শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

অ্যান্টিবায়োটিক ভয়ঙ্কর

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের কারণে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। পুরস্কার নেওয়ার পর এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘একটা সময় আসবে যখন মানুষ খুব সহজেই হাতের কাছে অ্যান্টিবায়োটিক পাবে এবং সেটা সে ভুলভাবে গ্রহণ করবে এবং মারাত্মক বিপদের মুখে পড়বে।’ তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখা করেছিলেন এইভাবে-‘ধরুন Mr.X-এর sore throat (গলাব্যথা) হলো, তিনি বাজার থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে এনে খেলেন (যেটা ভুল) এর ফলে উনার শরীর তখন streptococci-এর বিরুদ্ধে চলে গেল। পরবর্তীতে যখন উনার pneomonia হলো এবং তিনি এ জন্য যখন অ্যান্টিবায়োটিক নিলেন তখন আর তা কাজ করল না এবং তিনি মারা গেলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উনার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?’

সত্যিকার অর্থে এখন এই একই প্রশ্ন আমাদেরও, আমরা প্রতিনিয়ত যেভাবে না বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছি তার ফলে যদি আমাদের কারও ক্ষতি হয় তার জন্য কে দায়ী থাকবে!

যে অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের প্রাণ বাঁচাত আজ সেটাই আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে বলছেন এর সঠিক ব্যবহার না হওয়া।

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত, এমন একটি ওষুধ যা শুধু ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু বর্তমানে ভাইরাসঘটিত অসুখেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, যার ফলে আমাদের দেহের যে উপকারী ব্যাক্টেরিয়া আছে সেগুলো মিউটেশনের মাধ্যমে নিজেদের বদলে ফেলে হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেহের জন্য ক্ষতিকর। এর কারণে আমাদের দেহ তখন হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিকবিরোধী। যার ফলে পরবর্তীতে ব্যাক্টেরিয়াজনিত কোন রোগে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না, যা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জানা গেছে, ভাইরাসজনিত সর্দি, কাশি, জ্বর ও ডায়রিয়ার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। কারণ অ্যান্টিবায়োটিকে ভাইরাস ধ্বংস হয় না। অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে গ্রামে ভাইরাসজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার চলছে। গ্রাম এলাকায় সাধারণ মানুষ জ্বর, কাশি বা মাথাব্যথা নিয়ে এলাকার ফার্মেসিতে গেলে ফার্মেসিতে যারা ওষুধ বিক্রি করছেন তারা অন্য ওষুধের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকও দিচ্ছেন অথচ তারা জানেন না যে অ্যান্টিবায়োটিক কখন খেতে হবে বা কখন খাওয়া যাবে না। তারা জানেন যে অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর, কিন্তু এটি যে মাঝে মধ্যে ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা কম।

আর জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধে চিকিৎসকরা (এমবিবিএস) অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের জন্য দেওয়া ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ঠিক মতো অনুসরণ করছে না রোগীরা। বেশিরভাগ রোগী অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সঠিক নিয়মকানুন মানছে না।

চিকিৎসকরা বলেছেন, রোগীদের বেশিরভাগই প্রেসক্রিপশনে নির্দেশিত অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পন্ন করছে না। শারীরিকভাবে সুস্থ অনুভব করলে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দিচ্ছেন। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জানা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়ার মতো সাধারণ কোনো রোগ নিয়ে ফার্মেসিতে, গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র বলছে, শুধু রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি, সেবন বা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী কর্তৃক সরবরাহ করা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে।

সূত্র মতে, অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি, সেবন বা গ্রহণের ব্যাপারে সরকার একটি নীতিমালা প্রস্তুত করেছে। প্রণীত এই নীতির আলোকে আইন প্রণয়ন করা হলে অবাধে অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ হবে। তবে নীতিমালা তৈরি হলেও এখনো কোনো আইন প্রণয়ন না হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহারে নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই বিবেকবান হতে হবে। ফার্মেসিগুলো নিয়ন্ত্রণে না আসলে এবং জেনারেল প্র্যাক্টিশনার্স চিকিৎসকরা যতক্ষণ বিবেকবান না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে না। মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত না হয়ে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ও ভুল ব্যবহারে প্রতিরোধী জীবাণুর উদ্ভব ঘটছে। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ট্রেজারার ও বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান গতকাল বলেন, সব অ্যান্টিবায়োটিকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। জ্বর বা কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা ঠিক নয়। বর্তমানে দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ছে। যা খুবই উদ্বেগের ব্যাপার। কেননা মানুষ ডাক্তারদের পরামর্শ ছাড়াই এসব অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছে। কোনো রোগ ভালো করার জন্য কখন অ্যান্টিবায়োটিক দরকার তা বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ঠিক করবে। তারা যদি মনে করে এই রোগটার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দরকার তাহলেই অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন, অন্যথায় ব্যবহার করা ঠিক নয়। তা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্সও আছে, সেটা সম্পন্ন করতে হবে। গ্রামের মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ছে যা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!