মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ভোটের মাঠে এ কেমন সমীকরণ?

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
ড্রয়িংরুমে যে ছেলেটি বসে আছে সে নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে। অর্থাৎ সহজ কথায় ‘ভোটে দাঁড়াবে’। দূর থেকে ছেলেটিকে দেখলেন সোবহান সাহেব। না, না তাকে ‘ছেলে’ বলাটা ভুল হবে। ছেলে বললে তো সাধারণত কিশোর বয়স বোঝায়। কিন্তু এই ছেলে তো কিশোর নয়। তাগড়া জোয়ান। জাতীয় সংসদের ভোটে দাঁড়াবে মানেটা কী? সে কি এলাকার জনপ্রিয় কোনও রাজনৈতিক নেতা? এলাকার মানুষজন কি তাকে এক নামে চেনে? তার আছে কি কোনও বিশেষ যোগ্যতা?

ছেলেটির সঙ্গে আরও দুজন ড্রয়িংরুমের সোফায় পাশাপাশি বসে আছে। সবাই চা খাচ্ছিলো। সোবহান সাহেবকে দেখে তিনজনই বিনীত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সালাম দিলো। সালামের জবাব দিয়ে সোবহান সাহেব ছেলেটিকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি আমার কাছে এসেছো?

জ্বি হ্যাঁ… আমার নাম মকবুল। বাবার নাম জাহাঙ্গীর…।

তোমাকে তো আমি চিনতে পারছি না… তুমি কে? কী করো? সোবহান সাহেবের প্রশ্ন শুনে মকবুল যেন একটু অপ্রস্তুত হলো। তবে সামলে নিয়ে বললো, আমি আপনার গ্রামেরই ছেলে। রাজনীতি করি…।

সোবহান সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রাজনীতি করো মানে? নিশ্চয়ই বিয়েশাদি করেছো? সংসার চালাও কী করে?

মকবুল কী বলবে ভাবছিল। তার পাশে বসা তরুণটি উপযাচক হয়ে সোবহান সাহেবকে বললো, আংকেল… ভাই তো আমাদের এলাকায় ইয়াংদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। ভাই টুকটাক কন্ট্রাকটরি করেন। এবার এমপি নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছা…। নমিনেশন ফরম কেনা হয়েছে। আপনি তো অনেক দিন গ্রামে যান না। তবু এলাকার মুরুব্বি হিসেবে আমরা আপনার দোয়া নিতে এসেছি। আংকেল, ক্যানডিডেট কিন্তু আরও একজন আছে। এই যে আমার পাশে বসা… বলেই পাশের তরুণকে দেখিয়ে দিলো সে।

সোবহান সাহেব অবাক হয়ে তৃতীয় তরুণের দিকে তাকালেন। অনেক প্রশ্ন মনের ভেতর উঁকি দিচ্ছে। শুধু রাজনীতি নয়, নানাক্ষেত্রে মেধার গুণে তরুণরাই এখন নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার সামনে বসা এই তরুণেরা কি সেই অর্থে মেধাবী? জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ানোর মতো তাদের আছে কী যোগ্যতা? ওরা সোবহান সাহেবের কাছে দোয়া চাইতে এসেছে। সত্যি কথা বলতে কী, মন থেকে দোয়া দিতে পারছেন না সোবহান সাহেব। ওরা যে নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক সেটা সাধারণ কোনও নির্বাচন নয়। মহান জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে যারা জিতবেন তারাই পরবর্তীতে দেশ চালাবেন। দেশকে নেতৃত্ব দেবেন। একটি দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া কি সহজ কথা? এ জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বিশেষ গুণও থাকা জরুরি। এদের আছে কি তেমন কোনও গুণ? চেহারা ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য দেখে সে রকম কিছুই মনে হচ্ছে না। ফাজলামো নাকি? ইচ্ছা হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলাম? মকবুলকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করে বসলেন সোবহান সাহেব–আচ্ছা মকবুল, তুমি আমাকে বলো তো… এই যে তুমি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইছো… তোমার কি সেই যোগ্যতা আছে? জাতীয় সংসদ নির্বাচন তো আর যেই-সেই নির্বাচন নয়…।

মকবুল ধারণাই করতে পারেনি এলাকার একজন মুরুব্বির কাছে দোয়া নিতে এসে তাকে এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তার ধারণা ছিল নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা বলে এই লোকের কাছে কিছু আর্থিক সহযোগিতা নেওয়া যাবে। কিন্তু এই লোক তো দেখি আদালতের জজ সাহেবদের মতো কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছে। না, এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে না। তবে মুরুব্বি যখন প্রশ্নটা তুলেছেন তখন আসল কথাটা বলে ফেলাই ভালো। মকবুল নিজেও জানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মতো তেমন কোনও যোগ্যতা এখনও তার হয় নাই। কিন্তু এই সুযোগটাকে সে কাজে লাগাতে চায়। সোবহান সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো মকবুল–

আংকেল আপনাকে একটা সত্য কথা বলবো?

বলো।

আপনি ঠিকই বলেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মতো কোনও যোগ্যতাই আমার এখনও হয়নি। প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কেন গাঁটের টাকা খরচ কইর‌্যা নমিনেশন পেপার কিনছি? উত্তরটা আপনাকে বলি। গাঁটের টাকা ইনভেস্ট কইর‌্যা আমার কতটা লাভ হইছে শুনবেন? এলাকায় আমার নাম ছড়ায়া গেছে। প্রচারমাধ্যম আমার ইন্টারভিউ নিতেছে। সবচেয়ে বড় কথা জাতীয় পর্যায়ের নেতানেত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাইতেছি। সবার সঙ্গে সেলফি তুলতেছি…। এইটা আমার জন্য বড় সুযোগ না?

মকবুলের কথা শুনে সোবহান সাহেব যারপরনাই অবাক হলেন। তার কেন যেন মনে হলো রাজনীতি আর রাজনীতির জায়গায় নাই। মকবুল হঠাৎ চলে যাওয়ার জন্য তাড়া দেখিয়ে বললো, আংকেল আমার এই বন্ধুও কিন্তু নিজে নির্বাচন করবে বলে নমিনেশন ফরম কেনে নাই। কিনছে আরেকজনের ক্যাম্পেইন করার জন্য…।

সেটা কেমন? মকবুলের কথা কেড়ে নিলেন সোবহান সাহেব। মকবুল বললো, এলাকার এক প্রভাবশালী নেতা তাকে মনোনয়নপত্র কেনার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র কেনার টাকাটাও ওই নেতাই তাকে দিয়েছেন। প্রশ্ন করতে পারেন এতে ওই নেতার লাভ কী? লাভ হইলো, ইন্টারভিউ বোর্ডে আমার এই বন্ধু যেন নিজে নির্বাচন করার কথা না বলে ওই প্রভাবশালী নেতার পক্ষেই কথা বলে।

স্যার আপনার চা? চায়ের দোকানদারের কথায় চমক ভাঙলো সোবহান সাহেবের। রাতে দেখা একটা স্বপ্নের কথাই এতক্ষণ ভাবছিলেন তিনি। হঠাৎ তার কাছে এই ধরনের একটা স্বপ্ন কেন ধরা দিলো তা ভেবে পাচ্ছেন না। স্বপ্নে যাদের দেখেছেন তাদের তিনি চিনেন না। অবশ্য গতকাল এই চায়ের দোকানেই এ ধরনের একটা গল্প শুনেছিলেন। গল্পটা শুনে অবাক হয়েছিলেন। সে কারণেই বোধকরি গল্পটা আবার স্বপ্নেই ধরা দিয়েছে।

চায়ের দোকানে আজও জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েই কথা হচ্ছে। দুইজন তরুণ তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দুজনই বেশ ক্ষিপ্ত। হঠাৎ একজন বললো, ওই সব আদর্শ টাদোর্শ কিছুই না। আসল কথা হইলো পাওয়ারে যাওয়া। আচ্ছা আপনি বলেন তো বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের আদর্শের কি কোনও মিল আছে? অথচ তারা ঐক্য গড়েছেন। এইসবের মানে কী? আবার এই যে সাবেক প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহি বি চৌধুরী এতদিন সরকারের বিরুদ্ধে কত কথা বললেন। অথচ নির্বাচন করতে চান সরকারি দলের সঙ্গেই…। এই সবের মানে কী? এইসবের মানে হইলো পাওয়ার… পাওয়ার চাই! যেকোনও মূল্যে পাওয়ার চাই…।

পাশ থেকে একজন বয়স্ক লোক চেঁচিয়ে বললো, ভাতিজারা আজাইরা চিৎকার চেঁচামেচি কইরেন না। বরং হিরো আলম হওয়ার চেষ্টা করেন। সাথে সাথেই তার পাশে বসা একই বয়সী অন্য একজন প্রতিবাদের সুরে বললো, হঠাৎ আপনি আবার হিরো আলমকে নিয়া পড়লেন কেন? হিরো আলম কী দোষ করেছে? হিরো আলমকে নিয়ে এই যে আপনারা এত সমালোচনা করেন তার কি কোনও যুক্তি আছে? ডিপজল যদি নির্বাচনে দাঁড়াইতে পারে তাহলে হিরো আলম পারবে না কেন?

দুই বৃদ্ধের মধ্যে তর্ক বেশ জমে গেলো। পাশ থেকে কেউ একজন মাশরাফি বিন মর্তুজার প্রসঙ্গ তুললেন। সাথে সাথে হিরো আলম আর ডিপজল প্রসঙ্গ হাওয়া হয়ে গেল। মাশরাফিকে নিয়েই সবাই আলোচনায় মত্ত হয়ে উঠলন। হঠাৎ একজন একটি দৈনিক পত্রিকা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সবার সামনে এসে দাঁড়ালো। পত্রিকাটির প্রথম পাতায় সিঙ্গেল কলামে একটি নিউজ ছাপা হয়েছে– মাশরাফির আসনে নৌকার ১৬ নেতা। শুরু হয়ে গেল আলোচনা-সমালোচনা। মাশরাফিকে যদি এত নেতার সঙ্গেই লড়াই করতে হয় তাহলে তার নির্বাচন করাই উচিত নয়– এমনই মন্তব্য করতে থাকলেন অনেকে।

হঠাৎ সবার আলোচনায় আদর্শগত প্রসঙ্গটাই আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে একজন বললেন, বাবা চেয়েছে একটি দলের মনোনয়ন আর ছেলে চেয়েছে সেই দলেরই প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে মনোনয়ন। দুজনই আদর্শের প্রশ্নে কোনও ছাড় দিতে রাজি নয়। ভোটের মাঠে যেকোনও কৌশলই তারা গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

ধীরে ধীরে চায়ের দোকানের সামনে আড্ডাবাজ মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকলো। জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেই আলোচনায় ডালপালা ছড়াচ্ছে। আদর্শগত প্রসঙ্গই গুরুত্ব পাচ্ছে সবার মুখে। মীরসরাইয়ের প্রসঙ্গটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না সোবহান সাহেব। একই নির্বাচনে বাবা-ছেলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কেন? এই প্রশ্নের জবাব কী?

সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!