাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। স্থির হয়ে যায় দেহ। সত্যিই এমন ঘটনা ঘটেছে? না এটা হতেই পারে না। আবারো রেডিওতে একই ঘোষণা। আবার সেই গজল আল্লাহু, আল্লাহু, আল্লাহু আল্লাহ…। কানকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে গোটা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ে। শোকে মুহ্যমান বাংলাদেশ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লাশ নিয়েও হয় অনেক ঘটনা। লাশের কফিন যখন চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে হেলিকপ্টারে করে প্রেসিডেন্ট ভবনে আনা হয় তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কফিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন খালেদা জিয়া, নাবালক সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান। বিটিভিতে এ দৃশ্য দেখে কেঁদেছে গোটা দেশ। বাংলাদেশিদের হৃদয় ভেঙে খান খান। সেই প্রথম তারেক রহমানকে দেশবাসী প্রকাশ্যে দেখেন। সেখান থেকে লাশ নেয়া হয় মানিক মিয়া এভিনিউতে। যেখানে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা হয়। পরে সংসদ ভবনের পাশের উদ্যানে দাফন করা হয়। এরপর থেকে এই উদ্যানের নাম দেয়া হয় জিয়া উদ্যান। সেই ছোট্ট তারেক রহমান আজ তার পিতার গঠন করা বিএনপি’র হাল ধরেছেন। মা খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় চিকিৎসাধীন। আজ ২৫শে ডিসেম্বর তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর নিজ জন্মভূমিতে পা রাখবেন। গোটা দেশের দৃষ্টি ৩০০ ফিটের দিকে। যেখানে দেয়া হবে তাকে সংবর্ধনা। এক/এগারোর সরকার তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর থেকে তিনি লন্ডনে রয়েছেন সপরিবারে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার তার এবং তার পরিবারের ওপর আক্রোশ মিটায়। যে বাড়িতে তারেক বেড়ে উঠেছেন সেই বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। এসব নির্যাতনের কাহিনী দেশের মানুষ সবাই জানেন। তারপরও কথা থেকে যায়-জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কখনো থেমে ছিল না। এখনো নেই। কীভাবে এই পরিবারকে দেশছাড়া করা যায় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার শক্ত মনোবলের কারণে ব্যর্থ হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করা খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা করাতে বিদেশ পর্যন্ত যেতে দেয়া হয়নি। সে সময়ের সরকার প্রধান দম্ভ করে বলতেন- বাড়িতে থাকতে দিয়েছি- এটাই তো বেশি। একবার তো বলেই ফেলেছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে আবারো জেলে পাঠিয়ে দেবো। শুধু তাই নয়, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে যে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করেছেন তাও বুক ফুলিয়ে বলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বিরোধী দলে থাকতে একবার ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশে বাধা দেয়ার ঘটনা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সেদিনই প্রতিজ্ঞা করি ক্ষমতায় গেলে ক্যান্টনমেন্টের এই বাড়ি থেকে খালেদাকে ধাক্কা দিয়ে বিদায় করবো। করেছেনও। অথচ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার সময় বলেছেন ‘রাগ, অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করিবো না’। অথচ গত প্রায় ১৬টি বছর শেখ হাসিনা একটি কাজও করেননি প্রতিহিংসা বা রাগ- অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে। তারেক রহমানের উপর তার রাগ প্রকাশ পেতো ভাষণে, বক্তৃতায়। যা এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। লন্ডনে বসে না থেকে একবার দেশে ফিরে আয়, আমরা একটু দেখি।
এমন ক্ষোভ ঝরতো শেখ হাসিনার মুখে। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। এ জন্য ব্যবহার করেছিল আদালতকে।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। মূলত এই নির্বাচনকে সামনে রেখেই তারেক রহমান দেশে ফিরছেন। সঙ্গে তো রয়েছে অসুস্থ মাকে দেখা। তবে লন্ডনে বসে দীর্ঘদিনে তিনি রাজনীতিতে বিজ্ঞ হয়েছেন। পরিপক্ব হয়েছেন। তার চালচলন, কথাবার্তা- এটাই প্রমাণ করে। অনেকেই বলেন, আরও আগেই তারেক রহমানের দেশে আসা উচিত ছিল। এর উত্তর অবশ্য তিনি ফেসবুকের এক পোস্টে জানিয়েছেন। ফেসবুকের এ পোস্ট নিয়ে বেশ ক’দিন ছিল নানা আলোচনা। অনেকেই বলাবলি করছিল-তারেক রহমান আর দেশে আসতে পারবেন না। তিনি দেশে আসবেন না। খালেদা জিয়ারও শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে। তাহলে দলের হাল কে ধরবেন? এসব জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই বিএনপি’র মহাসচিব ঘোষণা করলেন তারেক রহমান দেশে আসছেন। ২৫শে ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবেন। তার এ ঘোষণার পর বিএনপি’র নেতাকর্মীরা আনন্দে উজ্জীবিত হয়ে উঠেন। সারা দেশ আনন্দে নেচে উঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানান। কিন্তু প্রশ্ন হলো-আগামী নির্বাচনের পুরো হাল তারেক রহমানকে ধরতে হবে। এ বিষয়টি যে, তার সামনে এখন বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। কারণ সংসদীয় আসনে আসনে বিএনপি’র কোন্দল। মনোনয়নকেন্দ্রিক এ কোন্দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে- এমনটা আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন হলো বিশেষজ্ঞদের এ আশঙ্কাকে তিনি মিথ্যা পরিণত করবেন কোন কৌশলে। অবশ্য লন্ডন থেকেই তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যক্তি নয়, প্রতীক দেখে ভোট দেবেন। দলের মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তার এ নির্দেশনার পর অবস্থা কী বদলেছে? হয়তো কিছুটা বদলেছে। কিংবা বদলায়নি। কিন্তু তাকে মনোনয়নকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব নিরসন করে শূন্যতে নামিয়ে আনতে হবে। এমনিতে নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধনে যেসব সংশোধন এনেছেন তাতে বিএনপি’র বিরুদ্ধেই গেছে অনেকটা। এসব মোকাবিলা করে তাকে দলকে বিজয় এনে দিতে হবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এমন আশাই করেন তার কাছে। তবে প্রশ্ন জাগে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে কেন এ দ্বন্দ্ব? এর উত্তরও নেতাকর্মীদের কাছে আছে। তারা বলেন, কোনো কোনো আসনে ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে নতুন এবং দলের প্রতি কমিটমেন্ট নেই- এমন প্রার্থীও দেয়া হয়েছে। এসব বিষয় ছাড়াও তারেক রহমানকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে সমমনাদের নিয়েও। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তার কেমন আচরণ হবে- সেটাও অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখবেন অন্যরা। ইতিমধ্যে তারেক রহমান তার কথাবার্তা দিয়ে দেশের মানুষের কাছাকাছি গিয়েছেন। কিন্তু দেশে এসে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে তাকে। এক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত কী হয়- সেটাও খেয়াল রাখবেন ভোটাররা।
এরই মধ্যে তারেক রহমানকে বরণে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আটকে রাখা তো হবে বিশাল কঠিন। আজ ২৫শে ডিসেম্বর সারা দেশের স্রোত হবে বিমানবন্দরমুখী। এটা আন্দাজ করা যাচ্ছে এখনই। তারেক রহমানকে অবশ্যই কথা বলতে হবে মেপে মেপে। চলতে হবে অতি সাবধানে। পিতার মতো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে নিতে হলে দৌড়াতে হবে গ্রামগঞ্জে। মায়ের মতো হতে হবে আপসহীন। রাগ-অনুরাগ, প্রতিহিংসা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে চালাতে হবে দেশ। বাবার কফিনের পাশে ক্রন্দনরত তারেক রহমানের পুঁজি হবে সেই কান্না। পিতার আদর্শ লালন করে সেই কান্নাকে সার্থক রূপ দিতে হবে। শোককে পরিণত করতে হবে শক্তিতে।








