সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কাঁঠালচাঁপার আর্তনাদে হারিয়ে যাওয়া প্রহর (১৩ তম খণ্ড)

জাকির মোহাম্মদ:
সেদিন আমরা আন্টির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাজিপুরের বাগানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। অসম্ভব সুন্দর বাগান। সমতল-পাহাড়ে ঘেরা বাগানে সেগুন গাছের নবজাগরণ ছিলো তখন। কোমর বরাবর দুটি পাতা আর টিয়ে কুঁড়িটি যেন আমাদের স্বাদরে সম্ভাষন জানিয়ে যাচ্ছে। আমার কোন কিছু ভালো লাগছে না। বকুল ফটোগ্রাফি নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে যাওয়াতে ফেরদৌসির সাথে এই সবুজের অভয়ারণ্যে হাত চেপে ধরলাম। বোধের ভেতর ফালি ফালি আনন্দ যেন ঠিকরে পড়ছে। সচরাচর ফেরদৌসির হাত ধরা যায় না। অবাধ্য সৌন্দর্য মাঝে মাঝে আনন্দ দিয়ে যায়। চাপ চাপ হিমোগ্লবিনের আলোড়ন অবশেষে ফিরে নিয়ে আসে বাগানের মোড়ের সৌন্দ্যর্য বরাবর। আমরা হাঁটতে আছি দিকচিহ্নহীন। এটাই যেন আমাদের নিয়তি।

আমি এক অদ্ভুদ ঘোরলাগার ভেতর হারিয়ে যাই। মনে হয় ফেরদৌসিকে নিয়ে যেনো কোন অজানা, অচেনা কোন বনে হারিয়ে গেছি। এ অরণ্য যেন আমাদের চিনে নিচ্ছে আপন করে। রাতের পোশাক খোলার নিবিষ্ট আয়োজন করছি। কেউ কি দেখতে পাচ্ছে। পৃথিবীর সমস্ত আলো যেন আমাদের পেছন দিয়ে রেখেছে। যেখানে অরণ্যের ভেতর ঢুকেছি, ঠিক তার বুক বরাবর নদীর কলকল ধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমার সর্বাঙ্গসুন্দর সবুজ স্বপ্ন মোড়ানো সময়ে হয়তো আরও নতুন কোন আখ্যাণের দিকে ধাবিত হতে পারতাম,না। সম্ভব হয়নি। শরতের কোন এক বেরসিক পাখির ডাক আমার তন্ময়তা ভেঙ্গে দেয়। আমি অনুভব করি, ফেরদৌসির হাতের ভেতর আমার আঙুল খেলা করছে। দেখতে পাচ্ছি বকুল ক্লিক ক্লিক করে যাচ্ছে। তার শখের ক্যামেরা এতো সুন্দর ছবি তুলে, যে কেউ পোজ দিতে বাধ্য।

ফেরদৌসি আমার দিকে চেয়ে আছে। খুব চোখে চোখ রাখতে পারতো। আমিও ডুব দিতাম খরস্রোতা কোন নদীর গভীরে যেন।
— তোমাকে ছোঁয়েও ছোঁতে পারছি না কেন?
— বারবার এমন হচ্ছে?
— মনে হচ্ছে নিঃসঙ্গ কোন দীগন্তের পাড়ে দাঁড়িয়ে তুমি আর আমি, অথচ কতদূর।
— বিশ্বাস করো যেদিন তুমি আমার কাছে এলে সেদিন থেকেই নিবিড় স্পর্শে জাগতে চাই আমি। কেবল তুমি বুঝনা। তবুও কোথায় যেন ভালো লাগা কাজ করে, আনন্দের মেটাফর। তুমি নিবিড়ভাবে পাশে আছো?
আমি হাসি।
খুব খলখলে হাসি।
ফেরদৌসি বলে সব সময় হাসো কেন?
সিরিয়াস সময়ে হাসি ভালো লাগে না কাজল।
দূর থেকে বকুল ইশারা করে। ফেরদৌসিকে জড়িয়ে ধরতে বলে। সে ছবি তুলবে। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। জড়িয়ে ধরবো ভাবলেই মনে ভালো লাগা কাজ করছে কিন্তু ফেরদৌসির মনে কি আসবে সেটা তো জানিনা। যদি মাইন্ড করে বসে। স্বপ্নের ঘোরেই যেন জড়িয়ে ধরলাম ফেরদৌসিকে। সুবোধ কইতরের মতো সে আমার বুকে লুকিয়ে গেলো। বকুল ক্লিক করছে একের পর এক।
এই যে দীর্ঘদিনের পথচলা। কম হলেও তিনবছর। একবারের জন্য হলেও ভুল করে ফেরদৌসি তোমাকে ভালোবাসি-এ কথাটা বলা হয়নি আমার। কিন্তু সত্যের জায়গায় খুব দৃঢ় আমি ফেরদৌসিকে ভালোবাসি। আজ তো আচমকা প্রশ্নই করে বসলো। আচ্ছা তুমি কী কোনদিনও আমাকে ভালোবাসার কথাটি বলবে না?

আমি কাউকে কোনদিন বলিনি ভালোবাসি। ভালোবাসি এ কথা বলতে হবে? কেন?
তোমাকে যদি ভালো না বাসি তবে বুকের ভেতর কষ্ট আসে কোথা থেকে বলতে পারো?
রাখো রাখো তোমার পণ্ডিতি। এসব খায় না। গাল ফুলিয়ে সামনে দিকে হাঁটা শুরু করেছে সে। সূর্য ডুবার আমন্ত্রণ পেয়ে গেছে সাধের প্রকৃতি। বাগানিরা সারাদিন পাহাড়ে কাজ করে বাসায় ফিরছে। মাথায় তাদের লাকড়ীর বোঝা। সবাই মহিলা। আমাদের দাঁড়িয়ে থাকার মুহুর্ত তারা খুব ইনজয় করছে। মুখে আঁচলের অংশ বাতাসে সরে গেলে ফাঁককরা দাঁতের হাসি যেন উপছে পড়ে। কেউ কেউ হেসে হেসে যেন গলে পড়ে, বাট পারছে না। বাসায় পৌঁছতে হবে সময় মতো। অন্ধকার হবার তোড়জুড় শুরু হয়ে গেছে।

বকুল আজ অসম্ভব সুন্দর সূর্যাস্তের ছবি তুলেছে। আমাদের দেখাচ্ছে আর পাস হওয়া বাগানরমনীদের ছবি ক্যাপচার করছে। পেছনের দিকের ছবি। সূর্য ডুবে যাওয়াতে সে রকমটা ভালো না হলেও একেবারে খারাপ হয়নি। বাগানিরা দৌড়ায়, কেবল দৌড়ায়। আমরাও বাগান থেকে বের হবার আয়োজন করছি। এই মুহুর্তে ফেরদৌসির চেহারাকে মায়াহিণের মতো লাগছে। সেই মোহিনী সৌন্দ্যর্যের সন্ধ্যাও একদিন সময়ের প্রয়োজনে মানুষ ভুলে যাবে সেটা জানা ছিলো অসাধ্য।
বকুলের ফোন এসেছে….চলবে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
87Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!