সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধুর নজর ছিল ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিদের প্রতি

লন্ডন অফিস:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ব্রিটেনে আসেন ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। মূলত তিনি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য জহিরউদ্দিন বিশ্বশান্তি পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে যান। ফেরার পথে তিনি লন্ডনে আসেন। অল্প দিনের সফর হলেও শেখ মুজিব প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংস্পর্শে এসেই বুঝতে পারেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনার জন্য ব্রিটেনই হবে সবচেয়ে ভালো জায়গা। বঙ্গবন্ধু তার বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশি ও তৎকালীন পড়তে আসা ছাত্রদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। তাই ১৯৫৬ সালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাপ গঠন করলেও শেখ মুজিবুর রহমান ও জহির উদ্দিনের সেই সফরের ত্বরিত কিছু জনসংযোগ আওয়ামী লীগের প্রতি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বিশ্বাস ও সমর্থন অটুট থাকে।

বঙ্গবন্ধু ব্রিটেনে দ্বিতীয়বারের মতো সফরে আসেন ১৯৫৮ সালের জুন মাসের শেষের দিকে। মূলত এপ্রিল মাসে মার্কিন লিডারশিপ প্রোগ্রামে যোগ দিতে গিয়ে দুই মাস আমেরিকায় অবস্থান করেন তিনি। এ সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ভ্রমণ করেন তিনি। তখনো আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশি থাকলেও রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুর নজর বরাবরের মতোই ছিল ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিদের প্রতি। জুন মাসের সেই সফরও ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। সে সময় তিনি বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন।

মওলানা ভাসানী ১৯৫৪ সালের ২৮ মে থেকে ব্রিটেনে প্রায় নয় মাস অবস্থান করেও বাঙালিদের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি, শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র দুবারের সংক্ষিপ্ত সফরে তার চেয়ে বেশি আস্থা অর্জন করেন এবং বাঙালিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্নের বীজ রোপণ করেছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে গেরিলা যুদ্ধ করতে আগরতলাকে ব্যবহার এবং ভারত ও ব্রিটেনের সাহায্য নিয়ে বিশ্ব জনমত গঠনের জন্য বিলেতের বাঙালিদের রাজনীতিতে টেনে আনার চেষ্টা করেন।

মূলত বঙ্গবন্ধু ৫০ দশকের মাঝামাঝি থেকেই ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশি ও ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ দেখতে পান, যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময়। বঙ্গবন্ধুর সেই ধারণা ভুল হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত ও বাঁকে জড়িয়ে আছে প্রবাসীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আর তাই বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৭৫ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ১৯ বছরে সাতবার ছুটে আসেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে।

বঙ্গবন্ধু ছানু মিয়াকে জড়িয়ে বললেন, শেখ মুজিব আর বাঁচতে চায় না!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৃতীয়বারের মতো ব্রিটেন আসেন ১৯৬৩ সালের আগস্ট মাসে। ৮ আগস্ট ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে তখনকার প্রবাসী কমিউনিটি নেতা আবদুল মান্নান ছানু মিয়ার ২৯ সেন্ট মেরিজ অ্যাবোট টেরাসের আথিতেয়তা গ্রহণ করেন।

এই সফরটি মূলত ছিল লন্ডন সফররত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলাপ- আলোচনার জন্য ছিল। ১৯৬৩ সালের ১১ মার্চ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জুরিখে চিকিৎসার জন্য এলে আগস্ট মাসে এক সংক্ষিপ্ত সফরে ব্রিটেনে আসেন তিনি। এই সফর সম্পর্কে লেখক, রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘এমনি করে একদিন মান্নান সাহেবের গ্রিন মাস্ক রেস্তোরাঁর বেইসমেন্টে খাওয়া-দাওয়া করতে করতে ওস্তাদ সোহরাওয়ার্দী ও সাগরেদ শেখ সাহেবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। মান্নান সাহেব কাছে বসে খানা পরিবেশন করছেন। এক সময় শেখ সাহেব বেশ জোরেই বলে উঠলেন, ‘স্যার আপনি বা মওলানা সাহেব (মওলানা ভাসানী) যেই হোন না কেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী, আপনারা কোনো অবস্থায়ই ইস্ট পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। কারণ, ওয়েস্ট পাকিস্তান ইস্ট পাকিস্তানকে গিলতে বসেছে। ইস্ট পাকিস্তানকে একদিন না একদিন আলাদা হতেই হবে।’ অমনি গর্জে উঠলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। ‘ডোন্ট টক ননসেন্স’ অর্থাৎ বাজে কথা বলো না। আর অগ্নিশর্মা চোখে চেয়ে রইলেন শেখ সাহেবের দিকে। শেখ সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবও চুপ হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, কী আছে তোমাদের যে আলাদা হয়ে যাবে? পারবে ওদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আলাদা হতে? ১৯৫৪ সালে ৯৭ ভাগ ভোট পেয়েও তো দুমাসের বেশি মন্ত্রিসভা টিকিয়ে রাখতে পারলে না। এখন একবারে আলাদা হয়ে যাবে! আর না হয় আলাদা হয়েই গেলে, তখন তোমার দেশের আর্থিক অবস্থার কী হবে? কোরিয়ান বুমতো আর নেই যে, পাটের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় চালিয়ে দেবে দেশের অর্থনীতি। চলবে কী করে তোমাদের?

এবার শেখ সাহেব আস্তে আস্তে মাথা তুলে বললেন, স্যার, এখনো ৯৭-৯৮ ভাগ বাঙালি আমাদের ডাকে সাড়া দেবে। তবে সে ডাক হবে স্বাধিকারের ডাক। আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারলে অস্ত্রের প্রয়োজন হবে না। বাঁশের লাঠিই যথেষ্ট। তারপর মান্নান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আর এই হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি যাদের আপনি পাসপোর্ট দিয়ে পাঠিয়েছেন, তারা জোগাবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা—তারাই গড়ে তুলবে বিশ্ব জনমত বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে।’

এ কথা বলার নয় বছর পর যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ব্রিটেনব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাপক আন্দোলন লবিং শুরু করে বিশ্ব জনমত আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আর স্বাধীন বাংলাদেশ, যাকে বলা হয়েছিল তলাবিহীন ঝুড়ি। সেই বাংলাদেশের প্রথম রিজার্ভের সাড়ে চার কোটি টাকার মধ্যে চার কোটি টাকারই জোগান দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা!

১৯৬৩ সালের ২০ দিনের সেই সফরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন তৎকালীন প্রবাসী নেতা জাকারিয়া খান চৌধুরীর অনুরোধে ইস্ট পাকিস্তান হাউসে যান এবং সেই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ইস্ট পাকিস্তান হাউস এক সময়  দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রামে অংশীদার হবে এবং তিনি এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন বলে আশ্বাস দেন। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে যাওয়ার সময় তিনি আবদুল মান্নান ছানু মিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে যান, মান্নান সাহেব, শেখ মুজিব আর বাঁচতে চায় না। দেশের মানুষের স্বাধিকার আদায় না করে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। এর চেয়ে জালেমদের সঙ্গে লড়াই করে মরে যাওয়াই শ্রেয়!

ব্রিটেনে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে আপনজন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কৃতিসন্তান এই আবদুল মান্নান ছানু মিয়াকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী এমপি হিসেবে জাতীয় সংসদে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু!

ব্রিটেনে অস্থায়ী সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চতুর্থবারের মতো ব্রিটেনে আসেন ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এর আগে ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের একটি হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এর ফলে ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য গুণগত পরিবর্তন আসে। তখন আইয়ুব খানের কেন্দ্রীয় শাসন দেশের দুই অংশের মাঝে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে দেশ-বিদেশে বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ আরও তীব্রতর হয়।

পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছুটে আসেন লন্ডনে। বলা যায় এটাই তার প্রথম সাংগঠনিক সফর। যদিও তখনো ব্রিটেনে আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় কার্যক্রম ছিল না। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই সফরের গুরুত্ব অনেক। আগরতলাকে ব্যবহার করে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনাকে পাকাপোক্ত করতেই বঙ্গবন্ধুর সেই সফর ছিল।

এই সফরেও তিনি আবদুল মান্নান ছানু মিয়ার আথিতেয়তা গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের এই সফরে বঙ্গবন্ধু ব্রিটেনের তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দেখা করেন। এক পর্যায়ে তিনি লন্ডনে তার পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মী লন্ডন প্রবাসী তাসাদ্দুক আহমদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ২১ রমিলি স্ট্রিট, লন্ডন ডব্লিউওয়ান-এর তৎকালীন বাঙালি নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের অফিসে সেই একান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর সেই সফর কতদিনের ছিল সে সম্পর্কে তেমন ধারণা পাওয়া না গেলেও দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হওয়ায় সফর অর্ধ সমাপ্ত রেখে সংক্ষিপ্ত রেখে চলে যান দেশে।

তবে তাসাদ্দুক আহমেদ ও শেখ মুজিবুর রহমানের সেই গোপন বৈঠক সম্পর্কে লেখক-সাংবাদিক আবদুল মতিন বলেন, শেখ সাহেব চলে যাওয়ার পর আমি তাসাদ্দুককে জিজ্ঞাসা করলাম, কী বললেন তিনি? তাসাদ্দুক বলল, ১৯৬০ সালে তিনি (বঙ্গবন্ধু) আমাকে (আবদুল মতিন) আগরতলা থেকে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার সম্ভাবনা সম্বন্ধে যে ইঙ্গিত দেন, তারই পুনরাবৃত্তি করেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শত্রুপক্ষ টের পেলে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বিপদগ্রস্ত হবেন, আশঙ্কা করে আমি ও তাসাদ্দুক এ সম্পর্কে কারও সঙ্গে আলোচনা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর শেখ মুজিব নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হওয়ার পর ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে গৃহবন্দী হিসেবে দিন কাটাচ্ছিলেন। তখন একদিন সাংবাদিক আবদুল মতিনের সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আইয়ুব বিরোধী সংগ্রামে প্রয়োজনে তিনি আগরতলাকে ব্যবহারের কথা। ঠিক একই কথা তিনি লন্ডনে তাসাদ্দুক আহমদকেও বলেন। উল্লেখিত ইঙ্গিত ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আর কী কী আলাপ হয়েছিল নিরাপত্তাজনিত কারণে তাসাদ্দুক আহমদ প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হয়, আগরতলাকে গেরিলা যুদ্ধের জন্য ব্যবহারের পাশাপাশি লন্ডনকেও কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ-আলোচনা হয়ে থাকবে। ব্রিটেনে অস্থায়ী সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রতিহত করতে প্রবাসীদের শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ড

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সফরটি সংক্ষিপ্ত করে বঙ্গবন্ধু দেশে চলে যান। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর ব্রিটেনে আসা হয়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তবে ততদিনে তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলা মুক্তির মঞ্চের প্রধান চরিত্র। ব্রিটেনের ৫০ বা ৬০-এর দশকে আসা প্রবাসী বাঙালিরাও যে সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা করতেন দেশ স্বাধীনের জন্য বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সেই চিন্তার নিয়ামক শক্তি। আর তাই তো যখন ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি অখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয় তখন প্রবাসের ছাত্র, খেটে খাওয়া মানুষ, সবাই ফুঁসে ওঠেন। ততদিনে ইস্ট পাকিস্তান হাউস সব আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে যেসব বাঙালি ছাত্র ইস্ট পাকিস্তান হাউস প্রতিষ্ঠায় ছিল, তাদের অনেকেই লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফেরত গিয়ে দেশ স্বাধীনের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন। অনেকেই জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে ১৯৬৮ সালের ৬ এপ্রিল পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন লন্ডনের হাইড পার্কের পার্ক স্পিকার্স কর্নারে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ-মিছিল আহ্বান করেন। সভাটি মূলত ছাত্রদের ডাকে হলেও এতে পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, পাকিস্তান ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন ইত্যাদি সংগঠনের উদ্যোগে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে সাত-আট হাজার বাঙালি ছাত্র-জনতা যোগ দেন সভায়। সভা শেষে একটি মিছিল নিয়ে স্মারকলিপি প্রদানের জন্য লাউন্ডস স্কয়ারে পাকিস্তান হাইকমিশনে যায় সবাই। স্মারকলিপি প্রদানের এক পর্যায়ে জাকারিয়া খান চৌধুরী, বর্তমান যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ, বিবিসি উর্দু বিভাগের উপস্থাপক শিবগাতুল্লাহ কাদরী প্রমুখ পাকিস্তান হাইকমিশনের সামরিক শাখা দখল করে নেন। তারা হাইকমিশনের তৃতীয় তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আইয়ুব খানের ছবিতে অগ্নি সংযোগ করেন। উপস্থিত হাজারো মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়ে তার মুক্তি দাবি করেন। পরে পুলিশ এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। ঘটনাটি ব্রিটিশ মূলধারায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিবিসি রাত ১০টার প্রধান সংবাদে গুরুত্ব সহকারে প্রতিবেদন প্রচার করে। পরদিন ৭ এপ্রিল আইয়ুব খানের ছবিতে অগ্নিসংযোগের ছবি প্রথম পাতায় বড় করে প্রকাশ করে লন্ডন টাইমস পত্রিকা। পাকিস্তান সরকারবিরোধী তখন পর্যন্ত এটাই ছিল ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালির সবচেয়ে বড় মিছিল ও সমাবেশ। এই সমাবেশের কারণে বড় যে কাজটি হয় সেটি হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান তখন প্রবাসী বাঙালির ঘরে ঘরে এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।

১৯৬৮ সালের ২৭ মে ব্রিটেন থেকে সদ্য পাস করা পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত তরুণ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও বিখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা আলমগীর কবীর প্রবাসী নেতা মিনহাজ উদ্দিনের কাছে চিঠি লিখেন। উল্লেখ্য, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও আলমগীর কবীর এ দুজনই ইস্ট পাকিস্তান হাউস প্রতিষ্ঠার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ১৯৬৩/৬৪ সালে। মিনহাজ উদ্দিনের কাছে পাঠানো চিঠিতে তারা দুজনেই শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য লন্ডনের কয়েকজন খ্যাতনামা আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করার অনুরোধ জানান। ২৮ মে জাকারিয়া খান চৌধুরী ও মিনহাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে ইস্ট পাকিস্তান হাউস সংস্লিষ্ট ছাত্র-জনতা অত্যন্ত গোপনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় বিখ্যাত আইনজীবী প্রতিষ্ঠান বার্নার্ড সেরিডানের মাধ্যমে টমাস উইলিয়াম (পরবর্তীকালে স্যার টমাস) কিউ সি এমপিকে মামলা পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ৫ জুন নিয়োগ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার শেষ হয়। এ সময় সর্বস্তরের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ৪ নং হ্যাসল স্ট্রিট লন্ডন ই-ওয়ান ঠিকানায় অবস্থিত হাফিজ মজির উদ্দিনের মুসলিম হালাল বুচার শপে। দ্বিতীয় সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১০ জুন আবদুল মান্নান ছানু মিয়ার লন্ডনের অভিজাত এলাকা আর্লস কোর্ট ২৭৫ ওল্ড ব্রম্পটন রোডে অবস্থিত গ্রিন মাস্ক রেস্তোরাঁর বেইসমেন্টে।

এরেঞ্জ ঢাকা, ২৫ জুলাই, ৭.৩০ এএম, ফ্লাইট পিআইএ-৭০৪!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রবাসী ছাত্র-জনতাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ড তৈরি করে তাদের কার্যক্রম শুধু আইনি সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তারা অনেকবার পাকিস্তান হাইকমিশন অবরোধ ও দখল করে কালোপতাকা উত্তোলন করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া, হাইড পার্কের স্পিকার্স কর্নারে সভা করে আইয়ুব খানের মুণ্ডুপাত করা ইত্যাদি করে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাকিস্তান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে চাপের মুখে রাখেন। ১৯৬৮ সালের ৭ জুলাই এ টি এম ওয়ালী আশরাফ, আনিস আহমদ, সুলতান মাহমুদ শরীফরা মিলে ১৮ জন ছাত্র পাকিস্তান হাইকমিশন অবরোধ করে পূর্ববাংলার স্বাধিকার আদায়ের ঘোষণা দেন। একই দিন সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক পাকিস্তান হাইকমিশনের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় অবরোধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার কারণে।

৮ জুলাই আবারও ঢাকা থেকে টেলিগ্রাম আসে যে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ১৬ জুলাই থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ১৪ জুলাই বিশাল এক সমাবেশের আহ্বান করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশন ঘেরাওয়ের জন্য। ১২ জুলাই বিবিসি জানায়, ১৪ জুলাইয়ের পুরো কর্মসূচি তারা কাভার করবে। ১৪ জুলাই বিশাল এক মিছিল নিয়ে ঘেরাও করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশন। আইয়ুব খানের কুশপুত্তলিকা দাহ, আইয়ুব খানের রচিত সংবিধান, তার আত্মজীবনী ফ্রেন্ড নট মাস্টার ইত্যাদি পোড়ানো হয়। এই সমাবেশে কিছু ভাড়া করা পাকিস্তানি চেষ্টা করে হামলা চালানোর। এতে আহত হন জাকারিয়া খান চৌধুরী। সে দিনের বিক্ষোভ-মিছিল, সভা সবকিছুই ব্রিটিশ মিডিয়া খুব ফলাও করে প্রচার করে। সে সময় বাঙালিরা জানতে পারেন, ২১ জুলাই অবকাশ যাপনের জন্য ব্রিটেনে আসছেন আইয়ুব খান। ফলে ২২ জুলাই মশাল মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে দিনের ঘটনা সম্পর্কে মিনহাজ উদ্দিন বলেন, মশাল মিছিলে আইয়ুব খানের অত্যাচার, শোষণের খতিয়ান নিয়ে আবদুল বাসিতের ১০ পৃষ্ঠার ‘ব্ল্যাক বুক’ পুস্তিকা ২২ জুলাইয়ের মিছিলে বিলি করা হয়। একই দিন আমরা টমাস উইলিয়ামের ঢাকায় যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার নাম প্রকাশ না করে ঢাকায় টেলিগ্রাম পাঠালাম : অ্যারেঞ্জ ঢাকা, ২৫ জুলাই, ৭.৩০ এএম, ফ্লাইট পিআইএ-৭০৪! এদিকে আইয়ুব খান লন্ডনে এসে কোথায় উঠেছেন সেটা প্রথমে জানা না গেলেও ২৩ জুলাই জানা যায়, তিনি উঠেছেন ক্লারিজ হোটেলে। সেদিনের সেই ঘটনা আজো জ্বল জ্বল করছে সুলতান মাহমুদ শরীফের স্মৃতিতে। তিনিসহ মিনহাজ উদ্দিন, জাকারিয়া খান চৌধুরী, আবদুল আজিজ বাগমার, সুবিদ আলী টিপু প্রমুখের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন সংগ্রামী ছাত্র-জনতা ক্লারিজ হোটেল অবরোধ করেন। আইয়ুব খানের পদত্যাগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। কয়েক ঘণ্টা অবরোধ থেকে শেষ পর্যন্ত হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে ক্রয়ডনের সেলসডন হোটেলে আশ্রয় নেন আইয়ুব খান।

২৭ জুলাই সেই খবর ছাত্র-জনতা জেনে দলে দলে বিশাল মশাল মিছিল নিয়ে সেই হোটেলও ঘেরাও করে তারা। সেই ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্বেও ছিলেন মিনহাজ উদ্দিন, জাকারিয়া খান চৌধুরী, সুবিদ আলী টিপু প্রমুখ। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ডের কার্যক্রম খুব গোপনে পরিচালিত হতে থাকে। পরিকল্পনা যাতে ফাঁস না হয় এবং সংস্লিষ্টরা যাতে বিপদে না পড়েন, তাই সব যোগাযোগ খুব গোপনে করা হতো। সব প্রস্তুতি সম্পন্নের পর টম উইলিয়ামসের মামলা পরিচালনার খবর লন্ডন টাইমসে প্রকাশ করা হয়। এ সময় পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য এগিয়ে আসেন ব্রিটেন থেকে পড়া শেষ করে ফেরত যাওয়া ব্যারিস্টার কে জেড আলম, ব্যারিস্টার শাখাওয়াত হোসেন, ব্যারিস্টার আবুল খায়ের খান ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

প্রবাসীদের টাকায় শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার

১৯৬৯ সালের ৭ নভেম্বর ব্রিটেন থেকে দেশে ফিরে গেলেও ১২ দিনের সেই সফরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাগল করে যান প্রবাসী ছাত্র-জনতাকে। ছয়দফা নয়, দাবি হবে একদফা প্রবাসী বাঙালিদের এমন দাবির প্রতি বঙ্গবন্ধুর সমর্থনেই প্রবাসী ছাত্র-জনতা প্রস্তুতি নিতে থাকে স্বাধীনতা প্রক্রিয়ার জন্য।

১৯৭০ সালে গঠিত হয় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের বড় ঘূর্ণিঝড়ের পর প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিভিন্ন শহরে কমিটি করে চাঁদা সংগ্রহ করতে থাকেন। বলা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পর এই কমিটিগুলোই অ্যাকশন কমিটি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব জনমত আদায়সহ নানা সহযোগিতা করতে থাকে। সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকায় ‘লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিদের বিক্ষোভ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় : বেলা দুটো বাজতেই হাইড পার্ক স্পিকার্স কর্নারের বিরাট অংশ প্রবাসী বাঙালিদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে গেল। হাজার হাজার বাঙালির সমাগম। তাদের চেহারায় থমথমে ভাব। দেশের ঘটনাবলীতে তারা বিক্ষুব্ধ। সমবেত বাঙালিরা ধ্বনি তুললেন, ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’, ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার কর’, ‘স্বাধীন বাংলা কায়েম কর’ ইত্যাদি। হাইড পার্ক স্পিকার্স কর্নারে সংক্ষিপ্ত এই সভার পর প্রায় ১০ হাজার বাঙালি নর-নারী নিয়ে একটি মিছিল পাকিস্তান দূতাবাস ঘেরাও করতে যায়। কয়েক মাইল বিস্তৃত এই মিছিলে যোগ দিতে ম্যানচেস্টার, ব্রাডফোর্ড, ওর্ডহাম, কিথলি, বার্মিংহাম, শেফিল্ড, কভেন্ট্রি, লুটন, সেন্ট আলবানসসহ নানা শহর থেকে লোকজন আসেন। প্রবাসী বাঙালিদের এত বড় মিছিল এর আগে বা পরে আর কখনো দেখা যায়নি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটতে থাকে। এক সময় পাকিস্তান হাইকমিশনার বেরিয়ে এলে ক্ষুব্ধ লোকজন প্লেকার্ড-ফেস্টুন তার দিকে ছুড়ে মারে এবং তার গায়ে লাগে। পুলিশ দ্রুত তাকে সরিয়ে নেয়। একই দিন ইস্ট পাকিস্তান হাউসে এক গণসমাবেশে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি ইংরেজি ও বাংলায় প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া ঘটিত হয় বেঙ্গল স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি। ২৬ মার্চ ইস্ট পাকিস্তান হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা গানটি পরিবেশন করেন বিশিষ্ট প্রবাসী সংগীত শিল্পী ফরিদা বারী মালিক। এরপরের নয় মাসের ঘটনাগুলো ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ! বাংলাদেশে জীবনবাজি রেখে চলছে যুদ্ধ আর প্রবাসী বাঙালিরাও এখানে মেতে উঠেছিলেন অন্যরকম এক জনযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য গঠিত হয় বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশন ইন ইউকে। ৪ এপ্রিল লন্ডনের বিখ্যাত ট্রাফেলগার স্কয়ারের নেলসন কলাম থেকে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে গাউস খান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তার আগেই হাজার হাজার জনতা নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দশ নাম্বার ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ২৪ এপ্রিল যুক্তরাজ্যে গঠিত অ্যাকশন কমিটিগুলোর কাজের সমন্বয় সাধনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কভেন্ট্রি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘অ্যাকশন কমিটি ফর পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ ইন দ্য ইউকে’। এ দিনই মুজিবনগর সরকারের বহির্বিশ্বে প্রচারণার জন্য বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়। এ দিনই ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে প্রচারণা, চাঁদা সংগ্রহ ইত্যাদির জন্য ৩৩টি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এভাবে প্রবাসী বাঙালিরা কাজ করতে থাকেন স্বাধীন দেশের জন্য। এই নয় মাসে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে বের হতে থাকে বাংলা ও ইংরেজি প্রচারপত্র। ভারতীয় নাগরিক বিমান মল্লিক স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক টিকিট ডিজাইন করেন, তাসাদ্দুক আহমেদের প্রচেষ্ঠায় ‘বাংলা দেশ’ দুই শব্দ থেকে এক শব্দ ‘ বাংলাদেশ’ হয়। নানাভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে হাজারো বাংলাদেশি ছাত্র-জনতা বাংলাদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য অ্যাকশন কমিটির হাতে পাসপোর্ট জমা দিতে থাকে। সাপ্তাহিক জনমত সম্পাদক টি এম ওয়ালী আশরাফের এক স্মৃতিতে জানা যায়, তার বাসায় দুই হাজার ছাত্র-জনতার পাসপোর্ট জমা ছিল যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য। এর মধ্যে অনেক প্রবাসী বাঙালি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন। এই নয় মাস প্রবাসী বাঙালিরা যা রোজগার করতেন তার সিংহ ভাগ তুলে দিতেন অ্যাকশন কমিটির হাতে। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, অ্যাকশন কমিটির কেন্দ্রীয় ফান্ডে ৪ লাখ ১২ হাজার ৮৩ পাউন্ড জমা হয় বাংলাদেশের সাহায্যার্থে। সেখান থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তিন লাখ ৭৮ হাজার ৮৭১ পাউন্ড জমা দেওয়া হয় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের হাতে। বলা যায়, যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের চাঁদার ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭১ পাউন্ড দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু। শুরু হয় তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি।

তথ্যসূত্র : বিলেতে বাংলার রাজনীতি, লেখক : ফারুক আহমদ

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!