শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কাঁঠালচাঁপার আর্তনাদে হারিয়ে যাওয়া প্রহর (১২তম খণ্ড)

জাকির মোহাম্মদ:

স্মৃতিগুলি ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হলো। ট্রেন থেকে নেমেই সবুজের সুগভীর কোন বেষ্টনিতে গিয়ে ঢুকলাম। সুনশান নিরবতা চারদিকে। অই ছোট্ট ঘরের জানালায় ফেরদৌসির মুখ। হাসু হাসু করছে। যেনো সম্পূর্ণ রক্তিম আবহে জেগে থাকা কোন নারী। আমি চেয়ে আছি ফেরদৌসির দিকে। বকুল পথ চলছে, কথা বলছে। কন্ঠে আর শব্দ বেরোচ্ছে না এরকম অবস্থা।

কতদিন কথা হয়েছে। কতদিন চলে গেছে। আসা হয় না। দেখা হয় না। না আসা আর না দেখার পার্থক্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। সামনের দরোজায় দাঁড়িয়ে হাত তুললো সে। ভেতরে আসো। যেনো কোন পুতুল আমি। কোন কিছুর তুয়াক্কা না করে ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকেই দেখি আন্টি বসে আছেন। চারপাশে ঔষধের গন্ধ। আন্টি এবার ফেরদৌসিকে বললেন আমাদের কিছু একটা দেবার জন্য। আমরা এখানে কিছু খেতে চাচ্ছি না। আন্টিকে দেখে আনন্দের মাত্রা কমে গেছে অনেকটা। ঠিকঠাক মতো কথা বলতে পারছি না মনে হচ্ছে। বকুলের মুখে যেনো খই ফুটছে। খোঁজে পাচ্ছি না, এতো কথা তার মুখে আসে কোথা থেকে? সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বেরুতে হবে এখান থেকে । বারবার ফেরদৌসিকে দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করছি। ফেরদৌসির রুম থেকে সামনে পা বাড়ালেই সবুজ ধানি জমিন। মাত্র ধানে সবুজ রঙ ধরেছে। চারদিকে ধানের সবুজ রঙে একাকার অই রাস্তার পাশে কয়েকটি খেজুরের গাছ। সারিবেঁধে লাগানো। বিশাল পুকুরে আভিজাত্য যেনো ঠিকরে পড়ছে। দূরে কয়েকটি সাদা বক ধানের মাঝখানে যে আইল সেখানে এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। একপা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার মজা কি একমাত্র বকপক্ষী ছাড়া আর কেউ জানেনা।

আন্টির সাথে বকুল জমিয়েছে বেশ। অবাড়ি থেকে বৌদি এসেছেন। এসেই দিলে গলা ছেড়ে হাক। ফেরদৌসি কইলো তোর নাগর। বৌদি সুন্দরী, বুদ্ধিমান আর চটপটে। ফেরদৌসি অবশ্য অনেকবার আমাকে বৌদির বিষয়ে বলেছিলো, আর সেকারনেই হয়তো আপাদমস্তক মুখস্ত বৌদিকে আপনি এতো ঠোঁট কাটা কেন? জবাবে বলেছিলেন- যারে বুকের মাঝে আগলে রেখে ভরনপোষন করেছি। তার জন্য মায়ার জায়গাটা আলাদা হবেই। না করেছে কে? বলছি এতো ঠোঁটকাটা মানুষ হয়? কেন হবেনা। এখনই ঠোঁট বন্ধ করতে চান। আপনি জিনিস ভালো না। দ্রুত কথার জবাব দিলাম- আপনি বা ননদ কেউই জিনিস ব্যাবহার করেননি, এভাবে বলতে পারেন না। বৌদির সেই সময়ের আচমকা হাসি, আর ফেরদৌসির ভ্যাবাচ্যাখা মুখ আজও আমাকে মুগ্ধ করে। মনে হয় এই যেন হাসির কোন বুদবুদ থেকো উঠে আসলাম।

আমার মনে হচ্ছে বৌদির সাথে জমবে ভালো। সেই ভালো লাগা থেকেই কথার পিঠে কথার সুদীর্ঘ একটি দুপুর চুনঘরের বসতিতে হারিয়ে যায়। হাতে নাস্তার ট্রে, আর চোখে ইশারার কাব্য নিয়ে হাজির ততক্ষণে ফেরদৌসি। বকুল আমি বৌদি আর আন্টি এ পর্যায়ে নাস্তার জন্য রেডি হচ্ছি। হাত ধুঁয়ে নুডুলসের বাটি হাতে নিই। যেনো বা মাত্র নুডুলস বানানো হয়েছে। না! এখানে বানানো তো সম্ভব না। তাহলে? বৌদি তৈরী করে নিয়ে এসেছেন। আন্টির নুডুলস হাতে অভিব্যক্তি দেখার মতো। আবার বললেন-নেন বাবা। আচমকা আমি ফেরদৌসির দিকে তাকাই। দেখি তার চেহারা উজ্জ্বল থেকে ক্রমশঃ উজ্জ্বল হচ্ছে প্রশংসা বাক্যে। বকুলের প্রশংসার বিরাট গুন আছে। সেটা বুঝা গেলো। বুঝা গেলো বজ্রপাতের মতো হঠাৎ কোন স্বপ্ন টুকরো হয়ে বিস্ফোরিত হয়না। কিন্তু তা সঠিক বলে মেনে নিতে পারি না। অন্ততঃ আজ আর সেদিনের দুপুর? ঘরটা আলোকিত করেছিলাম সকলে হাসি আনন্দ আর আড্ডায়। আন্টি চলে গেছেন। বৌদি আমাদের বিদায় করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন। বের হবো, হতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিলো কিসের স্পন্দন যেনো বেড়ে যাচ্ছে। প্রিয় বিদায়! এরকমই কি হয়? চলবে….

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
123Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!