শনিবার, ২৫ মে, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
সিলেটে ঈদের আগেই একদিনে সড়কে লাশ হলেন ৫ জন  » «   ঈদ যাত্রা : সিলেটে অনিরাপদ মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়কের বেহাল দশা  » «   সিলেটি বিলালের মুখে বর্ণনা: ছোট নৌকায় দ্বিগুণ যাত্রী তুলে ভাসিয়ে দেয় সাগরে  » «   সিলেটের অলস গ্যাস কুপ থেকে গ্যাস উত্তোলনের আবেদন যুবলীগ সভাপতির  » «   গোলাপগঞ্জে বৃদ্ধকে বাস থেকে ‘ধাক্কা দিয়ে ফেলে’ হত্যা করলো হেলপার  » «   ওসমানীনগরে থানা পুলিশের উদ্যোগে ইফতার মাহফিল সম্পন্ন  » «   লন্ডনের ওভাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম থাকবে সিলেটিদের দখলে  » «   রাজনগরে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন, বন্যার আশঙ্কা  » «   বালাগঞ্জে আদালতের রায় উপেক্ষা করে জায়গা নিয়ে সংঘর্ষ, আহত-৯  » «   সংস্কারের অভাবে বিশ্বনাথ বাইপাস সড়কের বেহাল অবস্থা : রাস্তা নয় যেন পুকুর  » «  

ভালবাসার তৃষ্ণা…

সারওয়ার চৌধুরী:
মাসুদের সকালটাই যেন মাটি ! রুবির সাথে ঝগড়া করে সকালের নাস্তাটাই করা হয়নি । ডানকিন ডোনাটে নাস্তাটা সেরে কফি হাতে নিয়ে গাড়িতে বসল , দিনের শুরুতে কামাইয়ের আগেই দশ ডলার খরচ ! গাড়ি স্ট্রার্ট দিল , রবিবার সকালের রাস্তা ঘাট এমনিতেই ফাঁকা । সচরাচর রবিবারে সে লেট করে কাজে আসে ! কিন্তু আজকের পরিস্থিতিটা ভিন্ন ।

বয়স্কা সাদা একজন মহিলা হাত তুলতেই মাসুদ গাড়ি থামায় —- ” গুড মর্ণিং ” প্রফেশনাল হাসি দিয়ে সে মহিলার দিকে তাকায় ।
———– ” গুড মর্ণিং , তুমি কি টাইম স্কয়ারে যাবে ? ”
মাসুদের মেজাজটা কিছুটা হলেও খুশি ! যাইহোক প্রথমেই একটা লং ট্রীপ পাওয়া গেল । সম্মতি সূচক মাথা নাড়তেই ভদ্রমহিলা গাড়িতে উঠে বসে । ব্রঙ্কস থেকে ট্রাফিক জ্যামহীন হাইওয়ে ধরে টাইম স্কয়ারে আসতে সময় লাগলো মাত্র বিশ মিনিট ।
———- ” ভাল একটা জায়গা দেখে গাড়িটা পার্ক কর ! ” মাসুদকে লক্ষ্য করে মহিলা বলল । মাসুদ বুঝতে পারছেনা , মহিলা তো এখানে নেমে যাবে , তাহলে গাড়ি পার্ক করার প্রয়োজন কি ? মিটার ফ্রী রবিবারে নিউ ইয়র্ক সিটিতে , বিশেষ করে টাইম স্কয়ারের মত জায়গায় পার্কিং পাওয়া কষ্টকর । অনেকক্ষণ খোঁজাখোঁজির পর একটা পার্কিং স্পট পাওয়া গেল ।

” তুমি যদি আমার সাথে আস আমি খুব খুশি হব ! ” মহিলা মাসুদকে অনুরোধ করে । মাসুদ এবার কিছুটা বিরক্ত ! মহিলার উদ্দেশ্য কি ? দেখে তো মনেহয় বয়স সত্তর – পচাত্তরের কম হবেনা , এই বয়সে কি ভীমরতি ধরেছে ? বিরক্তিভাব নিয়ে সাথে সাথে চলল । টাইম স্কয়ারে চত্তরের মাঝামাঝি রাখা চেয়ার গুলির একটিতে বসতে বসতে সামনা সামনি আরও একটা চেয়ার দেখিয়ে মাসুদকেও বসে পড়ার ইশারা করে । মাসুদ ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে ! কি রকম এক মহিলার খপ্পরেই না পরেছে সে । একবার চিন্তা করে পুলিশ কল করবে ! আবার সেই চিন্তা থেকে ফিরে আসে , অলরেডী দুটো ড্রাইভিং ভায়োলেশন তার এগেইন্স্টে । মহিলার মুখে কোন কথা নেই শুধু স্হির দৃষ্টিতে মাসুদের দিকে তাকিয়ে আছে ! মায়ের বয়সী একজন মহিলা ! কিন্তু তার হাবভাব তো মোটেই সুবিধার নয় । এভাবেই ঘন্টা খানেক পার হল ।

———- ” ঠিক আছে এবার উঠা যাক ! ভাল দেখে একটা রেস্টুরেন্টে চল । ” মাসুদের দিকে তাকিয়ে মহিলা বলে । মহিলার দেখিয়ে দেয়া দামী একটা রেস্টুরেন্টের সামনে মাসুদ গাড়ি পার্ক করে । এবার বোধকরি বিদায় মিলবে । কিন্তু না , গাড়ি থেকে নেমেই সে মাসুদকেও নেমে আসার জন্যে ইশারা করে । বিরক্তির মাত্রা বাড়লেও মাসুদ জানে সে যদি না করে তবে এই মহিলাও তাকে ছাড়বেনা , মহিলার হাবভাব তার ভাল করেই বুঝা হয়ে গেছে । কথা না বাড়িয়ে পেছনে পেছনে রেস্টুরেন্টে ঢুকলো । একটার পর একটা দামী খাবারের অর্ডার দেখে মাসুদ কিছুটা শংকিত ! দেখতে তো রোগা , তারপর বয়সটাও কম নয় ! এই বয়সে খাবার দাবারের এত রুচি ? এত খাবার অর্ডার করলেও সে কিন্তু বেশী কিছু খাচ্ছে না , বরং একটু একটু করে টেস্ট করে মাসুদকে পেট ভরে খাওয়ার অনুরোধ করছে । এত্ত সব খাবার তো আর একজনের পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয় , তারপরও মাসুদ সিজার সালাদ আর মাছের আইটেম গুলো পেট ভরে খেল । খাবার পালা শেষ । ওয়েটার টেবিলে বিলের কাগজটা রেখে গেছে , বিলটা হাতে নিয়েই সে মাসুদের দিকে তাকায় —- ” তোমার কাছে কি দুশো ডলার হবে ? ” ও মোর জ্বালা ! মাসুদের মনে হচ্ছে চিৎকার দেবে । বুড়ী , তোর যদি টাকা না থাকে তবে কেন এত দামী রেস্টুরেন্টে খেতে আসলি ? কথাগুলো অবশ্য তাকে বলা হয়নি , অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো ! এখানে সে কিছু বলতে গেলে পাবলিকের সিম্পেথীটা বুড়ীর দিকেই যাবে আর সকল দোষ তার ঘাড়ে বর্তাবে । জীবনে অনেক টাকা -পয়সা নষ্ট হয়েছে , আজকেরটা না হয় সেগুলোর সাথে যোগ হল । পকেটে তো কোন ক্যাশ নেই , অগত্যা একটা ক্রেডিট কার্ড বের করে ওয়েটারকে বিল চার্জ করতে দিল । প্রচণ্ড রাগে সে জ্বলছে , কি রকম এক বাজে মেয়েলোকের খপ্পরেই না পরেছে । রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই মহিলা বলল ” চল হোয়াইট প্লেইন কবরস্হানে । ” ” কবরস্হান ? ” কবরস্হানে গিয়ে মরবে নাকি ? জ্বীন ভূত নয় তো ? মাসুদের ভেতরটায় যেন অনেক জটিল , রহস্যময় প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে । ভেতরে যত প্রশ্নই আসুক , মাসুদ মুখ খুলছেনা ! মহিলার আচরণ খুবই আশ্চর্যজনক , পরে যদি কোন বিপদ হয় । কোন কথা না বাড়িয়েই রওয়ানা দিল হোয়াইট প্লেইন কবরস্হানের দিকে ।

কবরস্হানের সামনে গাড়ি থামিয়ে মাসুদকে বসিয়ে রেখে সে একাই ভেতরে গেল । বেশ কিছু সময় পর ফিরে আসল ! মাসুদ একবার চিন্তা করছিল চলে যাবে কিন্তু কি রকম এক আগ্রহ যেন তাকে আটকিয়ে রেখেছে । মহিলার চোখ দুটো লাল দেখাচ্ছে , মনেহয় কবরস্হানে গিয়ে অনেক কান্না কাটি হয়েছে । গাড়িতে উঠেই বলল ” চল , এবার আমি ব্যাংকে যাব ! ” ব্যাংকে বেশ কিছুসময় কাটিয়ে ফিরেই একটা ঠিকানা মাসুদের হাতে ধরিয়ে দিল । ঠিকানাটা একটা হাসপাতালের । মাসুদ কিছুই বলছেনা , নিজেকে একটা ব্যাটারী চালিত পুতুল পুতুল মনে হচ্ছে ! মহিলা যেভাবে তাকে চালাচ্ছে সেভাবেই চলছে । হাসপাতালের কাছাকাছি যেতেই মাসুদকে ইশারা করে ” ঐ কফি শপের সামনে গাড়ি পার্ক কর ! ”

পার্ক করতেই সে বেরিয়ে এসে মাসুদকে অনুরোধ করল ” তুমিও আমার সাথে আস , দুজনে একসাথে কফি খাব ! ” মাসুদের মনে হচ্ছিলো ওর ঝুলে পরা বুড়ো গালে খসে একটা চড় লাগায় ! না , সে তো ঠিক করেই রেখেছে এ মহিলার সাথে কোন কথা বাড়াবে না । ধীরস্হির ভাবে কোন কথা না বলে মহিলার পেছন পেছন কফি শপের এক কোণায় বসল ! মনের মধ্যে শুধু একটাই চাওয়া ঝামেলাহীন ভাবে কোনরকমে এই বাজে মহিলার খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া । মহিলা উঠে গিয়ে নিজহাতে দুটো কফি বানিয়ে একটা কাপ মাসুদের দিকে বাড়িয়ে দিল ” ফ্রেন্চ ভ্যানিলা , আমার খুব প্রিয় কফি , আশা করি তোমারও ভাল লাগবে ! ” মাসুদের গায়ে আগুন জ্বলছে , বুড়িটা যেন বেহায়াপনার সকল সীমাই ছাড়িয়ে যাচ্ছে ।
” কি ভাবছো ? ” মহিলার জিজ্ঞাসায় মাসুদ যেন নিজের মাঝে ফিরে আসে ।
” না , কিছুনা ”
” আমি জানি তুমি আমাকে নিয়েই ভাবছো ! আমার সারাদিনের আচরণে তুমি বিরক্ত । ” মহিলা একাই বলে যাচ্ছে , মাসুদের যেন কিছুই বলার বা শুনার ইচ্ছে নেই ।

” সারাদিন দিন তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি , আমার আচরণের জন্যে আমি ক্ষমা চাচ্ছি । তোমার বয়সী আমার একটা ছেলে ও একটা মেয়ে আছে ! ছেলেটা তার পরিবার নিয়ে ফ্লোরিডায় আর মেয়েটা ক্যালিফোর্নিয়ায় সেটেল্ড । দুজনেই ভাল চাকরি করে , প্রতিষ্ঠিত । তাদের সময় নেই নিউ ইয়র্কে এসে আমাকে দেখার । আর আমিও নিউ ইয়র্ক ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইনা ! এখানে আমার একটা বাড়ী আছে যেটা আমার প্রয়াত স্বামীর অনেক কষ্ট আর পরিশ্রমের ফসল । ”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও একতরফা কথাগুলো মাসুদ প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে শুনছে ।

” গাড়ীতে উঠার পর পেছন থেকে তোমাকে আমার ছেলের মত লাগলো ! ” মহিলা বলেই যাচ্ছে — ” ছেলের জন্যে কয়েকদিন ধরে মনটা খুব কাঁদছে , তাই ইচ্ছে হল সারাদিন তোমাকে নিয়ে ঘুরব ! আমার স্বামী বেচে থাকতে প্রায় সময়ই আমরা বাচ্চাদেরকে নিয়ে টাইম স্কয়ারে যেতাম , সবাই একসাথে সময় কাটাতাম । পুরনো সেই স্মৃতির খোঁজেই তোমাকে নিয়ে সেখানে যাওয়া । লাঞ্চের সময় মনেহল যদি আমার ছেলেটা কাছে থাকতো তবে তাকে আদর করে সযত্নে এভাবেই খাওয়াতাম । আর কবরস্হানে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আমার প্রয়াত প্রাণপ্রিয় স্বামীকে বলে আসা যে , খুব শীঘ্রই আমি তাঁর কাছে আসছি , খুব বেশী হলে তিন চারদিন । “

” তিন চারদিন ” কথাটা যেন মাসুদের চিন্তাশক্তিতে একটু নাড়া দিল ! এ মহিলা তো দেখি একেবারে বদ্ধ পাগল , একা থাকতে থাকতে বোধহয় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে ! এবার কি তাহলে আত্মহত্যার চিন্তা ভাবনা করছে ? মাসুদ নিরব শ্রোতার মত শুনছে । মহিলা বলেই যাচ্ছে ” এখন যে আমি হাসপাতালে যাব , এটাই হবে পৃথিবীতে আমার সর্বশেষ যাত্রা বিরতি ! আমি ব্লাড ক্যান্সারের রোগী । ” মহিলার সমস্ত চেহারা জুড়ে এখন দুনিয়ার হতাশা , প্রচণ্ড অসহায়ত্ব । মাসুদের চিন্তাশক্তিও যেন হঠাৎ একটা ধাক্কা খেল ! মহিলার চোখ দুটো ছলছল করছে ——— ” আমার অবস্হাটা সর্ব শেষ স্টেজে , ডাক্তাররা আমাকে মাত্র দু সপ্তাহের সময় দিয়েছেন , আমি আমার সন্তানদের জানিয়েছি ! কিন্তু ব্যস্ততার কারনে তারা আমাকে এসে দেখার সময়টুকু বের করতে পারছেনা । এরই মধ্যে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে ! আমিও এই কয়দিন অপেক্ষা করেছি , কিন্তু মনেহল যদি মরে বিছানায় পড়ে থাকি তিন চারদিন হয়তো কেউ জানতেই পারবেনা ! আমি চাইনা আমার মৃত শরীরটা বিছানায় পড়ে থেকে পচন ধরুক , মরার পর যদি আমার সন্তানেরা আসে তাহলে হয়তো দূর্গন্ধে আমার কাছে যেতে পারবেনা ! আমি চাই আমার প্রিয় সন্তানেরা যদি আমাকে জীবিত না পায় , অন্তত মৃত মুখটা অবিকৃত অবস্থায় দেখতে পায় । “

মাসুদ অনেকটা বাকরুদ্ধ ! একজন অসহায় , সন্তানের জন্যে ভালবাসার তৃষ্ণায় কাতর মায়ের আহাজারিকে সে উপলব্ধি করতে পারেনি , সারাটা দিন যে তাকে সন্তানের মত স্নেহ করেছে , ভালবেসেছে — আর সে কি না তাকে নিয়ে আজেবাজে চিন্তা ভাবনায় ডুবে ছিল ? মহিলা ডানহাতে ধরা টিস্যুটা দিয়ে দুচোখ বেয়ে নেমে আসা জলধারাকে থামাবার নির্থক চেষ্টা করছে , অনেক দিনের লুকিয়ে থাকা বেদনাগুলো যেন জল হয়ে ঝরছে — ” যখন রেস্টুরেন্টে খেতে যাই , তখন ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমার সাথে কোন ক্যাশ নেই ! আর ক্রেডিটকার্ড ,ডেবিট কার্ড সবগুলো দুদিন আগেই বন্ধ করে ফেলেছি , তাই বাধ্য হয়ে তোমার কাছ থেকে ধার নেওয়া । পরে আজ যখন ব্যাংকে যাই তখন ব্যাংক ব্যালেন্স সন্তানদের একাউন্টে সমান ভাবে ট্রান্সফার করে শুধু একহাজার ডলার সাথে নিয়ে এসেছি ! স্বামীর রেখে যাওয়া প্রিয় বাড়ীটা আগেই বাচ্চাদের নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছি । ” এতগুলো না বলা কথা একসাথে বলে মহিলা একটু থামে ! মাসুদ অনুভব করছে এতদিনের অব্যক্ত এই কথাগুলো , মনের গহীণে লুকিয়ে থাকা বেদনাগুলো যেন মহিলাকে কুকড়ে খাচ্ছিল । হাতের ব্যাগটা খুলে পঞ্চাশ ডলারের একটা নোট ক্যাশিয়ারকে কফির বিল হিসেবে দিয়ে বলল বিল রেখে বাকিটুকু তোমার টিপস । মাসুদ দেখছে মেক্সিকান ক্যাশিয়ার বেজায় খুশী , দশ ডলার বিল আর চল্লিশ ডলার টিপস ! মাসুদের সামনা সামনি বসে মহিলা ব্যাগে রাখা বাকি ডলারগুলো গুণে তার দিকে বাড়িয়ে দিল —– ” এখানে নয়শ পঞ্চাশ ডলার আছে , সারাদিন তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি , সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা করে দিও ! আসলে সন্তানদের জন্যে মনটা খুব উতলা হয়ে গিয়েছিল । ” মাসুদের মনে হচ্ছে খাঁচায় বন্দি পাখি যেন তার প্রিয়জনের সংস্পর্শের জন্যে , ভালবাসার জন্যে ছটফট করছে । টাকা নিতে রাজি নয় সে —- ” আমার কোন টাকা লাগবেনা । ” মনে হল কি রকম এক অসস্তি যেন মহিলার সাদা চেহারায় ভর করেছে , পরক্ষণেই মাসুদ বলে — ” ঠিক আছে , যদি দিতেই হয় তবে সারাদিনের ভাড়া দুশো ডলার আর রেস্টুরেন্টের বিল বাবদ দুশো ডলার দিলেই হবে । ” এই মুহূর্তে টাকার প্রতি মাসুদের কোন টান নেই , মায়ের মমত্বের কাছে যেন সবকিছু ম্লান ।

” মনে কর একজন মা হিসেবে কিছু টাকা তোমাকে বেশীই দিলাম । ” মহিলার কাতরতায় মাসুদ আর কথা বাড়ায় না , টাকা নিতে নিতে বলে —– ” আমিও না বুঝে তোমার সম্পর্কে অনেক ভুল চিন্তাভাবনা করেছি , তোমার মত মায়ের ভালবাসাকে অপমানিত করেছি , আমাকেও ক্ষমা করে দিও ! চল তোমাকে হাসপাতাল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি । “

” না , আর না , এবার তুমি যাও আর মন খুলে আমার জন্যে দোয়া কর । ” বেদনার নোনা জলে যেন মহিলার সমস্ত চেহারা একাকার । এতো বিদায় নয় , এ ধরণী হতে চির বিদায়ের করুণ মহড়া , ভালবাসাহীন , আপনজনের সান্নিধ্যহীন জীবনের শেষ মুহূর্ত , অন্তিম সময়ে প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ার হাহাকার ! পৃথিবী হতে চির বিদায় নেবে অথচ ভালবাসার মানুষ গুলোর স্পর্শ পাবেনা , শেষবারের মত একবার দেখা হবে কি না — সেটাও অনিশ্চিত । জেনে শুনে নিজের বিদায়ের জন্যে অসহায় ভাবে প্রস্তুত হওয়া যে কতটা পীড়াদায়ক , মর্মান্তিক , বেদনায় মোড়ানো — সেটা কেবল ঐ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য ।

মাসুদ আর কথা বাড়ায় না , নিজের অজান্তেই চোখ দুটো কখন যে ভিজে একাকার , আর স্হির থাকতে পারছেনা সে ! মহিলার দিকে ফিরে তাকাবার মত মানসিক শক্তিও এ মূহুর্তে তার নেই । মায়ের জাতটাই এমন, অন্তিম মূহুর্তেও নিজের কথা চিন্তা না করে সন্তানের চিন্তায় উতালা । সন্তানকে কাছে পাওয়ার জন্যে আকুলতা , কাছে রেখে ভালবাসতে না পারার হাহাকার — যেটা সন্তানের পক্ষে উপলব্ধি করা অসম্ভব । মাসুদ ধীর গতিতে মাথা নিচু করে গাড়ীর দিকে পা বাড়ায় ! মনটা তার প্রবল ভাবে আন্দোলিত —- পৃথিবীর সকল মায়েদের জন্যে ভালবাসা নিরন্তর ।

লেখক: চেয়ারম্যান সুরমা নিউজ

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!