রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আমার দেখা ইংল্যান্ড-২ : লুটন যেন এক চির পরিচিত শহর

আহবাব চৌধুরী খোকন:
ইংল্যান্ডে পৌছার চার দিনের মাথায় লুটন টাউনে এসে মনে হল এ যেন আমার চির পরিচিত একটি শহর । আমার দুই চাচা তাঁদের জীবনের পুরো সময় কাটিয়েছেন এই লুটনে ।তাই ছোট বেলা থেকে লোটনের গল্প অনেক শুনেছি ।এখন আমার প্রিয় চাচাদের একজন আর এই হইজগতে নেই ।অন্যজন  শয্যাশাহী ।ভালো করে হাটা চলা করতে পারেন না। কিন্তু তাদের সন্তান সন্ততীরা সবাই আছেন এখানেই । আছেন আমার এলাকার প্রচুর মানুষ যাদের প্রায় প্রত্যেককে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি ।ভেবেছি পুরো দুই দিন

এই লুটনে আত্নীয় স্বজনদের সাথে কাটাবো ।সকাল বেলা হোটেলে আমার সাথে দেখা করতে এলো আমার শৈশব ও কৈশোরের প্রিয় বন্ধু তারেক ।সাথে তারই চাচাতো ভাই শাহ শিপন ।শাহ তারেকুজ্জামান ফেঞ্চুগন্জে জাসদ ছাত্রলীগের এক সময়ের সাহসী ছাত্রনেতা ।তারেকের সাথে এবার আমার দেখা হলো দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর পর ।এখনো মনে আছে ১৯৯৭ সালে এক মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় তাকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে বিদায় দিয়েছিলাম।তখন গিয়েছিলো সে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আবুধাবী । তারপর দেশে দেশে নোঙ্গর করে করে শেষ বসতি গড়েছে এই লোটনে ।ফোনে প্রায়ই  কথা হয় ।কিন্তু দেখা হয়নি সেই অনেক দিন ।এতো বছর পর দেখা হওয়ার পর মনে হলো তারেক সেই আগের মতই আছে ।চেহারা কিংবা আচার আচরনে কোন পরিবর্তনের কোন চাপ নেই ।

লুটন টাউন হচ্ছে বৃটেনের অন্যতম বাংলাদেশী অধ্যুষিত একটি এলাকা। ২০ হাজারের অধিক বাংলাদেশী বসবাস করেন এখানে। পাকিস্তানি ও ভারতীয় প্রবাসীদের সংখ্যাও কম নয় । লন্ডন সিটির কাছাকাছি হওয়াতে অনেক প্রবাসী বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছেন এই এলাকাকে ।পূর্বেই সিন্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম জুম্মার নামাজ এখানে পড়বো । লুটন অবস্থান কালে তিন রাত অবস্থান করেছি  হিলটন লুটন হোটেলে ।লোটন সিটিতে যতক্ষন ছিলাম  আমাদের সাথে সাথেই ছিল তারেক ও শিপন ।তাদেরকে সাথে নিয়ে প্রথম দিনই গেলাম এখানকার মুসলিম সিমীটারী (গোরুস্থান ) জিয়ারত করতে ।এই গোরুস্থানে শায়িত আছেন আমার পরলোকগত বড় চাচা মিছবাহ হোসেন চৌধুরীসহ  এলাকার অনেক পরিচিত জন ।বেরি পার্ক জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে গিয়ে মনে হলো যেন আমি আমার  গ্রামের মসজিদে (নূরপুর জামে মসজিদে ) নামাজ পড়ছি ।প্রায় তিন হাজার মুসল্লীর ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিশাল মসজিদের মুসল্লী প্রায় সবাই বাংলাদেশী এবং সিলেটি ।এই মসজিদের সভাপতি জনাব আবুল হোসেন আমারই এলাকার লোক ।

দীর্ঘ দিন পর দেখা হলো দুলালভাই, বাসিতভাই ,মুসফিক,ফয়জুল ইসলাম,ছায়ফুল ইসলাম,জোবায়ের হোসেন সহ এলাকার অনেকের সাথে  ।দুপুরে লাঞ্চের দাওয়াত ছিলো আমার চাচাতো বোন কলি আপার বাসায় ।কলি আপা আমারই সমসাময়িক । এক সাথে একই বাড়ীতে বেড়ে উটেছি আমরা ।দেখা হয়নি অনেকদিন  ।কলিআপার ঘরে দুপুরের খাবার খেয়ে ভেবেছিলাম এখানেই হয়তো আমার সকল আত্নীয় স্বজনের সাথে দেখা হয়ে যাবে ।কিন্তু না শেষ পর্যন্ত চাচাতো ভাই মোদাব্বিরকে সাথে নিয়ে এই দিন দুপুর৩টা  থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত এক এক করে দশ ঘরে যেতো হলো।সব শেষে রাতে ডিনারের দাওয়াত ছিল আমার চাচাতো বোন জুলির বাসায় ।সকল বাসায় খানাপিনার আয়োজন দেখে মনে হয়েছে ইংল্যান্ড প্রবাসীরা সত্যিই খুব অতিথি পরায়ন এবং ভোজন বিলাসী ।অনেক দিন পর দেখা হলো আমার শ্রদ্ধেয় মেঝ চাচা আশরাফ হোসেন চৌধুরী ও বড় চাচী ও মেঝচাচীর সাথে ।তিনজনই বয়সের ভারে এখন অসুস্থ ।আমাকে  পেয়ে তাঁরা যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন পৃথিবীর কোন স্কেল কিংবা পরিমাপ যন্ত্র দিয়ে মাপা সম্ভব নয়।

লুটন টাউন অবস্থান কালে ঘুরে দেখেছি এখানকার বিপনী বিতান গুলো ।প্রায় সকল দোকানের  সাইন ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলায় লাগানো ।রেডিমেট কাপড় ও স্বর্ণের দোকান গুলো দেখে আমার নিকট মনে হচ্ছিল যেন সিলেট শহরের  জিন্দাবাজারে এসেছি ।গ্রোসারী স্টোর গুলোর সামনে শুভা পাচ্ছিল বড় বড় কাঠাল , নাগামরিচ,সাতকরা,লাউ শাক,কদু শাক,কোদাল থেকে শুরু করে প্রায় সকল বাংলাদেশী পণ্যের  সম্ভার ।দোকান গুলোর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে বাংলা স্টোর, বাংলা বাজার, সুরমা স্টোর,শাজালাল মার্কেট,আল আমিন মার্কেট,মাছ বাজার,উজান ভাটি ।বেরিপার্ক মসজিদের পাশেই রয়েছে শিপনের কফি শপ ।কপি শপে এলাকার লোকদেরসাথে আড্ডা দিতে গিয়ে মনে পড়ে গেলো ফলে আসা দিন গুলোর স্মৃতি ।দেশে একসময় অবসর সময় বন্ধু-বান্ধব মিলে মাসুকভাই কিংবা গিয়াসভাইয়ের দোকানে এভাবে আড্ডা দিয়ে অলস সময় কাটাতাম । ইংল্যান্ডের ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমার কোন পূর্ব ধারণা ছিল না ।এসে দেখলাম এখানকার হাইওয়ে (মটরওয়ে )গুলো দুই লেনের ।ফলে এখানেও আছে দেশের মতো
বিরক্তিকর ট্রাফিক ।

পুরো দু্ই  দিন লুটন টাউনে চষে বেড়িয়ে অতঃপর রওয়ানা দিলাম লন্ডন সিটির উদ্দ্যেশে ।পৃথিবীর অন্যতম একটি বানিজ্যিক নগরীর নাম লন্ডন । টেমস নদী তীরবর্তী এই লন্ডন সিটি হচ্ছে ইংল্যান্ডের রাজধানী ।প্রায় সত্তর লক্ষ লোকের বসতি স্থান এই লন্ডন সপ্তদশ শতক থেকে গোটা বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ স্থান দখল করে আছে ।অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে এই সিটিতে প্রায় দুই লক্ষ বাংলাদেশী বসবাস করেন যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই সিলেটী।এই সিটিতে ভ্রমনকালে  যে দিকেই চোখ পড়েছে দেখেছি বাংলাদেশীদের জয়জয়কার ।সর্বত্র দেশী আমেজ । লন্ডনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে আলতাফ আলী পার্ক ।এই পার্কের আবার ভিতরে রয়েছে লন্ডনের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ।পাশ্বে বিশাল আকৃতির ইষ্ট লন্ডন জামে মসজিদ ।এই মসজিদে এক সাথে দশ হাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারে ।এই মসজিদের আকার ও আয়তন ও কার্যক্রম জেনে আশ্চর্য হয়েছি ।লন্ডনে বাংলাদেশীদের এই বিশাল অর্জন নিঃসন্ধেহে প্রশংসনীয় ।আমি যখন ইষ্ট লন্ডনের স্ট্রীট ধরে হাটছিলাম মনে হয়েছিলো যেন ঢাকা গুলিস্তান এসেছি । সুপার মার্কেট গুলোর বাহিরে স্ট্রীটে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে রংবেরংযের  শাড়ী ও থান কাপড়ের বাহার ।ইষ্ট লন্ডনের প্রায় সকল ব্যবসা প্রতিষ্টানের সাইন ইংরেজীর পাশাপাশি বল্ড অক্ষরে বাংলা ভাষায়  লেখা হয়েছে ।রেষ্টুরেন্ট ও গ্রোসারী সহ বাংগালীদের  ব্যবসা প্রতিষ্টান গুলোর নাম দেখলে বুঝা যায় তারা মনের গহিনে দেশকে কতটা লালন করেন ।যেমন আমার গাও , কলাপাতা,গ্রাম বাংলা ,বাংলা টাউন, আলাউদ্দীন, মধুবন , মাছ বাজার, মৌবন ,বাংলাবাজার, কাঁচা বাজার,  প্রিমিয়াম ইত্যাদি ।এই সকল ব্যবসা প্রতিষ্টানে গিয়ে দেখা হলো পরিচিত অনেকের সাথে  ।ইষ্ট চপলে আমার গাও রেষ্টুরেন্টে চা পান করতে গিয়ে দেখা হলো যুক্তরাজ্যস্থ বিএনপি নেতা লূৎফুরভাইয়ের সাথে ।আমি যখন কুলাউডায় ছাত্ররাজকরতাম লূৎফুরভাই তখন মৌলভী বাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন ।

সে সময় তাঁর সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল ।কিন্তু ৮৮ সালের পর এই প্রথম দেখা ।লূৎফুরভাই দেখা মাত্র জড়িয়ে ধরলেন ।জানতে চাইলেন কবে এসেছি ।

লন্ডনে সিটিতে পৌছে প্রথম দিন আমাদের লাঞ্চের দাওয়াত ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সজিবের বাসায় ।সজিবের বাড়ী কুলাউড়ায় ।অনেক দিন যাবৎ লন্ডনে আছে ।লন্ডন পৌছে সজিবের বাসায় বউ বাচ্চাদের রেখে বের হলাম যুক্তরাজ্যস্থ কুলাউড়া সমিতি আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে।আমার জন্য লন্ডন সিটিতে বসবাসরত কুলাউডার কিছু সিনিয়ার ভাই ও সহপাঠী আয়োজন করেছিলেন এই অনুষ্টানের ।এই অনুষ্টানে গিয়ে এমন অনেকের সাথে দেখা হলো যাদের সাথে ৮৮ ও ৮৯ সালের পর আর দেখা হয়নি । ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কুলাউড়া কলেজে অধ্যয়নের সুবাদে আমার জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কেঠেছে এই কুলাউডায় ।এক সময় মানুষ ভাবতো আমি কুলাউড়ার লোক ।কুলাউড়ার এমন কোন গ্রাম কিংবা ইউনিয়ন নেই যাওয়া হয়নি আমার ।সেই সময়ের অনেক বন্ধু বান্ধব , রাজনৈতিক সতির্থ ও সহপাঠীদের সাথে এখনো ফোনে য়োগাযোগ হলেও নানা কারণে দেখা হয়না অনেক দিন ।আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম আমার মতো নগন্য একজন মানুষের প্রতি তাদের এই সৌজন্যতা দেখে । কুলাউডায় আমার ফেলে আসা সেই সময়ের স্বর্ণালী মুহুর্ত গুলো স্মৃতি থেকে কখনো মুছে যাওয়ার নয়।শনিবারের মতো একটি ব্যস্ত দিনে ইষ্ট লন্ডনে  কুলাউডা ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশন অব ইউ কে আয়োজিত এই অনুষ্টানে পৌছে মনে হয়েছে যেন আমি ফিরে এসেছি চির  পরিচিত সেই কুলাউডায় ।শ্রদ্ধেয় শরিফুজ্জামান চৌধুরী তপনভাই, মুক্তারভাই, শাহাজাহান আহমদ ,বি এন পি নেতা আব্দুল হামিদ,আব্দুর রহমান ,কয়েছ আহমদ, রবিন আহমদ, বন্ধুবর সজিবুর রহমান ,জুনেল আহমদ,  ইমতেয়াজ আহমদ রানা এবং সর্বোপরি এসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল হায়দার রাজু ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান সহ উপস্থিত সকলের আন্তরিকতা ও আতিথিয়তা আমাকে চীর কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছে । কুলাউড়ার মিটিং শেষ করে সজিবের ঘরে দুপুরের লাঞ্চ খেয়ে বের হলাম লন্ডন সিটি ভ্রমনে ।সজিবের স্ত্রী ও দুই মেয়ের আন্তরিক আতিথীয়তায় খুব ভালো সময় অতিবাহিত করলাম তার বাসায় ।

চলবে…
লেখক -সংগঠক ও কলামলেখ।।, নিউইয়র্ক ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!