শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কাঁঠালচাঁপার আর্তনাদে হারিয়ে যাওয়া প্রহর (১১তম খণ্ড)

জাকির মোহাম্মদ:

সকাল আটটার মতো বাজে। এমন কোন সকাল না, কিন্তু বকুলের খুব অস্থির লাগছে। বারবার আমাকে জাগিয়ে তুলার চেষ্টা করছে। আটটা ঘড়ির টাইম দেখে আরও কিছুক্ষণ পরে বেড থেকে নামার ইচ্ছাটা প্রচন্ড ভাবে ধরেছে। আবার ধাক্কা দিলো বকুল, এই উঠ। চলে যাবো কিন্তু ঘুমে রেখেই। বকুল সেটা পারবে। জানি আমি। সুতরাং আর ঘুমে থাকা যায় না। বাথরুমে ফ্রেশ হয়ে রান্না ঘরে ঢুকলাম। কিছু নাস্তা আর পিঠার ব্যাবস্থা করেছিলাম রাতে। এখন কয়েকটা ডিম সিদ্ধ দিলেই হয়ে যায়। বুকল যেভাবে যাবার তাড়া দিচ্ছে এই সময়ের ভেতর পারবো কিনা সেটিও মনের মধ্যে কাজ করছে। জিজ্ঞেস করবো কিনা ভাবছি, এমন সময় বকুল বললো তাড়াতাড়ি ডিম চুলায় বসিয়ে দে। তুই গোসল করে আয়,ততক্ষণে হয়ে যাবে। বাঁচলাম, সে সময়ও আছে জেনে। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো। বারান্দাজুড়ে সকালের রোদ কিলবিল করছে। ফোনে কথা বলছে বকুল।

এতো এতো ফোন প্রতিদিন কোথা থেকে আসে, এ এক বিস্ময়? বকুল। বকুল। বারান্দা থেকে নড়তে ইচ্ছে করছে না তার। যেকোন মুহুর্তে রাগটাগ করে বসতে পারে মনে করে আর ডাকলাম না। রেডি হচ্ছি নিজে। সে শার্ট-প্যান্ট আগেই লাগিয়েছে। হাঁফওঠা ডিমের ডেকছির সরা তুলে ভেতরে চোখ ফেলাটা আমার খুব ভালো লাগে। কিছুক্ষণ পরপর সেটা করছি, আর বকুল বলছে আজ আর ডিম সিদ্ধ হচ্ছে না। যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। হুড়মুড় করে বাসা থেকে বের হলাম। বাজারে গিয়ে দেখি একটা সি এন জি নাই। অথচ সারাদিন সি এন জি’র টানাটানির জন্য দাঁড়ানোই যায় না এই ব্যাস্ত বাজারে। অটোরিকশা করে স্টেশনের পথে ছুটলাম। তাতে কি, শহরের কোন এক জায়গায় গিয়ে অটোরিকশা নষ্ট হয়ে যাবে একথা তো বুঝতে পারিনি।

আজ বেরা লেগেছে, সেটি এতো সহজে ছুটবে বলে মনে হচ্ছে না। কোনভাবে দশটা পনেরো মিনিটে স্টেশনে পৌঁছতে পারলা। ট্রেনের হুইসেল বেজে গেছে। দৌড়ে গিয়ে কামরায় ঢুকলাম। ট্রেনের কামরা যেন পুরো এক গ্রাম। পরিবারের সবাই এখানে উঠে বসে। শুধু কি পরিজন। সাথে গাট্টি,বুচকা,আর লাগিজ। যার যেমন। কোন ভাবেই কম হবে না। সবার হাতে কয়েকটি ব্যাগ-ব্যাগেজ থাকবেই। আমরা একদল শিক্ষার্থীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আজ পর্যন্ত কোনদিন ট্রেন জার্নি হাউসফুল কামরা না দেখে হয়নি। উপচে পড়া মানুষ। এই রেল আমাদের দেশে কেমনে যে লাভজনক হয়না তার ব্যাখা বুঝার কোন তুলনা হয়না। ঠিক এ কারণেই কোন ব্যাখ্যার খোঁজ নিতে চাই না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মুখী কোন ট্রেন দাঁড়ানো সিট ছাড়া স্টেশন ছাড়ে গতো তিনবছরে সেটা দৃষ্টিপাত হলো না। কেবল আমাদের কর্তাব্যাক্তিগণ অন্ধ,বোবা আর পনিকল্পনাহীন। এজন্য তারা কিছুই দেখেন না।

ফেঞ্চুগঞ্জ ভাটেরা রেলস্টেশনে দাঁড়ালো ট্রেন। তারপর মাইজগাঁও। সবখানেই সাথের থাকা তারুন্য দৌড়ানি দিয়ে নামলো, আরেকদল উঠলো। চোখে মুখে হাসির তৃপ্তি কতদিন দেখি না। তাদের উচ্ছলতায় যেন উগড়ে পড়ে সমস্ত আনন্দের দিনরাশি। মধ্যখানের সিটে বসা কোন এক সুন্দরীর বর্ণনার ভেতর তাদের হেসে গলে পড়া দেখে বকুলও হেসে উঠলো। এরই মধ্যে তাদের চোখ পড়েছে আমাদের দিকে। চোখ সরিয়ে আবার তাদের গালগল্পে মেতে উঠলো। ট্রেনের কামরায় এবার ভিক্ষুকের দল গান বেঁধে পথ রেডি করে আসছেন। একজন অন্ধ, আরেকজনের পিঠে আছে হাতের লাঠি। দুদিক থেকে দুজনেই ধরে আছে। ট্রেনের কামরার ভেতর মানুষের এতো চাপ, লাঠি ছাড়াই হাতে ধরে কোন ভাবে গানের সুর রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন। ‘আমার আল্লাহ নবীজির নাম। যদি করো একটা টাকা দান। হাশরে ক্বিয়ামতে পাইবা, ডবল প্রতিদান’। ট্রেনের এতো শব্দের মাঝেও তাদের কন্ঠস্বর এতো চমৎকার ভাবে কানে বাড়ি দেয়, সাহায্য না করার পর্যায়ে যাওয়া কঠিন। ডিম ডিম ডিম, চানাচুর, আনারস, লেবু কি নেই। বাদামের খোসাতে ইতোমধ্যে ট্রেনের নীচে হাঁটার জায়গা কমিয়ে দিয়েছে। যারা নিয়মিত ট্রেন জার্নি করে, তারা এতো খেতে পারে কেমনে,এটা ভেবে অস্থির আমি। বকুল বলে ধৈর্য্য ধর। দেখে যা। এইসব হালচিত্র ট্রেনে প্রতিদিন। কবে পরিবর্তনের দিকে যাবো আমরা তার কোন সমাধান আপাততো জানা নেই। বকুল ফোনে কথা বলছে। ওপারে ফেরদৌসি।

কিছুক্ষণ আগে আমার মোবাইলে ফোন এসে কেটে গেছে। কতদূর পথ পাড়ি দিলাম তা জানার জন্য ফোন। আসলে তো দেখা হবেই, এখন আর ফোনে আদিখ্যেতা দেখানোর লোক হতে চাই না। এটাই ভাবনা। চেনাপথে যাবো, গন্তব্যে গিয়ে বলবো-কোথায় আছো? কুলাউড়া জংশনে নামলাম। আজ ইচ্ছে হলো এলাকাটা আগে একটু ঘুরে দেখি। জংশনটা পুরাতন। কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে খুব ভালো না, মোটামোটি ধরনের বলা চলে। পাগল মানুষের আনানগোনা কম না। এক সময় যেখানে সেখানে মলমূত্র থাকলেও এখন কিছুটা কমে গেছে। জংশন আরেকটু সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন হলে, ঘুরে দেখা জায়গাটা আরও ভালো লাগতো। একজন পাগল প্রায় লোক কি রকম করে চেয়ে আছে। লোকটার গলা ভরা মালা আর চেইনের অদ্ভুদ এক মিশ্রন। অপরিষ্কার জটাচুল। দাঁড়ি আর মুছ একেবারে একাকার। কোনরকম ভাবে সামনের দুটি হলুদ দাঁত দেখা যাচ্ছে। চোখের মাঝে এক ধরনের প্রসন্নতায় বিমুগ্ধ হয়ে দশটাকার একটা নোট হাতে দিলাম। খুশি হয়ে এক কাপ চা আর কলা ছিড়ে হাতে নিলো। মনে হলো খুব ক্ষুধাতুর মানুষ। স্টেশন থেকে বের হয়ে থানার সামনে গেলাম। সেখান থেকেই দক্ষিনবাজার হয়ে আমাদের পরিবর্তি গন্তব্য। লেগুনাতে উঠবো এমন সময় সামনে পেলাম আমার বান্ধবী সোহানা। অনেকদিন পর তার সাথে দেখা। সোহানার সাথে জেবতিকের মনদেয়া ছিলো। একজন উঁচু তালগাছ আর আরেকজন সদ্য গজানো খেঁজুর হওয়ায় মনের মিল থাকলেও স্বপ্নের দুরত্ব কমেনি। বেড়েছে। এখন দেখা হওয়াতে এক ঝলকে পেছনের সেসব স্মৃতির চৌকাঠ পেরিয়ে বললাম বন্ধু কেমন আছিস। প্রাথমিক কুশল বিনীময়ের পর জানা গেলো সোহানা এসেছে জবের এপয়েনম্যান্ট লেটার নেয়ার জন্য। প্রাইমারিতে সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে পদায়ন হয়েছে। সোহানার ব্যাস্ততার জন্য আর জেবতিকের কথা জানা গেলো না। আবার চাচাও সাথে ছিলেন, জেবতিকের বিষয় কিভাবে নেন ভেবে আর সেদিকে না গিয়ে বিদায় নিলাম। ভালো থাকিস বলে মিষ্টি হাসি দিয়ে সোহানা মিলি প্লাজার দিকে হাঁটতে লাগলো। তার একপা একটু খোঁড়া, সে হাঁটার ছন্দের তালে আমরা লেগুনায় বসে পড়লাম। ফেরদৌসির অপেক্ষা শেষ হলো…

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!