মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক খানের নামে সিলেটে রাস্তা নামকরণের দাবি প্রবাসীদের  » «   মেয়েকে বলেছি তোমার মা আল্লাহর কাছে, আমিই এখন তোমার মা এবং বাবা  » «   সিলেটে ধর্ষণ ও সন্তানদেরকে গুম করে ফেলার হুমকি ছাত্রলীগ নেতার  » «   ১৪দিনেও উদ্ধার হয়নি ব্রিটিশ কন্যার স্বামী, মামলা নিচ্ছে না পুলিশ  » «   যুক্তরাজ্যে দয়ামীর ইউনিয়ন এডুকেশন ফোরাম ইউকের আত্মপ্রকাশ  » «   সুনামগঞ্জে আ.লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক ৪  » «   সিলেটসহ সাত জেলায় সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী-সন্তানসহ ১০ জনের মৃত্যু  » «   সিলেটে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত যারা  » «   নৌকার প্রার্থী আতাউরের বাড়িতে বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী পল্লব!  » «   হবিগঞ্জে প্রেমিকের সাথে অভিমান করে কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা  » «  

সিলেটকে বলা হতো টিনশেডের টাউন : সেকালে কেমন ছিল কেনাকাটা ?

আবদুল হামিদ মানিক:
সিলেট শহর এখন মহানগর। টাউন নয় সিটি। দিনে দিনে এর আয়তন বাড়ছে। (সিটির আয়তন ২৬.৫ বর্গ কিলোমিটার) শরীরে চাকচিক্য বাড়ছে। প্রসার ঘটছে নাগরিক কার্যক্রমের। বাড়ছে নাগরিক চাহিদা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হচ্ছে এই নগর। গড়ে উঠছে দালানকোঠা। নির্মিত হচ্ছে বাড়তি সুযোগ-সুবিধাসহ বহুতল মার্কেট। অথচ মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেও পরিবেশ ছিল অন্য রকম। কেমন শান্ত শান্ত, নরম নরম মেজাজের পরিবেশ। শহর, টাউন বলতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলকেন্দ্রকে বোঝানো হতো। সুবিদবাজার, মজুমদারী, শেখঘাট, মিরাবাজার, কুমারপাড়ায় কারো বাসায় গিয়ে ডাকাডাকি করলে ভেতর থেকে আওয়াজ আসতো, ‘তিনি বাড়িতে নেই, টাউনে গেছেন’। এখন টাউন এর সে ধারণা পাল্টে গেছে। সিলেট শহরে ঘরবাড়ি দোকান ছিল বেশিরভাগ টিনশেড-একতলা। দোতলাও ছিল কাঠের ছাদে। জিন্দাবাজার, বন্দরে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে কাঠের দোতলায় উঠতে হতো। এজন্য সিলেটকে বলা হতো টিনশেডের টাউন। এখন সেই পরিচিতি বিশাল বিশাল দালানের নিচে চাপা পড়ে গেছে। এটি হচ্ছে কালের ধর্ম। তবে সিলেটে পরিবর্তনটা হয়েছে খুব দ্রুত। পরিবর্তন ঘটছেও দ্রুত বেগে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল মানচিত্রের এই জমজমাট নগর কেমন ছিল দু’শ আড়াইশ বছর আগে? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি রবার্ট লিন্ডসে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে রেসিডেন্ট হয়ে এলেন সিলেটে। তাঁর জবানে তখন সিলেট শহর : ‘আমার কর্মচারীরা নানা রকম নৌকা সাজিয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। গন্তব্যে পৌছে তাঁরা আমাকে আমার নির্ধারিত বাসায় নিয়ে গেলেন। শহর কোথায় জানতে চেয়ে দেখলাম এটি সামান্য বাজার মাত্র। ঘরবাড়িগুলো একটু অন্য রকম এবং বিক্ষিপ্ত, উঁচুনিচু টিলার ওপর বাড়িগুলো এমন ঘন গাছপালায় ঘেরা যে, সহজে দেখা যায় না। শহরটি অদ্ভুত, তবে মনে হলো, এ শহরে আরাম আছে। দু’শতাধিক বছর আগের সেই বাজার এখন চেহারা সুরতে, জৌলুস ঐশ্বর্যে, নগরের রূপ সুষমায় দৃষ্টি কাড়ে সকলের। সেই আলমপুর থেকে কুমারগাঁও বাস টার্মিনাল, খাদিম থেকে লাউয়াই পর্যন্ত শহরের আমেজ বিস্তৃত। এই শহরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। লেনদেন, কেনাকাটা চলে। ছেলে বুড়ো, নরনারী, শিশু-কিশোর এই কেনাকাটায় সৃষ্টি করেছেন বৈচিত্র্য; বাজার লাভ করেছে নতুন এক মাত্রা ও প্রাণপ্রবাহ- যা চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর আগে ছিল না।
এক সময় বলা হতো সংসারী মানুষই কেনাকাটা করে। বিয়ের পর ‘ভুল গায়ে রূপ রং ভুল গায়ে নাগরী/তিন চিজ ইয়াদ রহে তেল নুন লাকড়ি’ অর্থাৎ ক্রেতারা ছিলেন সীমিত বিশেষ এক স্তরের। পরিবারের কর্তা সব কিনতেন। পেটের পিঠের শখের সব। বই-খাতা, শাড়ি-গয়না, চাউল-ডাইল, ওষুধপথ্য সব এক হাতে। এমনকি রোজগারে ভাই বা ছেলেও টাকা জমা দিতো কর্তার হাতে। তাঁর পছন্দই ফাইনাল। বউ কি বাজারে যাবে? বাচ্চারা নিজের পছন্দে বাবা দাদাকে কিনতে বাধ্য করবে? এমন সুযোগ প্রায় ছিল না। শুধু গ্রামে নয় এই সিলেট শহরেও সত্তর এমনকি আশির দশকে কেনাকাটার হালহকিকত আজকের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ছিল। পাকিস্তান আমলের শেষ দশকের সঙ্গে আজকের তুলনা করলে রীতিমতো বিস্ময়ের ঘোর লাগে।
সোজা কথায় বলি, সময়ের পরিবর্তনে মানুষের চাহিদার প্রকৃতি ও পরিমাণ বেড়েছে। তেল নুন লাকড়িতে জীবন এখন বাধা নয়। আবার ক্রেতাদেরও স্তর ও প্রকৃতিতে ভিন্নতা এসেছে। এখন সকল বয়সের নারী পুরুষ, বউ-ঝি ধনী-গরিব বাজারে যান। কেনাকাটা করেন। প্রয়োজন বেড়েছে, রুচির পরিবর্তন এসেছে। জীবনের অনুষঙ্গ রকমারি পণ্য উৎপাদিত, বাজারজাত হচ্ছে। বলা হচ্ছে এ যুগ কনজিউমারিজমের। এর ভালো মন্দ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এখন বাজারে জৌলুস বেড়েছে। বেড়েছে কেনাকাটা। কেনাকাটার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। আগে দোকানকে কেন্দ্র করে কেনাকাটা হতো। এখন মার্কেটকেন্দ্রিক। আগে বাজার থেকে পুরুষ সদস্য কাপড় জুতো ঘরে নিয়ে আসতেন। মহিলারা পছন্দ করতেন। কদাচিৎ বদলে আনতে হতো। এজন্য চেনাজানা দোকানে যেতেন ক্রেতারা। এখন নারীই সোজা বাজারে চলে যাচ্ছেন। সঙ্গে শিশু-কিশোর ছেলেমেয়ে। যে মার্কেটের ইমেজ ভালো সেখানে ভিড় করে দেখে শুনে কেনাকাটা করেন মহিলারা। শিশুদের চয়েসও গুরুত্ব পাচ্ছে। যুবক ছেলেমেয়েকে মা-বাবা টাকা দিচ্ছেন। নিজেরা পছন্দমতো কেনাকাটা করছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, বাজার এখন বহু রুচি, বহু বয়সী ক্রেতাদের পছন্দ অপছন্দে বিচিত্র বর্ণে মুখরিত ও সজ্জিত।
সত্তর দশকের সিলেট শহর কেমন ছিল, আজকের পঁচিশের যুবককে তা বললে গল্পের মতো মনে হবে। ঝলমলে বিপণিবিতান নেই। হাতেগোনা কয়েকটি নামকরা দোকান। মার্কেট বলতে হাসান মার্কেট। বিয়ের কাপড় চোপড়ের বাজার হতো তখনকার অভিজাত এই মার্কেট এবং বক্স ব্রাদার্স, মোবারক ক্লথ স্টোর ছাড়া জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজারে আরও দু’একটি ঘরে। শৌখিন ও মনোহারী দ্রব্যের জন্য ফ্রেন্ডস সোসাইটি, সিরাজ ব্রাদার্স, করিমউল্লাহ অ্যান্ড সন্স। মিষ্টির জন্য বন্দরবাজার আলাইপট্টি। চাল-ডাল-পিয়াজ-রসুনের বাজার কাজিরবাজার। মৃৎশিল্প, মাটির হাঁড়ি বাসন কিনতে হলে কিনব্রিজের নিচে নদীর পার। লোহা লক্কড়, ছাতা, তালা, ট্রাংক, স্যুটকেসসহ এ জাতীয় পণ্যের জন্য মহাজনপট্টি। কালীঘাট, লালদিঘিরপার পাইকারি বিক্রেতাদের আড়ত। বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, কাজিরবাজার, কালীঘাট, মহাজনপট্টি এই ছিল শহরের কেনাকাটার কেন্দ্র। চীনামাটির ও অ্যালুমুনিয়ামের বাসনকোসন, ক্রোকারিজ-বন্দরবাজার, মহাজনপট্টিতে পাওয়া যেত। বইপত্র ও স্টেশনারিজও ছিল এখানে সেখানে ছড়ানো। আজ ওষুধের মার্কেট বলতে স্টেডিয়াম, বইয়ের মার্কেট বলতে রাজা ম্যানশন ও কুদরতউল্লাহ মার্কেট বোঝায়। সত্তর এমনকি আশির দশক পর্যন্ত এমনটি ছিল না। জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে আজকের রাজা ম্যানশন এবং সিলেট মিলেনিয়াম-এর জায়গায় ছিল টিনশেড বসত বাড়ি। এখন ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা। জিন্দাবাজার থেকে পূর্বদিকের দৃশ্যও ছিল অভিন্ন। কুদরতউল্লাহ মার্কেটের চেহারাও ছিল অন্য রকম। বেশির ভাগই ছিল টং দোকান। বাইরের দিকে একটি ঘরে (নভেল বুকস্টল) এবং বন্দর থেকে জেল রোড ঢোকার সময় বাম দিকে একটি কর্নারে আমরা কিনতাম সোভিয়েত ও চীনা সাহিত্য। মাওসেতুঙের লাল বই, গোর্কির উপন্যাস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, লেনিনের বক্তৃতা, মার্কসের মজুরি ও মুনাফাতত্ত্ব ইত্যাদি এই দু’একটি ঘরেই পাওয়া যেত। আজকের দিনে পত্রিকা ঘরে ঘরে পৌছে দেয়া হয়। ভোরে ঢাকার পত্রিকা এসে যায় সিলেটে। এটি তখন ছিল অপ্রত্যাশিত। তখন নিউজ এজেন্সি থেকে গ্রাহকদের ঘরে পত্রিকা পাঠানো হতো। অনেকে নিজে সংগ্রহ করতেন। পত্রপত্রিকার জন্য আমরা বন্দরের হকার পয়েন্টে বিকেলে জড়ো হতাম। তবে এত হকার ও পত্রপত্রিকা ছিল না। ফটোস্ট্যাট, লেমিনেটিং, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ছিল অচেনা। কম্পিউটার কল্পনারও বাইরে।
ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা ফাস্ট ফুড বলে কিছু মনে পড়ে না। বিপণিবিতান নেই। জুতোর বিশেষ দোকান বলতে বাটা-ই ছিল। এদিকে জিন্দাবাজারে জালালাবাদ মার্কেট, ইদ্রিস মার্কেট, সবুজবিপণি চালু হলে হাসান মার্কেটের গুরুত্ব হ্রাস পায়। আজ আল-হামরা, মানরু, সিলেট প্লাজা, শুকরিয়া, সিলেট মিলেনিয়াম মার্কেট ইত্যাদির সামনে এগুলো অন্ধকার। অতীতে এখানে সেখানে ছিল বেকারি। এখন কনফেকশনারির ঝলমলে আলোতে বেকারি শব্দ প্রায় অচেনা হয়ে গেছে। ছিল স্বর্ণকারের দোকান। বিয়ের সময় ডিজাইন বই নিয়ে আসা হতো ঘরে। ছবি দেখে পছন্দ করা হতো অলংকারের ডিজাইন। এখন বর ও কনেপক্ষের মহিলারাই সমৃদ্ধ জুয়েলারির শো-রুমে গিয়ে পছন্দ করেন, অর্ডার দেন। রেডিমেড শার্ট, প্যান্ট অথবা মেয়েদের বারো রকম ড্রেসের বাহারি ছিল না। তৈরি কাপড়ের বা গার্মেন্টস এর চেয়ে দরজির দোকানে মাপজোখ দিয়ে বানানো ড্রেসের স্টেটাস ছিল ওপরে। মাস্টার টেইলার্স, বক্স টেইলার্সের সুনাম ছিল খুব। খাবার হোটেল রেস্টুরেন্ট-এর মধ্যে নামকরা ছিল মোবারক, রয়েল হোটেল, মডার্ন, ওরিয়েন্টাল, সিরাজী, আরজু, জিন্দাবাজারের কোয়ালিটি ও দক্ষিণ সুরমায় সীতারা। চাইনিজ রেস্তোরা স্বাধীনতার পর-বেশ পরে চালু হয়। জালালাবাদ মার্কেটে সম্ভবত পিংপং নামে প্রথম এ ধরনের রেস্তোরাঁ খোলা হয়। মশরাফিয়ার দই ছিল বিখ্যাত। হিল টাউন, গুলশান, অনুরাগ, পলাশ চালু হয় অনেক পরে।
আধুনিক আবাসিক হোটেল দেখে সত্তর দশকের অনুমান করা কঠিন। তখন অধিকাংশ হোটেল ছিল এক রকম বারোয়ারি বা পঞ্চায়েতি মেজাজের। বিশাল চৌকি। গা ঠাসাঠাসি করে শোয়ার ব্যবস্থা। এক সিট চার আনা বা ওই রকম ভাড়া। পাশাপাশি বিছানো আলাদা চৌকিও ছিল। ভাড়া বেশি। সিটে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কেউ কেউ কম খরচে রাত কাটাতেন এমনভাবে যে শুয়ে পাশ ফেরাতে পারতেন না। পাশ ফেরানোর মতো সুযোগ ছিল- এমন হোটেলকে গ্রামের লোকজন বলতেন ‘চিত-কাইত হোটেল। দরগার সামনে, লালবাজার ও বন্দরবাজারে এ ধরনের হোটেলে রাত হলে মজার দৃশ্য দেখা যেত। নানা স্থানের নানা রুচির মানুষ। কেউ কাউকে চিনে না। অথচ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘুমাচ্ছে, নাক ডাকাচ্ছে। না প্রাইভেসি, না বিরোধ। এ পটভূমিতে অভিজাত হোটেলের তালিকায় গুলশান ছিল শীর্ষে।
ফটো তোলার শখ লোকের আগেও ছিল। তবে আজকের মতো অত্যাধুনিক ক্যামেরা ছিল না। ভিডিও ক্যামেরা এবং বিয়ের অনুষ্ঠান ভিডিও ধারণ বলতে গেলে সাম্প্রতিক সংযোজন। তবে সিলেটে ষাট দশক থেকেই ফটো তোলার ব্যবসা জমজমাট ছিল। কারণ পাসপোর্টের জন্য ফটো তোলার প্রয়োজন। হাসান মার্কেটের বাইরের কোর্টমুখি অংশে আগেও ছিল অনেকগুলো ফটো স্টুডিও। আমরা কোয়ালিটি ছবির জন্য যেতাম জিন্দাবাজার (বর্তমান সিলেট প্লাজার লাইনে) বর্মণ ফটো স্টুডিওতে। কাঠের দোতলায় ছিল বর্মণ স্টুডিও। যেতাম বন্দরবাজার শিল্পাশ্রমে। এটিও ছিল কাঠের দোতলায়।।
আগে চাহিদা ছিল কম। কেনাকাটার সামর্থ্য ছিল সীমিত। নগদ অর্থকেন্দ্রিক নয় জীবন ছিল বস্তুকেন্দ্রিক। মানুষ এত বাজারমুখি ছিল না। পণ্যেরও এত বৈচিত্র্য ছিল না। বোতলে পানি কিনে খাবার কল্পনাও আমরা করিনি। লাইব্রেরি বলতেই বুঝতাম বইয়ের দোকান। এখন ভিডিও লাইব্রেরির সংখ্যা বইয়ের লাইব্রেরির চেয়ে কম নয়।
হ্যাঁ, ইলেকট্রনিকস-এর ব্যবসা এখন জমজমাট। সত্তর দশকে ফ্রিজ, টিভি অনেকের কাছেই ছিল অচেনা। ট্রানজিস্টার রেডিও ছিল বহু বড় জিনিস। এর আগে ছিল কলের গান। এগুলোর ক্রেতা ছিল কম। জুতার দোকান ছিল কম। আমরা অনেক সময় চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানা যাবার পথে ডান দিকে কাঁচা ঘরগুলোতে ঘুরে পায়ের মাপ দিয়ে জুতো বানিয়েছি। ঢোল-ডপকিরও কেনাবেচা হতো এখানে।
এখন অত্যাধুনিক ডেকোরেশনের আলো ঝলমল দোকানে ঢুকে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। গার্মেন্টস, ক্রোকারিজ, বিলাস দ্রব্য, কসমেটিক্স, শৌখিন দ্রব্যাদি, খেলনা, হাতের তৈরি দ্রব্যাদি, নকশি করা মনোহর আসবাবপত্র একেকটি ঘরে ঠাসা। কত কিনবেন?
আগে নগদ অর্থের ছড়াছড়ি ছিল না। জীবনের উপকরণও ছিল সীমিত। শহরে কোথায় কোন দরকারি জিনিসটি মিলবে, সবার জানা ছিল। এখন আমরা খেই হারিয়ে ফেলেছি। তামুকখোর কেউ যদি আল-হামরায় ঢুকে টিকি খুঁজেন, সবাই হাসবেন। কিন্তু সবকিছু এমন বদলে গেছে যে, ঠাহর করা মুশকিল। নগদ টাকা আছে হাতে। চাহিদাও আছে। কম্পিউটার থেকে ক্যাসেট, সুঁই সুতো, হাত ব্যাগ, প্যাকেট খাবার, নকশিকাঁথা, স্কুল ব্যাগ, রং, তুলি পর্যন্ত সব চাই। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হওয়ার যোগাড়। কোথায় পাবো তারে খুঁজছি আমি যারে। এ অবস্থায় সার্ভিস বিক্রির প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে। সংস্থার মেম্বার হবেন। মাসিক চাঁদা দেবেন। ফোনে চাহিদাটি জানাবেন। তারাই কাম্য দ্রব্যটি ঘরে পৌঁছে দেবেন।
আবারও বলি, জীবনের প্যাটার্ন বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন উপকরণ যোগ হচ্ছে জীবনে। শহরে ছাইও বিক্রি হয়। গ্যাসের চুলায় ছাই হয় না। মাছ কাটতে গিন্নির দরকার ছাই। পাবো কোথায়? খুঁজতে হয়। ঈদে কেনাকাটাও আগে ছিল সীমিত। কাপড়-চোপড়, জুতা আর খাবার সামগ্রী। এখন তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। নিত্যনতুন ডিজাইনের ফার্নিচার, টিভি, ফ্রিজও এখন ঈদের বাজারে ঠাই করে নিয়েছে। এসব কেনাকাটার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও অনেক বেড়ে গেছে। শিক্ষিত যুবক-তরুণরা ব্যবসায় আসছেন। তাঁরা সনাতন রীতিনীতি ও সাজ-সজ্জাতে আনছেন পরিবর্তন। একেকটি দোকান ও মার্কেট একেকটি ইমেজ নিয়ে চলছে।
এত খোঁজাখুঁজি আর পণ্যের প্রাচুর্য কেনাকাটায় এক ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এরপরও এটি জীবনের ধর্ম। ক্রেতারা পছন্দসই পণ্য কিনছেন। সুবিধাই হয়েছে কেনাকাটার। তবে সবকিছু সম্পর্কে খবরাখবর রাখার দরকার আছে। অন্যথায় আফসোস করতে হবে। কারণ ক্রেতা-বিক্রেতার রশি টানাটানির কালচার এখনো আমাদের দেশে টিকে আছে।
গ্রিসের একটি বড় দোকানে দার্শনিক সক্রেটিসকে (জন্ম : ৪৬৯, মৃত্যু : ৩৯৩ খ্রিস্টপূর্ব) নিয়ে গেছেন শিষ্যরা। ঘুরে ঘুরে দেখলেন থরে থরে সাজানো বিচিত্র সব জিনিস। বেরিয়ে এলেন ভাবলেশহীন। শিষ্যরা মন্তব্য শুনতে চাইলেন। সক্রেটিস বললেন-দামি দামি এত জিনিস দিয়ে ঘরটা ভরে রাখা হয়েছে যার একটিরও আমার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু সবাই তো আর সক্রেটিস নয়। আবার এ যুগে সক্রেটিস হতে হলেও চাই এমন সব পণ্য যা অতীতে কল্পনাও করা যায়নি। দুনিয়াবিমুখ দার্শনিককেও এখন অনেক কিছু কিনতে হবে- যা না হলেও হয়তো বেঁচে থাকা দায়। সৌজন্যে: সিলেটের ডাক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!