রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রবন্ধ : স্বাধীনতার রক্ত সোপান

খায়রুল হাসান রুবেল:
দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ (১৯০বছর)ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের শৃঙ্খল ছিন্ন করে যে অগ্নি মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষের সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে পূর্ব বাংলার জনগনও তাদের স্বাধীনতার দাবিতে প্রজ্বলিত হয়েছিল,আপাতদৃষ্টিতে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও১৫ আগষ্ট মুসলমান ও হিন্দুদের জন্য যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টি হলেও পূর্ব বাংলার জনগনের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যায় পাকিস্তানের অধীনে তাদের স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে।এ পর্যায়ে প্রথমেই আঘাত আসে মাতৃভাষা বাংলার উপড়।এখানে উল্লেখ্য যে সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ জনের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।আর যেহেতু গনতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল সেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা হিসেবে বাংলাই সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়ার কথা ছিল।কিন্ত পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগনের বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা” এমন ঘোষনা দেয়।অথচ পূর্ব বাংলার জনগনের দাবি ছিল উর্দুকে বাদ দিয়ে নয় বরং উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্র ভাষা করা হোক।কিন্ত পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী বরাবরই বাংলাকে বাদ দিয়ে শুধু মাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্বান্তে অটল থাকে। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালে”রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয়।

পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট ভাষা বাংলার দাবি উপেক্ষিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দানা বাধতে থাকে।যা ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে চূড়ান্ত রুপ লাভ করে।এদিন ভাষা আন্দোলনকে সফল করার জন্য গঠিত” সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের” পক্ষ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারীকে ” রাষ্ট্রভাষা দিবস” ঘোষনা করে হরতাল,সভা,ও শোভাযাত্রার সিদ্বান্ত হয়।কিন্তু এ কর্মসূচী বানচালের জন্য নুরুল আমিনের প্রাদেশিক সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।নিহত হয় সালাম,জব্বার,বরকত,রফিক,শফিউর সহ আরো অনেকে।গ্রেফতার করা হয় মাওলানা ভাসানী,আবুল হাশিম,আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ সহ অনেককে।এতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।নরুল আমিন দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নেন।এবং এপ্রিল মাসেই তা স্বীকৃতি লাভ করে।এখানে উল্লেখ্য যে শেখ মুজিবুর রহমান আগে থেকেই কারাবন্দি ছিলেন।এবং কারাগারে থেকেই এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় সর্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধীকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের সিদ্বান্ত হলে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টি সহ সমমনা কয়েকটি বিরোধী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহন করে।নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মুক্তি সনদ ২১ দফা ঘোষনা করা হয়।যার মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার সরকারী স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান।তরুন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ২১ দফার পক্ষে বাংলার গ্রাম গঞ্জ ঘুরে ঘুরে ব্যাপক জনমত তৈরি করেন।ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়।৭বছরের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগন ব্যালট বিপ্লব ঘটায়। কিন্তু চক্রান্ত করে মাত্র ২মাসের মাথায় ৯২(ক)ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করা হয়।গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিব সহ হাজার হাজার নেতা কর্মীকে।পাকিস্তানীদের অধীনে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তিক্ততা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর র্মির্জাকে ক্ষমতাচু্ত্য করে আইয়ুব খান নিজেই প্রধান সেনাপতি ও আইন প্রশাসক হিসেবে বহাল থাকার ফরমান জারি করে।তিনি তার উদ্ভাবিত মৌলিক গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দেন।তার ভাষায় পশ্চিমা ভাবধারার গনতন্ত্রের মর্যাদা এখানে রক্ষা করা কঠিন।তাই প্রশাসনে জনগনের অংশিদারিত্বের জন্য জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে পাকিস্তানের উভয় অংশ থেকে ৪০হাজার করে ৮০হাজার মৌলিক গনতন্ত্রি নির্বাচন করা হয়।এরা “বিডি মেম্বার”নামে পরিচিত ছিল।এদেরই আস্হা ভোটে ১৯৬০ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আইয়ুব খান।সাধারন মানুষ এ ধরনের পদ্ধতির সাথে এর আগে পরিচিত ছিলনা।

এদিকে ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আইয়ুবের করা গনবিরোধী হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে গনমুখী ওবিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা নীতির জন্য সফল গন অভ্যূথান পরিচালিত হয়।

১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে নির্বাচন ঘোষনা দেন আইয়ুব খান।এতে সম্মিলিত আন্দোলনের স্বার্থে ৫ টি বিরোধী দল মিলে আইয়ুবের বিপরীতে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করে।কিন্তু প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল নিজের পক্ষে নেন আইয়ুব খান।২য় বারের মত প্রেসিডেন্ট হন তিনি।

১৯৬৫ সালে পাক- ভারত যুদ্ধ বাধলে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।এ অঞ্চলের নিরাপত্তার ব্যাপারে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী চরম উদাসীনতার পরিচয় দেয়।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার প্রতি শাসকগোষ্ঠী যে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহন করে এতদিনে তা আরো চরম আকার ধারন করে।ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের উপড় অব্যাহত ভাবে অত্যাচার,নির্যাতন,জেল- জুলুম চলতে থাকে।শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যান্য নেতা কর্মীদের বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেলে পুরে রাখা হয়।রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,সামরিক, সামাজিক,শিক্ষা,চাকুরি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য চরম আকার ধারন করে।এ অঞ্চলের টাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন করা হয় অথচ পূর্ব বাংলা উন্নয়ন বঞ্চিত থাকে।সামরিক বাহিনী ও সরকারী চাকুরিতে গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অগ্রাধীকার দেয়া হয়।শিক্ষা খাতে সর্বাধিক ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।মুক্তচিন্তার দ্বার রুদ্ধ করা হয়। এমনকি রবীন্দ্র সংগীত পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে আওয়ামীলিগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান।৬দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের জন্য সারা দেশে উল্কার মত ছুটে বেরিয়েছেন তিনি।অল্প দিনের মধ্যেই ৬দফা বাঙ্গালীর প্রানের দাবিতে পরিনত হয়।দেশরক্ষাকারী আইনের আওতায় মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়।শেখ মুজিবুর রহমান সহ রাজবন্দিদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়।১৯৬৮ সালের ১৯ জুন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়।শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য ছাত্ররা সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেয়।এসময় ছাত্রসমাজ ১১ দফা উত্থাপন করে।৬ দফা আর ১১ দফার ভিত্তিতে ” সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের”ব্যানারে দুর্বার গন আন্দোলন গড়ে ওঠে।যা পরবর্তীতে ৬৯ এর গনঅভ্যূত্থানে রুপ নেয়।২২ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হয়।পরদিন ২৩ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ডাকসুর পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু “উপাধি দেয়া হয়।বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিনত হন তিনি।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইয়ুব খানের পতনের পর ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।এবং১৯৭০ সালের ৫ই অক্টোবর সর্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোটে জনসংখ্যার ভিত্তিতে গনপরিষদ গঠনের ঘোষনা দেন।পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যার কারনে নির্বাচন পিছিয়ে ৭ই ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের ও ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা করা হয়।এই নির্বাচনে ৬ দফা ও১১ দফার ভিত্তিতে একক ভাবে অংশগ্রহন করে আওয়ামীলীগ। এতে জাতীয় পরিষদে১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন সহ ৩১৩ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামীলিগ একক ভাবে ১৬৭ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৪৪ আসনের মধ্যে ৮৮ আসন পেয়ে ভুট্টোর পিপলস পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।উভয় দলই স্ব স্ব অঞ্চলের বাইরে কোন আসন পায়নি।এদিকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদে ৩০০আসনের মধ্যে আওয়ামীলিগ ২৮৮ টি আসন লাভ করে।

১৯৭১ সালের জানুয়ারী মাসে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনায় বসেন।বঙ্গবন্ধু ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করতে বলেন।কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শ না শুনে ভুট্টোর কথা মত মার্চের ৩ তারিখে অধিবেশন আহবান করেন ইয়াহিয়া খান।

এদিকে ১৫ই ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঘোষনা করেন ৬ দফার রদবদল ছাড়া তিনি অধিবেশনে যোগ দেবেন না।১ লা মার্চ ইয়াহিয়া আকস্মিক একতরফা ভাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অধিবেশন স্হগিত করেন।বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সারা পূর্ব বাংলা।উত্তাল ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিনত হয়।বঙ্গবন্ধু ২রা মার্চ ঢাকায়,এবং ৩ রা মার্চ সারা বাংলায় হরতাল,আর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)সমাবেশের ডাক দেন।এদিকে হরতাল কর্মসূচী বানচাল করতে ২মার্চ রাতে শহরে কারফিউ জারি করা হয়।উত্তেজিত জনতা কারফিউ ভঙ্গ করে রাজশাহী,যশোর,খুলনা,চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন শহরে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে।মিছিলে সামরিক বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয় অনেকে।

অবশেষে আসে সেই কাঙ্খিত দিন।৭ই মার্চ ১৯৭১। এদিন সমগ্র পথ এসে মিশেছিল একটি পথে।ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে)।কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়” শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন”।(হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সেই কবি)।

জনসমুদ্রের উত্তাল সৈকতের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর কালজয়ী ভাষন শুরু করলেন।তুলে ধরলেন দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলের শোষন বঞ্চনার ইতিহাস। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করে দিয়ে আলোচনার পথ খোলা রেখে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন।ঘোষনা করলেন ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

বঙ্গবন্ধু এদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষনা না দেয়ায় অনেকে হতাশ হয়েছিল।কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষ যার দিকে তাকিয়ে আছে তিনি জাতিকে প্রস্তুত না করে তাৎক্ষনিক এমন সিদ্বান্ত নিলে পরিনাম আরো কত ভয়াবহ হত পরবর্তিতে ২৫ মার্চের ঘটনা থেকে তা অনুমান করা যায়। মূলত ৭ই মার্চের ভাষনে বঙ্গবন্ধুর দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী চূড়ান্ত লড়াই এর জন্য বাঙালীরা প্রস্তুত হতে থাকে।

৭ই মার্চের পর পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার শাসন কার্যত অচল হয়ে পরে।সব কিছু চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী।বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে পূর্ব বাংলা তখন উত্তাল।ঢাকা পরিনত হয় মিছিলের নগরীতে।শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি।

৯মার্চ পল্টনের এক জনসভায় বর্ষিয়ান জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আাস্হা রাখার আহবান জানিয়ে বলেন “খামাখা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করবেন না,মুজিবকে আমি ভাল করে চিনি”।

১৫ ই মার্চ ১৯৭১। এদিন দলবল সহ ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান।১৬ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা চলতে থাকে।আলোচনার পাশাপাশি চলতে থাকে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন।কিন্তু আলোচনার সফলতা নিয়ে ক্রমেই সন্দেহ দানা বাধঁতে থাকে।২৫ মার্চ পর্যন্ত এ আলোচনা চলে।

ততোদিনে “অপারেশন সার্চ লাইট” নামে বাঙালী নিধনের নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছিল ইয়াহিয়া ও তার দোসর পাক হানাদার বাহিনী।আলোচনা যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে ২৪মার্চ সকালেই তা স্পষ্ট হয় বঙ্গবন্ধুর কাছে।তিনি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আলোচনায় বসেন এবং সবাইকে নিরাপদ স্হানে চলে যেতে বলেন।নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে পালিয়ে গোপন স্হানে গিয়ে আশ্রয় নিতে বললে তিনি রাজী হননি।তিনি বললেন ওরা আমাকে না পেলে বাংলার প্রতিটি ঘরে আক্রমন করবে,নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করবে,ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে তার চেয়ে বরং আমি থেকে যাই।শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত তোমরা লড়াই চালিয়ে যাবে।বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতে থেকে গেলেন।

২৫ মার্চ বিকাল ৪টায় সবার অগোচরে তড়িঘড়ি করে করাচীর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া খান।পেছনে রেখে যায় ইতিহাসের ভয়াবহতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নীল নক্শা।ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগেের পর বিকাল ৫ টায় গনহত্যার চূড়ান্ত আদেশ দেয়া হয়।

রাতের আধাঁরে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালীদের উপড় মানব ইতিহাসের ভয়াবহ গনহত্যা চালানো হয়।হানাদার বাহিনী প্রথমেই আক্রমন করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে।মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।২৫মার্চ দিবাগত রাত ১ টায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকার কুর্মিটোলায়নেয়া হয়।সেখান থেকে ২৯ মার্চ অত্যন্ত গোপনে করাচী নেয়া হয়।গ্রেফতারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার লিখিত ঘোষনা ওয়ালেসে পাঠানোর ব্যবস্হা করেন।এই বার্তার মুদ্রিত হ্যান্ডবিলই ২৬ মার্চ সকালে পৌছে যায় চট্টগ্রাম, সিলেট সহ কয়েকটি এলাকায়।

পরবর্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে চট্টগ্রাম কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ওয়ারলেসে পাঠানো তাঁর লিখিত স্বাধীনতার ঘোষনাটি পাঠ করা হয়।( সংক্ষিপ্ত করনের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরা সম্ভব হলো না)

ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ৩০লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগ আর ২লক্ষ নারীর সম্ভ্রম এর বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় রমনার রেসকোর্স ময়দানে(বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানী বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে।

বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ যা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যেমে আমরা অর্জন করেছি।১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই তা আবার বাংলার ভাগ্যাকাশে উদিত হয়।হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীনতার সোনার কাঠীর স্পর্শে জাগিয়ে তুলেছিলেন।যুগে যুগে বেদনা বিদূর এই জনপদের অবহেলিত মানুষগুলোকে তিনিই এক পাল্লায় তুলে এনে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।তারই ফলশ্রুতি আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।বাংলাদেশ বাঙ্গালীর তীর্থ স্হান।বাঙ্গালী জাতি সত্তার ধারক ও বাহক বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এক গৌরবোজ্জ্বল দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।এর এক একটি ঘটনা এক একটি অধ্যায়।সীমিত কোন পরিসরে এ আলোচনা সম্ভব নয়।২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরে এই প্রবন্ধটি তৈরি করলাম।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!