শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ

কাঁঠালচাঁপার আর্তনাদে হারিয়ে যাওয়া প্রহর (১০ খণ্ড)

জাকির মোহাম্মদ:
বকুল আর আমার হঠাৎ যাওয়া আসা, দূরের স্বপ্নে বিলিন হতে হতে কখন সে যাবার যাত্রা নিয়মিত হয়েছিলো আজ আর মনে করতে পারছিনা। এরই মধ্যে চারদিক থেকে সুখবর আসতে শুরু করেছে। জবের ভাইবার ডাক। একেকটা ভাইবা দিলেই মনে হয় কাল পরশু ডাক আসবে জবের। আসি আসি করেও আসা হয় না। মাস্টার্সের পর থেকে চারদিকে হণ্যে হয়ে গেলাম। যা হোক একটা পেলেই হলো। অন্ততঃ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা যাবে। ভাবনার কোলাহলে কত শত স্বপ্নেরা উড়াল দিয়েছে রাতের পর রাত। সে রাতও ভোর হয়েছে। স্বচ্ছজলের মতো পরিস্কার আলো স্বপ্নের রঙ এতোটুকু ফিকে ভাবতে পারিনি কখনো। কেবল আলোকিত দেখেছি। সে দেখার দিগন্তে হারিয়ে আজ কতকিছু হাতে পেতে চাই। দূর অজানায় আজও সে সকল স্বপ্নেরা দৌড়ায় ম্যারথন দৌড়। ফেরদৌসির পরিক্ষা ঘনিয়ে আসে। আজকাল খুব একটা ফোনালাপ হয়ে ওঠে না। পরিক্ষার সময় নিজেই সেদিকে পা বাড়াই না। শেষ হোকনা পরিক্ষাটা কথা বলারতো অভাব হবে না। আড্ডাও হয়তো জমে জমে ক্ষির হবে। হবেনে তখন যখন পড়ালেখার সেই ক্রাইসিস মুহুর্তটি আর থাকবে না। সেই সকল সময়ের কথা ভেবে ভেবে দিশেহারা হই। মনে মনে অপেক্ষার প্রহর বাড়ে। কখনো কখনোবা দুয়েক মিনিট কথাও হয়। হু, হচ্ছে এরকম করে।

আগামিকাল থেকে পরিক্ষা আজ সিলেটে চলে আসবে ফেরদৌসি। বড় আপার বাসায় উঠবে। বিকালের ট্রেন ধরেছে। আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বকুল আর আমি ফেরদৌসির অপেক্ষা করছি স্টেশনে। এরকম অপেক্ষার প্রহর কত কেটেছে আমার এই স্টেশনে তার গল্প জানে ফ্ল্যাটফর্মের চড়ুই আর গরমে ভেজা শরীরের ঘাম। চড়ুই দম্পতি প্রায়ই নানা মান অভিমানে ব্যাস্ত থাকতো ফ্ল্যাটফর্ম জুড়ে। কত হাসির খলখলানি যে দেখেছি এই ফ্ল্যাটফর্মে তা কী সব বলা যায়, না কিছু না বলা কথা থাকুক অনন্ত বিস্ময় নিয়ে কেবল হৃদয়ের অতলান্তে। যার খোঁজ কোনদিন ফেরদৌসি পেলো না বলে ভ্রুক্ষেপ করিনি। আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে। কিন্তু যেদিন সেখানে এক মুঠো অহংকারের চূর্ণ পেলাম সেদিনইতো হারিয়ে গেলাম অজান দৈবঘরে। যেখানে কেবল আমার বাস। যার খবর জানেনা বকুল,জানার চেষ্টাও তো করেনি কোনদিন ফেরদৌসি। স্টেশনে ট্রেন থামলে এক ধরনের আনন্দ কাজ করে। তার তর্জমা সেদিন বুঝলাম। এর আগেও বুঝেছি, কিন্তু বাঁধভাঙ্গা আনন্দকে এতো কাছে থেকে দেখার আনন্দের কোন তুলনা হতে পারে না। আসলে হয়ই না। সে আনন্দকে বুকে ধরে ছুটে চলি বড় আপার বাসায়। আজ বড় আপার বাসায়ও আনন্দের মহাযজ্ঞ। দুলাভাই আর মাসুকতো একেবারে হাতভর্তি বাজার নিয়ে এসেছেন বাসায় সেই সন্ধ্যাতেই। বড় আপা সেগুলি খুটে খুটে রাখছেন। দেখছেন, ফেরদৌসির টেবিলে কয়েকটি গোলাপের প্রস্ফুটিত কলি রেখেছেন। যেন আনন্দের ষোলকলা আজ।

বাসায় ফিরে পার্লগেভস’র গুল্ডেন ট্রেজারি হাতে নিয়ে বসি। কতদিন কবিতা চর্চা হয়না। আজকের এই আনন্দদিনে কবিতা যদি নাই হয় তবে কবিতার প্রতি এতো প্রেমেরইবা কি হবে। বকুল ধমক দেয়। রান্না বাকি। রান্না করে দুনিয়ার সাহিত্য গবেষণা করো। সময়ের কাজ সময়ে। বাসা থেকে বের হবার আগে বলেছিলাম রান্না বান্নার কাজ শেষ করে বের হই। তখন বকুল বলেছিলো ঠান্ডা খেতে পারবো না, তখন নিজে বলেছিলাম তাইলে রান্নার কাজ তোর মনে রাখিস। সে হিসেবে পার্লগ্রেভস হাতে নিয়ে ছিলাম। সে যে ভুলে গিয়ে ধমক দেবে কে জানতো? হায়! বকুল। কবে যে নিজের মতো হবি সেটা যদি জানতাম। কত না ভালো লাগতো আমার। রান্নাবান্না আর খাবার টেবিল পেরিয়ে আমরা যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিই তখন রাতের তৃতীয় প্রহর। বেশ আরামেই চোখে ঘুম আসে। স্বপ্নের ঘুম আরামের হয় তাতো স্বাভাবিক ব্যাপার।
বকুলের ডাকে সকালের ঘুম ভাঙ্গে। মাথার উপরে যাবার আগের অবস্থা সূর্যের। ধবধবে আলোয় ধাঁধিয়ে যায় আমার চোখ। বকুল বলে পরিক্ষা শেষে ফেরদৌসি আসবে, কিছু রেডি করা যায় কিনা চিন্তা করে দেখো। ভ্রু কুচকে যায় আমার। বেড়াতে আসবে। বেড়িয়ে যাবে আড্ডা দেবো বাইরে রেডি করার কি আছে। আচ্ছা তবুও দেখি কিছু করা যায় কি না?

মহা আনন্দে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম। ফ্রিজে রাখা মাগুর মাছের ভুনা করার স্বাধ জাগলো। টমেটু উইথ মাগুর মাছের ভুনা। জিভে জল আসার মতো খাবার। রান্না করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো। পরিক্ষা শেষে ফেরদৌসি আজ আর বড় আপার বাসায় গেলো না। আমাদের এখানে চলে আসলো। আমরা আড্ডায় মজে গেলাম। ফেরদৌসির ক্ষিধা পেয়েছে খুব। রেডি করলাম টেবিলে খাবার। তরকারির ফ্লেভার ফেরদৌসির ভালো লেগেছিলো। মাগুর মাছের সাথে টমেটুর ভুনা সে প্রথম খেয়েছিলো মনে হয়েছে। তার কথায় সেটি স্পষ্ট ছিলো। আর রান্নার প্রশংসার কথা নাই বললাম।
এতো প্রশংসার খবর জানিয়েই বা লাভ কী? যার কথা জানাচ্ছি সেতো আজ উপস্থিত নেই পাশে। কোথায় আছে তাও আপাততো জানিনা। কেবল জানার পরিধি বেড়েছে, জেগেছে একরাশ বিস্ময় কেমন করে মানুষ বেঁচে থাকে অনিন্দিত সৌন্দ্যর্যের হাতছানি হারিয়ে, কেবল টাকাসুখের প্রত্যাশা বাড়িয়ে। পারে, মানুষ পারে বলেই জগতটাতে এতো বিস্ময় একসাথে তৈরী হয়। ঠিক সেখানে আশ্বিনের খোলা জানালা পরে, শীতের মৌমৌ গাম্ভীর্যে হারিয়ে যায় সময়। আমাদের সামনে পড়ে থাকে এক উচ্ছল বসন্তের দোয়ার।

চলবে…

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!