বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
ডিম বালককে বিয়ের প্রস্তাব শ’ শ’ অস্ট্রেলীয় তরুণীর  » «   সিলেটে মেশিনে আদায় হবে যানবাহনের মামলার জরিমানা  » «   রাজনগরে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু দু’মাস পর পেল নতুন মায়ের কোল  » «   বিয়ানীবাজারে এবার পরাজিত খছরু’র বাসায় বিজয়ী ভাইস চেয়ারম্যান জামাল!  » «   নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুরের কৃতজ্ঞতা  » «   নিউজিল্যান্ডে শুক্রবারের জুম্মার আযান ও নামাজ সম্প্রচার করা হবে : জেসিন্ডা  » «   মরমী গানের মাধ্যমে আরকুম শাহ মানুষকে সত্যের পথে ডেকেছেন : ইকবাল সোবহান  » «   নিজেই নির্বাচনী পোস্টার সরিয়ে নিলেন ভাইস চেয়ারম্যান প্রেমসাগর  » «   কারাগারে আসামীর মৃত্যুর খবরে নবীগঞ্জে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত-১০  » «   আবরারের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের  » «  

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট

মাও. ডা. শাহ মো. ছাফিউর রহমান:
ভোট হল, মত প্রকাশ করা, পছন্দ বা অপছন্দ প্রকাশ করা, ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে মত প্রদান করা।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট ও জনমতের গুরুত্ব:
ইসলামে সৎ পাত্রে ভোট প্রদানে কোন সমস্যা নেই। খোলাফায়ে রাশেদা’র সবাই নির্বাচিত হয়ছিলেন।

ইসলামে জনমতের গুরুত্ব প্রচুর। আল্লাহ বলেন, “কাজের ব্যাপারে এদের সাথে পরামর্শ কর। তারপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) সংকল্প একবার যখন তুমি করে নেবে তখন (তার সফলতার জন্য) আল্লাহর উপর ভরসা কর।” (৩/সূরা আলে ইমরান:১৫৯)

ভালো লোক প্রার্থী না হলে ভোটের বিধান:
কোনো নির্বাচনী এলাকায় ভালো, সৎ ও দ্বীনদার লোককে প্রার্থী করা হলে তাকে ভোট না দিয়ে বিরত থাকা শরীয়াতের দৃষ্টিতে অন্যায় এবং পুরো জাতির উপর জুলুম করার শামিল (কবীরা গুনাহ)। কিন্তু কোনো নির্বাচনী এলাকায় যদি নিতান্ত সৎ, যোগ্য ও দ্বীনদার লোক প্রার্থী না হয় তারপরও সেখানে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। বরং তুলনামূলকভাবে যিনি ভালো তাকেই ভোট দেওয়া প্রয়োজন। কেননা অন্যায় ও অপরাধ যার মাধ্যমে বেশি হবে তার তুলনায় যার মাধ্যমে অন্তত কম হবে তাকে গ্রহণ করা না হলে বেশির জন্য অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে যা শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী। যেমন- কোনো নাপাক পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব না হলেও অন্তত কিছুটা কমানোর চেষ্টা শরীয়াতসম্মত ও যুক্তিসম্মত।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করো।” (৬৫/সূরা আত তালাক:২) আল্লাহ আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের সাথে আল্লাহর জন্য সাক্ষী হয়ে দাঁড়াও।” (৪/সূরা আন নিসা:১৩৫)
আল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা কখনই সাক্ষ্য গোপন করবে না, যে সাক্ষ্য গোপন করে তার মন পাপের কালিমাযুক্ত।” (২/সূরা আল বাকারাহ:২৮৩)

নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পরিণতি:
এ যুগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে বিশৃঙ্খলা তার দিকে তাকিয়ে অনেক দ্বীনদার ব্যক্তিও না বুঝে ভোট দেওয়াকে অহেতুক বিষয় মনে করে এ থেকে বিরত থাকেন। এতে আখিরাতমুখী লোকেরা প্রার্থী হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং দুনিয়ামুখী ব্যক্তিরা গোজামিলের ভোটাভুটিতে বিজয়ী হয়।
ভোট না দেওয়া বা সামান্য লোভ ও অর্থের বিনিময়ে (ইসলামী মানদণ্ডে) অযোগ্য ব্যাক্তিকে ভোট দেওয়ার ফলে মানবতা বিসর্জিত হয়।
মাথার উপর নাপাক জিনিস রেখে যতো পরিষ্কার ও পবিত্র পানি দিয়ে অযু-গোসল করা হোক না কেন এতে শরীর পাক হবে না। অনুরূপভাবে, যারা হবে জাতির কর্ণধার, যাদের হাতে থাকলে হালাল-হারামের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, যারা আইন রচনা করবে ও বিভিন্ন বিল পাশ করাবে তারা যদি আল্লাহবিমুখ হয় তাহলে জাতির উন্নতি কখনো হতে পারে না।

ভোট একটি আমানত:
আল্লাহ বলেন, “(হে ঈমান ব্যক্তিরা) আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তাদের (যথার্থ) মালিকের কাছে সোপর্দ করে দেবে।” (৪/সূরা আন নিসা:৫৮)
অপাত্রে বা অযোগ্য লোককে ভোট দেওয়া আমানাতের সুস্পষ্ট খিয়ানাত ও বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহ বলেছেন, “হে ঈমানদার বান্দারা, তোমরা আল্লাহ তাআলা ও (তাঁর) রাসূলের সাথে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানাতেরও খিয়ানাত করো না।” (৮/সূরা আল আনফাল:২৭) ইসলামের উপকার বা নির্দেশনাকেই মূল বিবেচনায় না রেখে শুধুমাত্র লোভ-লালসা কিংবা কোনো বিশেষ দলের বশ্যতাবশত যদি ভোট দেওয়া হয় তাহলে তা নিজেকে গুনাহের দ্বারা ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছু নয়।

ভোট দেওয়া মানে সাক্ষ্য দেওয়া আর অপাত্রে ভোট দেওয়া (বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া) কবীরা গুনাহ:
যাকে ভোট দেয়া হয় তাকে চরিত্রবান, যোগ্য, ঈমানদার ইত্যাদি হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ সকল গুণে গুণী না হলে এ ভোট মিথ্যা সাক্ষ্যে পরিণত হয়। হাদীসে আছে, “মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া সবচেয়ে বড় গুনাহ।” (সহীহ আল বুখারী) রাসূল (সা.) আরও বলেন, (কবীরা গুনাহ হলো) আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া বা তাদের অবাধ্য হওয়া, হত্যা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (সহীহ আল বুখারী) সুতরাং নির্বাচনী এলাকায় যে কয়জন প্রার্থী আছে তাদের মধ্যে যিনি দ্বীনদার, যোগ্য, সৎ ও আমানাতদার তাকে ভোট না দিয়ে অন্য কাউকে ভোট দেওয়া নিজেকে গুনাহের মধ্যে লিপ্ত করার শামিল।

সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও অসৎ লোককে ভোট দেয়া বিশ্বাসঘাতকতা:
রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও কোন অসৎ আত্মীয়কে (ভোট বা অন্য প্রক্রিয়ায়) কর্মচারী নিযুক্ত করে, সে আল্লাহ, রাসূল (সা.)ও মুমিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।” (হাকিম)

ভোট দেয়ার অর্থ সুপারিশ করা, ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তির পাপ-পুণ্যের অংশীদার হওয়া ও নিজেদের কর্মফল টেনে আনা:
ভোট দেওয়ার অর্থ হলো সুপারিশ করা। অর্থাৎ ভোটার তার ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচিত করার ব্যাপারে সুপারিশ করে থাকে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “যে ভাল কাজের সুপারিশ করবে সে নিজেও এতে অংশীদার হবে। আর যে খারাপ তথা অন্যায় কাজে সুপারিশ করবে তাতেও সে অন্যায়ের অংশীদার।” (৪/সূরা আন নিসা:৮৫) আল্লাহ আরও বলেন, “যমীনে ও পানিতে যে বিশৃংখলা ও আশান্তির সৃষ্টি হয় তা মানুষের দু’হাতের অর্জন বা কৃতকর্মের ফল।” (৩০/সূরা আর রুম:৪১)

অসৎ লোককে ভোট দেয়া জুলুম:
কুরআনে বলা হয়েছে, “যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সাক্ষ্য (সৎ লোক) বর্তমান রয়েছে তা যদি সে গোপন করে (অসৎ লোককে ভোট দেয়) তবে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে? জেনে রেখ, তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ মোটেই বেখবর নন।” (২/সূরা আল বাকারাহ:১৪০)

ভোট দেয়ার ব্যাপারেও জবাবদিহি রয়েছে:
হাদীসে আছে, “সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
কোনো সংসদ বা পরিষদের সদস্যকে প্রতিনিধি বানানোর সময় শুধু ভোটারের সাথে সম্পর্ক সীমিত থাকে না। বরং পুরো জাতির সাথে তার সম্পর্ক হয়ে যায়। সুতরাং কোনো অসৎ বা ইসলামবিরোধী লোককে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে সে পুরো জাতির অধিকার খর্ব করলো এবং ঐ গুনাহের বোঝা তাকেও বইতে হবে। আল্লাহ বলেন, বস্তুত যে লোক বিন্দু পরিমাণও ভালো কাজ করবে, সে তা পরকালে দেখতে পাবে। (৯৯/সূরা যিলযাল:৭-৮)

কেমন নেতাকে ভোট দিতে হবে বা তার আনুগত্য করতে হবে:
ঈমানের পথে থাকতে হবে- কেউ এ পথে না থাকলেও। ইসলামী ব্যক্তিত্বকে ভোট দিলে তা কখনো বৃথা হয় না বরং তাতে সওয়াব অর্জন করা যায়। আল্লাহ বলেন, “তোমরা সীমালংঘনকারী অপরাধী পাপিষ্ঠদের (নেতৃত্বের) আনুগত্য করো না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সংস্কার সংশোধন করে না।” (২৬/সূরা আশ শুয়ারা: ১৫১-১৫২) আল্লাহ আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের আর সেই সব লোকের , তোমাদের মধ্যে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত (আমীর) হয়েছে।” (৪/সূরা আন নিসা:৫৯)

ভোট কেনা-বেচা:
টাকা বা সম্পদ দিয়ে ভোট আদায় কিংবা টাকা বা সম্পদের পাওয়ার কারণে ভোট দেয়া ঘুষ দেয়া ও নেয়ার মতই হারাম। এটা ইসলাম, দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার সমতুল্য। অন্যের বিলাসিতা ও খ্যাতির জন্য নিজের ঈমানকে বিসর্জন দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়- তাতে যতই স্বার্থ (বা সম্পদ) লাভ হহোক না কেন। মহানবী(সা.) বলেন, “ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ধ্বংসের মধ্যে আছে যে অন্যের দুনিয়া সাজানোর জন্য নিজের দ্বীনকে নষ্ট করে দেয়।”

আমাদের করণীয়:
(হে নবী) আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কারণ উপদেশ মুমিনের জন্য ফলপ্রসূ হবে ও কল্যাণ বয়ে আনবে। (৫১/সূরা আয যারিয়াত:৫৫)

মানুষকে বুঝাতে হবে যে, ইসলামী আদর্শের বহির্ভূত অন্য কোন আদর্শ বা মতবাদে বিশ্বাসী যেমন- সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এ ধরণের মতবাদের পক্ষের প্রার্থীদেরকে ভোট দেওয়া মানে ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া যা কবীরা গুনাহ।
মানুষকে বুঝাতে হবে যে, মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহ বলেন, “আমি যমীনে আমার প্রতিনিধি পাঠাবো।” (২/সূরা আল বাকারাহ:৩০) আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব বলতে বুঝায় আল্লাহর সামগ্রিক আদেশ, নিষেধ, নীতিমালা তাঁর যমীনে বাস্তবায়ন করা। এর জন্য ন্যায়ানুগ যত পথ-পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার তার সবই আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে।.. জান-মালের কুরবানী, সংগ্রাম-আন্দোলন, কলমের যুদ্ধ, ভোট প্রদান সবই এক একটি জরুরী অনুষঙ্গ।.. ইসলাম বিজয়ের দ্বীন। বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয় কেতন উড়ানোই মুসলমানদের সর্বশেষ (ইহকালীন) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।.. বর্তমান সময়ে এ লক্ষ্যে পৌঁছতে খুবই গুরুত্বের সাথে ভোট প্রদানকে সামনে রাখতে হবে ও এ লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।

লেখক:
প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কালচারাল এসোসিয়েশন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!