শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের সুন্দর ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা

নুর উদ্দিন লোদী:

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কি শুধু স্বপ্ন দেখেছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ? তিনি কি স্বপ্ন দেখেছিলেন অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানসহ সকল মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সবুজ সোনার বাংলাদেশ? মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য কি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেনি? কিন্তু তার স্বপ্নের মানুষের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক ও সুন্দর যোগাযোগের বাংলাদেশে উপহার দেওয়ার সময় বা সুযোগ তিনি পেলেন কোথায়?

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে যেকোনভাবেই হোক বিদেশি সাহায্যে দেশের মানুষকে দু’বেলা খাবার নিশ্চিত করাটাই আরেকটা যুদ্ধ ছিল। তাছাড়া পাকিস্তানি নরপশুরা বাংলাদেশের সকল এলাকায় যে সব স্কুল-কলেজ, রাস্তা-ব্রিজ ছিল তাও ধংস করে দিয়েছে। ধীরে ধীরে যখন দেশটি ঘুরে ফিরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল ঠিক তখনি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সকল আশা-আকাঙ্খা বিনষ্ট করে দেয়।

শ্রমিকের রক্তে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন শ্রমিক নেতা মনুমিয়াঁর রক্তভেজাে কাপড় নিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকেরা ঢাকার রাজপথ শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে যে আন্দোলন বেগবান করেছিল, সেই স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা। আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও সোনার বাংলার শ্রমিকেরা নতুন করে তাদের পরিচয় খোঁজে। শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকলীন সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারে অসংখ্য টিভির টক শো’তে শিক্ষক, ব্যবসায়ি, সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষের মতামত যুক্তিতর্ক, আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে। এই সকল আলোচকের অঙ্গ-ভঙ্গিতে মনে হয় যারা পেশাদারি চালক, তারা মানব জাতির অংশ নয়। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও এমন তো হওয়ার কথা ছিলো না।

মাস ৩/১ আগে ঘটে যাওয়া বেপরোয়া বাসচালকের অদক্ষতার কারণে হত্যার শিকার কলেজছাত্রী রাজিব ও মিমের রক্তাক্ত নিহত দেহ সামনে নিয়ে কিশোর-কিশোরীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথ উত্তাল করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে “উই ওয়ান্ট জাস্টিজ” শ্লোগানে শ্লোগানে সারা দেশ প্রকম্পিত ছিল এবং গোটা দেশবাসী অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের এমন আন্দোলন অতীতে কখনো দেখিনি কিংবা শুনেছি বলেও মনে হয়নি ।

দেশের সকল মহলে তাদের দাবিকে যৌক্তিক বলে সমর্থন ও সহানুভূতি জানিয়েছিলেন, এমনকি সরকারও। এই কিশোর বিপ্লবের অর্জন এতটাই সাফল্যের উচ্চতায় উঠেছিল, যে সবাই বলছিলেন এরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তারা শ্লোগান তুলেছিল “যদি তুমি ভয় পাও তবেই তুমি শেষ, যদি তুমি ঘুরে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ” এই সাহসী যুক্ত কন্ঠের উচ্চারণ প্রতিবাদ এবং দাবি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি ধাক্কা দিয়েছিল। আরো তারা বলেছিল “দশ টাকায় এমবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই”। সেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সবার বিবেককে জাগ্রত করে দিয়েছে।

জানিয়ে দিয়েছে আইনের উর্ধ্বে কেউ নন। কেউ আইনের উর্ধ্বে উঠতে পারেন না। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র চলবে। সোস্যাল মিডিয়া ফেইসবুকে তাদের পোষ্ট ছিল  রাস্তা বন্ধ , রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে। কোমল মতি শিক্ষার্থীরা তাদের  আন্দোলনের বিজয় নিশ্চিত করে ঘরে ফিরেছে। সেই সময় মন্ত্রী সভায় শিক্ষার্থীদের নয় টি দাবি নিয়ে আলোচনা হয়, এমন কি সর্বোচ্চ শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড রেখে আইনের সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসের শত ব্যস্ততার মাঝেও কুমলমতি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীর আন্দোলন চলাকালীন সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সকল শ্রেণীপেশার মানুষের মতামত যুক্তিতর্ক, আইনের ব্যাখ্যা দেখা এবং শোনার চেষ্টা করেছি। যেহেতু আমার কিংবা আমাদের হ্নদয়ে বাংলাদেশ, ভাবনায় বাংলাদেশ। সকলের বক্তব্যে একটি বিষয় বেশ প্রাধান্য পেয়েছে, সর্বোপরি মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে, গাড়ি চালকদের আইন মেনে গাড়ি চালাতে হবে এবং পথচারীরা তাদের নির্দিষ্ট রাস্তা ব্যবহার করবে।

সরকার ছাত্র-ছাত্রীদের যুক্তিক আন্দোলনের সকল দাবি মেনে নিয়ে প্রথমেই জ্রেবাক্র্স দিয়ে দাবি গুলি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন, তাই বিবেকের তাড়নায় মানসিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম ২০১৫ সালে যখন স্পপরিবারে  বাংলাদেশে ছুটিতে ছিলাম, সেই সময় সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে যে ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তা মিডিয়ার মাধ্যমে যদি সরকার ও উক্ত আলোচকের দৃষ্টি গোচর হয়, তাহলে হয়তো বা প্রবাসের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা হলেও নিজেকে যুক্ত করলাম সরকারের ভিশন ২০২১ আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে।

যাই হোক, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটি হলো গত ১৭ই জুলাই ২০১৫ সালে আমার জন্মভূমি সোনার বাংলায় স্পপরিবারে দেশে ছুটিতে গেয়েছিলাম। দেশকে আমার প্রজন্মকে অল্প সময়ে কিছুটা হলেও জানানোর অংশ হিসেবে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য ঢাকায় উদ্দেশ্য রওয়ানা, উদ্দেশ্য, তাদেরকে শহীদ মিনার থেকে শুরু করে বাংলাদেশ জাদুঘর সহ দেশের কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া । তারা বড় হলে যেন তাদের স্মৃতিতে বার বার  শিকড়ে টানে। বাংলাদেশের ইতিহাস,ঐতিহ্য  তারা সচক্ষে দেখে, জানে এবং বাংলাদেশকে পজেটিভভাবে তাদের মন থেকে ভালোবাসে, কাছে টানে।

সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে প্রায় ৬/৭ ঘন্টার রাস্তা। একজন দক্ষ চালক, যার বিশ বছরের গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা। আমাদের এলাকায় দূরপাল্লার গাড়ি চালক হিসেবে সকলের কাছে যে পরিচিত তাকেই নিয়ে ঢাকায় উদ্দেশ্য যাত্রা। নিরাপদভাবে প্রায় গন্তব্যের কাছাকাছি । ঢাকা শহরে দুই লেইন,  চার লেইনসহ অনেকগুলি ফ্লাইওভার চোখ পড়ার মতো। রাত্রিবেলা ঢাকা শহর সোডিয়াম লাইটের আলোয় আলোকিত। মনে হলো- বিশ্বের কোন উন্নত দেশের বড় একটি শহর দেখছি। বিশ বছরের দক্ষ চালক যখন লেইন পরিবর্তন করে, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবতে পারিনি, আমি যে আবার ফিরে যাবো নিজ মাতৃকায়। তখন চালককে বলি– তুমি এভাবে লেইন পরিবর্তন করে গাড়ি চালাবেনা। সে হেসে উত্তরে আমাকে বলল- আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই, সকলে এই ভাবে চালাচ্ছে, আমি সপ্তাহে দুই/তিন বার যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসি। যদিও তার কথায় আমি একটু স্বস্তি পেলাম, কিন্তু অন্যান্য চালকরা সকলেই একি ভাবে গাড়ি চালানো দেখে আমার চোখ বন্ধ করে দিয়ে খোদার কাছে প্রার্থনা শুরু করলাম-  হে খোদা, রহিম- রহমান, তোমার কুদরত দিয়ে আমাদেরকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌছিয়ে দাও। সেদিন, আল্লাহ্ আমাদেরকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌছিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে বিশ্বমানের নতুন নতুন দুই লেইন, চার লেইনের অনেকগুলি রাস্তা দেশের বিভিন্ন শহরে সাথে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেশের চালকেরা তো জানে না- কী ভাবে হাইওয়েতে গাড়ি চালাতে হয়। সেদিন মনে মনে ভাবছিলাম লন্ডনে গিয়ে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কিছু লিখবো।

যেভাবে বাংলাদেশের গাড়ি চালকেরা অনভিজ্ঞভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন তাদের নিজেদের মতো করে তাতে চালকদেরকে একা দোষী করে কোন লাভ নেই। কারণ আমাদের দেশে গাড়ি চালানো শিখার জন্য ঐভাবে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিভাবে দুই লেইন বা চার লেইনের রাস্তায় গাড়ি চালাতে হয়, তারা তা শিখেনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। সেজন্য প্রতিদিনই বাংলাদেশের কোন না কোন শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় খবর পাওয়া যায়। প্রতিদিন খবর হয় অনেক অনেক দূর্ঘটনার। অনাকাঙিক্ষতভাবে ঝরে পড়ে শত শত জীবন।

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাটি আর লিখা হয়ে ওঠেনি। লিখবো লিখবো করে অনেক সময় চলে গেছে। প্রবাসে সপরিবারে  বেঁচে থাকার জীবন-সংগ্রাম আর সকাল-বিকেল আর রাত্রিতে বিরামহীন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবন চলছে। বিবেকের তাড়না থাকলেও সময়ের স্বল্পতার জন্য লিখতে পারিনি।

সম্মানিত আলোচক ও রাষ্ট্রের মোটরযান পরিবহনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষবৃন্দ, আপনাদের সকলের বিবেকের কাছে প্রশ্ন?  টিভিতে যে কোন একটি ঘটনার প্রবাহে কিছুদিন মিডিয়ায় আলোচনা করলে মানুষের কি সমস্যার সমাধান হয়, নাকি সচেতন করা সম্ভব এবং আলোচনাই বা কতদিন চলবে? সকল মহলে শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনার এমন ঝড় উঠেছে সরকারকে যেন রাতারাতি পরিবর্তন করে দৃশ্যমান কিছু দেখাতে হবে। যেখানে ৪৭ বছরের পুরানো জঞ্জাল, দীর্ঘ এই সময়ে নানান ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা হয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত দেশে ড্রাইভিং স্কুলের সঠিক কোন নিয়ম বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি, যেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ড্রাইভিং শিখে আইন ভঙ্গ করে যাচ্ছে, এমন তো নয়।

আন্দোলনকে ঘিরে একটি সংবাদ সম্মেলন দৃষ্টিপাত হলো, যেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশের জাতীয় পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের শতাধিক সাংবাদিকরা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকলের কাছে জানতে চাইলেন, আপনারা যখন গাড়ি চালান এখানে কতজনে নিয়ম মানেন অথবা আপনারা গাড়িতে তাকা অবস্থায় ড্রাইভার যখন গাড়ি চালায় কতজনে বলেন ড্রাইভারকে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে। কোন উত্তর না দিয়ে সকলে শুধু হাসলেন। কিন্তু এই সকল সাংবাদিকবৃন্দরা জাতির বিবেক,  যাদের কলমের কালি মাধ্যমে যে কোন দেশে সুশাসন গঠনে একটি অগ্রণী ভূমিকা রাখে। আপনারা যখন নিয়ম পালনে সঠিক উত্তর দিতে পারলেন না, তাহলে আপনাদের কলম কেন এই সকল শ্রমিকদের পেট সুড়ঙ্গ করতে মরিয়া হয়ে উঠে একবারও কি ভাবছেন এক দিন কাজ না করলে এই সকল শ্রমিকদের পরিবারের কি অবস্থা হয়। কাজ ছাড়া তারা কি ভাবে তাদের পরিবারে দুবেলা খাবার জোগাড় করবে। তখন ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু হলো, পুলিশের ভয়ে লক্ষ লক্ষ গাড়ি চালক ঘরে বসে রইলো, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ গাড়ির কাগজ আর ড্রাইভারের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না।

ধরে নিলাম এই সময়ের মধ্যে ২৪/৭ অফিস খোলা রেখে সকল গাড়ি চালকদেরকে বৈধতার আওতায় নিয়ে আসলেন, (যদিও প্রশিক্ষণ ছাড়া সম্ভব নয়) এটাই কি যানবাহন চলাচলের সঠিক সমাধান। যেখানে পুলিশ সুপার নিজে বলছেন শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ আইন মানে না। পৃথিবীর কোথাও কি নিজে থেকে কেহ আইন মানে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব যে কোন মানুষকে আইন মানাতে বাধ্য করায়? রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োগ করে জনগনকে আইন মানাতে বাধ্য করবে, এখানে মালিক পক্ষ কি রকম চুক্তিতে রাস্তায় গাড়ি নামাবেন, আর কি রকম চুক্তিতে গাড়ি নামাবেন না, এটা রাষ্ট্রের দেখার বিষয় নয়। কে গাড়ি নামাবেন আর কে গাড়ি চালাবেন, এসব ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে রাষ্ট্রের এই নিয়ম মেনে চালাতে হবে। তবে এখানে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে একজন নাগরিক কি কি প্রশিক্ষণ নিলে সে ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু রাষ্ট্র ঐ সকল প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে  আইন প্রয়োগ করা কতটুকু যৌক্তিক?!

আমার ভয় হয় তখনই, যখন দেখি রাস্তায় জ্রেবাক্র্স থেকে শুরু করে যে সকল রোড মার্কগুলি দেওয়া হচ্ছে, যখন একজন গাড়ি চালক এইসব রোড মার্কগুলি অতিক্রম করবে তখন সেই চালকের কি করা প্রয়োজন, সেটা কি ঐ চালক নিজে জানেন অথবা যে সকল রোড মার্কগুলি একজন পথচারী অতিক্রম করবেন ঐ পথচারী কি জানেন তার কি করতে হবে। যেমন, যদি আমি লন্ডনের কথা বলি কোন গাড়িচালক যদি জ্রেবাক্র্সে পথচারীকে আঘাতপ্রাপ্ত করে তাহলে আঘাতের পরিধি অনুযায়ী ঐ চালকের শাস্তি প্রদান করা হবে, তবে যদি আঘাতপ্রাপ্ত লোকটি মারা যায় তাহলে ঐ গাড়ি চালকের চৌদ্দ বছরের জেল হবে। এখানে কিন্তু যদি শব্দগুলি ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতা হলো গাড়ি চালক জানে সামনে জ্রেবাক্র্স মার্ক থাকলে তার কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, অন্যদিকে পথচারীরাও জানেন কি ভাবে জ্রেবাক্র্স অতিক্রম করতে হয়। তাছাড়া ঘন্টায় ৪০ কি: মি: গতি সীমার উর্ধে সে সকল রাস্তা রয়েছে সেসব রাস্তায় জ্রেবাক্র্স দেওয়ার নিয়ম নেই। আজ ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে লন্ডনে বসবাস করছি এবং প্রায় ১৫ বছর থেকে নিজে গাড়ি চালাচ্ছি। এই দীর্ঘ সময়ে জ্রেবাক্র্সে দুই একটি অনাকাঙিক্ষত ঘটনা ছাড়া বেশ কিছু দুর্ঘটনা হয়েছে বলে শুনিনি।

সম্প্রতি আমি যখন দেশে ছিলাম, একদিন বাড়ী থেকে সিলেট যাওয়ার পথে দেখতে পেলাম কিছু স্কুল-কলেজের ছাত্র রাস্তায় সাদা রং দিচ্ছেন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তা বন্ধ করে এখানে তোমরা কি করছো, ছাত্ররা আমাকে উত্তরে বলে জ্রেবাক্র্স দিচ্ছি। আবার আমি জিজ্ঞেস করি এই মার্কগুলি রাস্তায় দিলে কি হবে নিজের মতো করে উত্তর দিচ্ছেন- আসলে এটা কোন সমাধান নয় বা এসব স্কুল ছাত্রদের কাজ নয়।
আনেদালনকারী থেকে শুরু করে সকল আলোচকের বক্তব্যে একটি কথা বারবার আলোকপাত করতে শুনেছি, সেটি হলো যারা পেশা হিসেবে গাড়ি চালাচ্ছেন তাদেরকেই উদ্দেশ্য করে যত সব অজুহাত। এখানে যারা নিজের গাড়ি চালাচ্ছেন অথবা মটর বাইক চালাচ্ছেন সেই সকল চালকদের জন্য কি অন্য নিয়মাবলী থাকবে? না এখানে রাস্তায় যিনি গাড়ি চালাবেন তিনিই গাড়ি চালক হোক সে প্রাইভেট অথবা পেশাদারি?
আমি যখন নিরাপদ সড়ক ও সুন্দর যোগাযোগের বাংলাদেশ দেখতে চাই লিখতে মানুষিক ভাবে প্রস্তুতি নিলাম , তখন দেখতে পেলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক ও টিভি মালিকদের কাছে একটি অনুরোধ করলেন মানুষকে রাস্তা পারাপারে সচেতন করে তুলার জন্য টিভিতে দুই চার মিনিট শিক্ষণীয় মুলক কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করতে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন স্কুল শিক্ষক বৃন্দ ছেলে মেয়েদেরকে রাস্তা পারাপারের জন্য নির্দেশনা মুলক শিক্ষা প্রধান করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে আমি ধন্যবাদ জানাই এবং যুক্ত করতে চাই উন্নত বিশ্বে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানে রাস্তায় যে মার্ক গুলি দেওয়া থাকে, সেই সকল মার্ক দেখলে তাদের  করণীয় কি, কারণ রাস্তা পারাপারের মার্ক গুলি প্রাইমারি স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা আছে, এবং স্কুল ছুটির আগে ছোট ছোট কোমল মতি  শিশুরা   কি ভাবে রাস্তা পারাপার করবে সেই শিক্ষা প্রতিদিন শিক্ষকরা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের দেশে জি পি এ-৫ পাওয়ার পরেও সে জানে না রাস্তায় যে মার্ক দেওয়া থাকে  তার মানে কি। যেহেতু আমাদের দেশে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত নেই। শুধু বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিলেই কি সফল মন্ত্রী হওয়া যায়, বই থেকে ছাত্র ছাত্রীরা কি ধরনের শিক্ষা অর্জন করছে সেটি হলো মূল বিষয়। শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় বেশ কয়েক বছর যাবত শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য এমন কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন , কুমলমতি শিশুরা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে বড় হবে। যেকোনো  জাতি একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে উন্নত সভ্য ও সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
যাইহোক, গত ৭ই আগস্ট আইন মন্ত্রী আনিসুল হক সাহেব ৭১ টিভিতে ভিডিও কলের মাধ্যমে টকশো তে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ট্রাফিক  আইন নিয়ে  অনেক গুলি প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ( যদিও নিজের মতো করে )। কিন্তু একটি সময় আইনমন্ত্রী মহোদয় উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, ধরেন একটি হাইওয়েতে উচ্চ গতিতে গাড়ি চলছে হঠাৎ একটি গরু অথবা মহিষ রাস্তায় ছুটে অসলো, এর পিছনে মালিকও ছুটে আসলে এ সময় যদি কোন দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয় তাহলে দায়ি কে? চালক না যে লোকটি রাস্তায় ছুটে আসছে। যদিও উপস্থাপিকা বা আরো দুই জন অতিথি শুনেছেন কোন উত্তর দেননি। উন্নত  বিশ্বে কোন হাইওয়েতে মানুষ অথবা জীব জন্তু আসার কোন সুযোগ নেই, কারণ হাইওয়েতে সব সময় রাষ্ট্রের নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চলে। তাই এই ধরনের যে কোন  দুর্ঘটনার জন্য রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাই দায়ি।
অর্থ মন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন একনেকের সভায় দক্ষ চালক প্রশিক্ষণের সার্থে এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক আর্থিক সহায়তা প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে সর্বশেষ যে অনুরোধ করতে চাই, যেহেতু দক্ষ চালক প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশি সংস্থা সাহায্যে হাত প্রসারিত করেছে, তাই দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশি সংস্থার সাহায্যে যথার্থ মূল্যায়ন হবে এতে আমাদের দেশের মানুষ উপকৃত হবে।
দক্ষ প্রশিক্ষক পাওয়া এমন কোন কঠিন বিষয় নয়, বিশ্বে সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনায় হয় লন্ডনে, আর এখানে বৃটিশ বাংলাদেশীরা বেশ বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে । ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে গাড়ির ফিটনেস, গাড়ি রেজিট্রেশন, লাইসেন্স ইস্যু , Software develop সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে আমাদের বৃটিশ বাংলাদেশী ছেলে মেয়েরা কাজ করে আসছে সফলতা সাথে ।
বাংলাদেশে বিআরটি, চালক ও মালিক নিয়ে প্রতিনিয়ত যে সমস্যা লেগেই তাকে, স্থায়ী ভাবে উত্তোলন করতে হলে আমাদের  বৃটিশ বাংলাদেশী মেধাকে দেশের কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় সড়ক দুর্ঘটনায় কবল থেকে  মানুষের মৃত্যু যেন হ্রাস পায়। বৃটিশ বাংলাদেশী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মেধাকে কাজে লাগালে আমি শতভাগ নিশ্চিত না হলেও মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিটনেস ব্যতীত কোন গাড়ি, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোন চালক রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার দুঃসাহস করবে না। কারণ আইনের মাধ্যমে একজন চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সকে যে ভাবে রাখা হবে, শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স রক্ষা করার জন্য চালক যে সতর্কতা অবলম্বন করবে তাতেই  ৮০% সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।
সরকার যদি প্রয়োজন মনে করেন তাহলে এই সকল মেধাবী বৃটিশ বাংলাদেশীদেরকে কি ভাবে দেশের কাজে লাগানো যায় আমরা প্রবাসীরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, যেহেতু প্রবাসের নতুন প্রজন্ম শিকড়ের সন্ধানী করে তুলতে Global Bangla Foundation নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে তাদের কে উদ্ধব করার জন্য কাজ করে আসছে দীর্ঘ দিন থেকে।
একটি রাষ্ট্রে যতদিন পর্যন্ত গাড়ি  চালককে নিয়ম মেনে রাস্তায় গাড়ি চালাতে বাধ্য করতে না পারবেন ততদিন পর্যন্ত মালিক, শ্রমিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম চলবে। শ্রমিকদের আন্দোলনের রোষানলে লাঞ্ছিত হবে স্কুল-কলেজের
ছাত্র-ছাত্রী, জীবন দিতে হবে নিষ্পাপ শিশুকেও। ঠিক তখনই শাহজাহান খানের মতো শ্রমিক নেতাদের অট্টহাসি হতাশ করবে সমগ্র জাতিকে।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
130Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!