মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

টেনশনে প্রার্থীরা

সুরমা নিউজ:

এবার রেকর্ড ৪০২৩টি দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ করেছে আওয়ামী লীগ। এক আসনে সর্বোচ্চ ৫২ জন দলীয় মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করার নিয়ম থাকলেও নানা কারণে এবার বিভিন্ন সংস্থা ও সাংগঠনিক জরিপের ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। এজন্য প্রার্থীদের আলাদা সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে না। এ কারণে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের গণভবনে ডেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে তাদের কাজ করার ওয়াদা নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। জোটবদ্ধ নির্বাচনের কারণে মহাজোটের শরিক দলগুলোকে অন্তত ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছেড়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

এই আসন বাদ দিয়ে বাকি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা হবে। এখনও জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে প্রার্থিতা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। এ ছাড়া যুক্তফ্রন্টসহ আরো কিছু দল ও প্রার্থী আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে চায়।

তাদের নিয়েও আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আরো সময় নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তাই মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অপেক্ষা আরো অন্তত এক সপ্তাহ দীর্ঘায়িত হতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল দলের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক শেষে জানিয়েছেন আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।

এদিকে দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরুর পর থেকে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ঢাকায় অবস্থান করছেন। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর তাদের অনেকে এলাকায় যাবেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এখন ভিড় করছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসা এবং কার্যালয়ে। মনোনয়ন বোর্ডে আছেন এমন নেতাদের কাছেও ভিড় করছেন তারা। দলীয় সূত্র বলছে, জোট মহাজোটের জটিল সমীকরণের কারণে দলের অনেকের মনোনয়ন ঝুঁকিতে আছে। এ ছাড়া জরিপ রিপোর্টে যাদের বিষয়ে নেতিবাচক তথ্য এসেছে বর্তমান এমপি বা মন্ত্রী হলেও তাদের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে না। এ তালিকা শেষ পর্যন্ত একশোতে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। দলের ভেতর থেকে এসব বার্তা পাওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এখন মহা টেনশনে সময় পার করছেন।

বিশাল শোডাউন করে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তারপর দিয়েছেন জমা। সাক্ষাৎকার পর্বও শেষ। কিন্তু এখনও মেলেনি নৌকার টিকিট। কবে মিলবে তাও বলতে পারছেন না। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পর আওয়ামী লীগ দলীয় জোটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ইসলামী কয়েকটি দল। আর আগে থেকেই রয়েছে ১৪ দলীয় জোট। এদিকে গতকাল দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে বসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এতে সভাপতিত্ব করেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়নি বলে মানবজমিনকে জানান মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ফারুক খান। তিনি বলেন, বৈঠকে আমরা সব কাজ শেষ করতে পারিনি। আরো কিছু কাজ বাকি আছে। তাই মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে আরো ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে। মনোনয়ন নিয়ে দলীয় প্রার্থীরা টেনশনে রয়েছেন-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের টেনশনে থাকাটা স্বাভাবিক।

এর মধ্য থেকে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নিতে হবে। আমরা যারা নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছি তারা সবাই টেনশনে আছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মনোনয়নের এখতিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের। এই বোর্ডের সদস্যরা হলেন-আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফরউল্লাহ,  অধ্যাপক ড. আলাউদ্দীন আহমেদ, রশিদুল আলম, রমেশ চন্দ্র সেন, ড. আব্দুর রাজ্জাক ও কর্নেল (অব.) ফারুক  খান। এর মধ্যে নতুন সদস্য হিসেবে বোর্ডে স্থান পেয়েছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন, ড. আব্দুর রাজ্জাক ও কর্নেল (অব.) ফারুক খান। বোর্ডের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা যাওয়ার পর একটি সদস্যপদ খালি ছিল। এ ছাড়া সংসদীয় বোর্ডের অন্য দুই সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ড. আলাউদ্দিন আহমেদ অসুস্থ। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেতে ৩০০ আসনে ৪ হাজার ২৩ জন মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।

এ কারণে অনেক আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীরাও টেনশনে রয়েছেন। কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না দল থেকে মনোনয়ন কে পাবেন। তবে দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহকারী সবার বিশ্বাস সবাই দলীয় মনোনয়ন পাবেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, দল কাকে মনোনয়ন দেবে তা দেখতে হলে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তার টেনশনের কারণ সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনে মনোনয়ন নিয়ে টেনশনে রয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তার টেনশনের কারণ একই আসন থেকে মনোনয়ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। একইভাবে পাশাপাশি চাঁদপুর-৫ আসনে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম)। তার আসন থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার সফিকুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার (অব.) সালাউদ্দিন।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে মনোনয়ন যুদ্ধে নেমেছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর অর্ধডজন প্রার্থী। এখানে চারবার এমপি হওয়া জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর আবারও বিএনপি থেকে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্ত কোনো প্রার্থী না থাকায় বিএনপিতে মনোনয়নের লড়াই অনেকটাই নিষ্প্রভ। এর ঠিক বিপরীত চিত্র আওয়ামী লীগে। দল তো আছেই, মহাজোটের প্রার্থিতা নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে দলটির নীতিনির্ধারকদের। আওয়ামী লীগে আসনটির বর্তমান এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে মাঠে আছেন আরো দুই শক্ত প্রার্থী মুজিবুর রহমান ও আবদুল্লাহ কবির লিটন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ আবার পাল্টে দিতে পারে জোট-মহাজোটের হিসাব। কারণ, ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন হলে মহাজোট থেকে এখানে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী প্রার্থী হতে চাইবেন।

এদিকে বর্তমান সংসদে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি রয়েছেন ২৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২১৩, মহিলা ৬১। মহিলা এমপিদের মধ্যে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১৯ জন আর সংরক্ষিত আসনে ৪২ জন। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রায় ২০ জন এমপির বক্তব্য, এলাকায় সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করেছি। এখন অপেক্ষা করছি আগামী নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য। জানি না পাব কিনা। বিষয়টি নিয়ে টেনশন কাজ করছে বলে জানান একাধিক এমপি। এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীদের টেনশনের পাশাপাশি দ্বন্দ্বে রয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কোন আসন থেকে কাকে মনোনয়ন দেবে দল। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে অস্থিরতা রয়েছে। কেউ কেউ বর্তমান এমপি-মন্ত্রীদের এগিয়ে রাখলেও নতুনরা হেভিওয়েট হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন। সেইসঙ্গে নতুনদেরও এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

বিভিন্ন নির্বাচনী আসনের স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মন্ত্রী-এমপিদের কয়েকজন বাদ পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে নতুন মুখের দেখা মিলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কোন আসন থেকে কাকে বাদ দেবেন আর কাকে নেবেন সেটি নেত্রীই ভালো বলতে পারেন। নেত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের। আমরা কাউকে এগিয়ে রাখতে চাই না। দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে আমরা তার জন্যই কাজ করবো। আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতা বলেন, তৃণমূলের পর্যালোচনা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও হাইকমান্ডের মূল্যায়নে যথার্থ হলেই কেবল দলীয় মনোনয়ন মিলবে। এমপি হলেই মনোনয়ন মিলবে না এমন বার্তা ইতিমধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে হাইকমান্ডের তরফে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!