রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
এবার ওমান থেকে নির্যাতিত হয়ে ফিরলেন সুনামগঞ্জের নারী  » «   বসন্ত উৎসব মাতাতে সিলেট আসছেন কুমার বিশ্বজিৎ  » «   ওসমানীর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি  » «   কুড়িয়ে পাওয়া টাকা মালিকের হাতে দিলেন জগন্নাথপুরের হাফিজ জিয়াউর  » «   মেহেদীর রং না মুছতেই সিলেটে ঘাতক বাস কেড়ে নিলো তাসনিমকে  » «   নাসায় ডাক পেলো বিশ্বের ৭৯ দেশকে পেছনে ফেলা শাবির ‘টিম অলিক’  » «   সিলেটের ভাষা নিয়ে যারা ব্যাঙ্গ করেন তাহারা নির্বোধ (ভিডিও) : ভারতীয় অধ্যাপক  » «   সিলেটে চুন দিয়ে জাহেদের চোখ নষ্ট করা ঘাতক ছানুর ফাঁসির দাবি  » «   বিনা খরচে রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের লাশ দেশে যাবে : অর্থমন্ত্রী  » «   সিলেটে এসে পৌঁছেছে লন্ডনী ফুটবল টিম  » «  

নব্যতা হারাচ্ছে সিলেটের গর্ব সুরমা, দেখছে না কেউ

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
দীর্ঘ দিন ধরেই সুরমায় নদীর ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য চলছে। এতে এক পাড়ে অস্বাভাবিক চর জাগছে তো অন্য পাড় বিলীন হচ্ছে ভাঙ্গনে। কেউ কেউ আবার দুই পাড় দিব্যি দখল করে গড়ে তুলছেন স্থাপনা। সব মিলিয়ে দিন দিন নব্যতা হারাচ্ছে সিলেটের গর্ব সুরমা। আর পানির গতি থমকে প্রতিদিনই কুৎসিত আকার ধারণ করে রূপও হারাচ্ছে একসময়ের স্রোতস্বিনী নদীটি।

সরেজমিনে সুরমার পাড় ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ এক দূষণের চিত্র। নদীর অবস্থা এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জেগে ওঠা চরে বালুর ওপর কয়েক স্তরে ময়লার স্তুপ তৈরি হয়েছে।

দু’পাড়ের চিত্রই এক। পুরো শহরের ময়লা পানি গিয়ে পড়ছে সুরমায়। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে নগরের বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে খ্যাত কালিঘাট অংশটি। সুরমার উত্তর পাড়ের এ এলাকাটি মোঘল আমল থেকেই পুরো সিলেটের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। জেলার তেরোটি উপজেলারই পাইকারি বাজার এই কালিঘাট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানা প্রকার নিত্য পণ্য এসে পৌঁছায় বাজারটিতে। এসব পণ্যের কয়েক টন বর্জ্য প্রতিদিনই ফেলে দেয়া হয় সুরমার বুকে।

কালিঘাটের ঠিক ওপাড়ে চিত্র আরো ভয়াবহ। চাঁদনিঘাট হিসেবেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে সুরমার দক্ষিণ পাড়ের এই অংশটি। এখানে গড়ে উঠেছে সিলেটের গাড়ি ভাঙ্গা শিল্প। রাজধানীর ধোলাইখালের বিকল্প সিলেটের চাঁদনিঘাট। স্থানীয় ভাষায় চান্নিঘাট হিসেবেই স্থানটি পরিচিত। এখানে প্রতিদিনই ভাঙ্গা হয় একাধিক পুরনো গাড়ি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হয়। আর অপ্রয়োজনীয় লোহা-লক্কর গিয়ে চাপে সুরমার বুক। দীর্ঘ সময় থেকে এমনটিই হয়ে আসছে।

পরিবেশ দফতর কিংবা সিটি করপোরেশন কারো নজরই না থাকায় সুরমার দুপাড়ের এই অপব্যবহার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে প্রতিদিন।

শুকনো মৌসুমে এই চিত্র ভয়াল আকার নেয়। দু’পাড়ে বর্জ্যের স্তুপে এক শীর্ণ- কুৎসিত রূপ নেয় এক সময়ের রূপযৌবনা সুরমা। আর যে অংশটিতে দু’পাড়েই চর জেগেছে, সে অংশটি দেখলে কষ্টে বুক ফাটবে নদী ভালোবাসেন এমন পরিবেশবাদীদের। পুরো শীত জুড়েই এই অংশে শুকনো থাকে সুরমা।

আর যত্রতত্র বর্জ্যের কারণে দু’পাড়ে চর জেগে উঠায় এখানে হাঁটু জলের খালে পরিণত হয়েছে একাধিক অংশ। সে সব অংশের অবস্থা এমন, নৌকা চলাই যেন দুঃসাধ্য। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই দূষণের প্রধান কারণ বর্জ্য। কোন রকম শোধন না করেই যা নদীতে ফেলা হচ্ছে । এ অবস্থার উন্নতি না হলে সুরমাও দেশের সবচেয়ে দূষিত নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা কিংবা কর্ণফুলীর ভাগ্য ধারণ করবে। আর এমনটি হতে থাকলে অচিরেই সিলেটের ইতিহাসের সাক্ষী এই নদীটির অপমৃত্যু ঘটবে বলেও ধারণা বিশেজ্ঞদের।

সুরমা দেশের অন্যতম প্রধান নদী। উত্তর-দক্ষিণ দু ভাগে সিলেট নগরকে বিভক্ত করে মহাকাল ধরে বয়ে চলেছে সুরমা। ভারতের বরাক নদী আসাম থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় জকিগঞ্জের আমলসীদ নামক স্থানে দুটি ভাগে বিভাজিত হয়েছে। এর একটি সুরমা আর অপরটি কুশিয়ারা। একসময় এই সুরমা ছিলো দেশের উত্তর-পূর্ব জনপদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। বড় বড় জলযানও তখন দিব্যি ঘুরে বেড়াতো সুরমার বুকে। বৃটিশ আর পাকিস্তান পরবর্তী বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় অবহেলায় পতিত হয় সুরমাও। কয়েক দশক আগেও যে নদীতে বড় বড় জলযান প্রবেশ করত, এখন শুষ্ক মৌসুমে ইঞ্জিন চালিত নৌকা যাতায়াত করতেই বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে নাব্যতা হারিয়ে মরতে বসেছে নদীটি। বর্জ্য ফেলার দূষণ শুষ্ক মৌসুমে যেমন দৃশমান থাকে তেমনি তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাতেও সুরমা ফুলে নগরে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। পাশাপাশি দূষণে ব্যাহত হচ্ছে পানির ব্যবহারও।

সুরমার এমন দূষণ চিত্র দেখে দুঃশ্চিন্তায় ভুগছেন পরিবেশবাদীরা। সুরমা নদীর পানির উপর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে এর গুণগত মান বর্ষাকালের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে বেশ খারাপ।

তবে বর্ষাকালে বৃষ্টি জনিত কারণে অধিক জল নদীর পানিতে মিশে সংশ্লিষ্ট ধ্রুবক সমূহের মাত্রা অনেক কমে যায়। গবেষণায় চারটি স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। স্থানগুলো হলো- নগরের মাসিমপুর (উজানে), কালিঘাট, তোপখানা এবং কানিশাইল (ভাটিতে)।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বর্ষাকালে সুরমা নদীর পানিতে বিওডির পরিমাণ পর্যাপ্ত থাকলেও শীতকালে কিছু কিছু জায়গায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমে যায়।

পানি দূষণের অন্যতম ধ্রুবক বিওডি-পর্যবেক্ষণের ফলাফলে দেখা গেছে শীতকালে সুরমা নদীতে দূষণের মাত্রাটা বেশি। বিওডি-এর মানও গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। কলিফর্ম বিশ্লেষণের দিক থেকে দেখা যায়, সুরমা নদীর পানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ফেসাল কলিফর্ম আছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সুরমা নদী সিলেট নগর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছ সুনামগঞ্জ দিয়ে। সেখানেও সুরমা ভালো নেই। শিল্প উপজেলা ছাতক থেকে-সুনামগঞ্জ পর্যন্ত সুরমার অবস্থা আরো ভয়াবহ। ছাতকে পেপার পাল্প ও সিমেন্ট কারখানার বর্জ্যও ফেলা হয় সুরমার বুকেই। সুরমা নদীর ছাতক অংশের পানির উপর অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায় যে শীতকালে পানিতে বিওডি’র মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। যা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে ধাতু সমূহের মধ্যে এফই এবং এমএন-এর মাত্রা তুলনামূলক ভাবে বেশি দেখা গিয়েছে ছাতক অংশের পানিতে। যা মাছের বংশ বিস্তারে মারাত্মক হুমকি।

সুরমাকে নদী ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। নদীতে বর্জ্য কোনভাবেই যাতে না ফেলা হয় তা নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানান তারা। এছাড়া পানির গুণগত মান ও এর ধারা স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখনই দরকার বলে মত দিয়েছেন অনেকে।

সুরমা বাঁচাতে যে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি:
নদী বিশেষজ্ঞরা সুরমার দূষণের নানা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। বিশ্লেষণে পথ দেখিয়েছেন সুরমা বাঁচানোরও।
তারা মনে করেন, আকস্মিক বন্যা এবং এর ভয়াবহতা প্রশমন তথা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার প্রয়োজনে নিয়মিত নদী খনন কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অবৈধ ভাবে নদীর দু’পাশের জায়গা দখল শক্তভাবে প্রতিহত করতে হবে। ভূ-উপরস্থ পানির দূষণের জন্য মানুষই সবচেয়ে দায়ী, আর তাই জনসচেতনতার মাধ্যমে দূষণরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেবল পানির জন্য নয়, সামগ্রিক ‘ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স’-এর প্রয়োজনে নদীকে দূষণমুক্ত রাখার ব্যাপারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে নদীর গুণগতমান পরীক্ষা করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন নৌযান থেকে পানিকে দূষিত করে এমন পদার্থ এবং তেল নিঃসৃত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। মিউনিসিপ্যালিটি/সিটি কর্পোরেশন বা অন্যান্য এলাকার বর্জ্য নিক্ষেপন স্থান সমূহকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যেন বৃষ্টির দিনে এ থেকে পানি দূষণ রোধ করা যায়। সকল নালা সমূহকে প্রয়োজনে ছাঁকন পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে যা কিনা নদীর পানি দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নদীর তীরে গড়ে ওঠা সকল ধরণের ছোট-বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ডায়গনস্টিক সেন্টার প্রভৃতিতে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিবেশ ও পানি দূষণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইন সমূহের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দূষিত পদার্থ উৎপাদন ও নদীর পানিতে নিক্ষেপনের জন্য সময়োপযোগী এবং কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। ভূ-উপরস্থ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমূহের কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার কৌশল উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন।

সুরমার দূষণের ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, নানা অব্যবস্থাপনায় সুরমা দূষিত হচ্ছে। বিষয়টি তাদের নজরে আছে।

মেয়র বলেন, অনেকেই সুরমায় বর্জ্য ফেলছেন। দূষণের প্রধান একটি কারণ এটি। আমরা নগরীকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এসেছি। নগরীর তিনটি স্থানে (টিলাগড়,শাহী ঈদগাহ, রিকাবী বাজার) অত্যাধুনিক ডাস্ট সাব স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এর পরও নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন আরিফ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!