শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ

যে ঋণ গৌরবে বহমান

নুর উদ্দিন লোদী:
১৯৪৭ সালে শাসন মুক্ত হলেও শোষণ মুক্ত হতে পারেনি এই দুর্ভাগা বাঙালীরা। এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এই জনপদের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে যেসব গৌরবমন্ডিত আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তারমধ্যে অন্যতম ছিল নানকার বিদ্রোহ। বিয়ানীবাজার সদর থেকে প্রায় ৮ কিমি পশ্চিম এবং দক্ষিণের ভৌগলিক সীমানার শেষ প্রান্তে সুনাই নদীর তীরে অবস্থিত শানেশ্বর নামের একটি গ্রাম। শৈশব এবং কৈশোরে এই গ্রামের কৃষকদের সফলতার গল্প শুনে আসছি প্রবীণদের মুখে অনেক। কিন্তু কখনো আমার বিচরণ করতে পারিনি এই গ্রামে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় জননেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার করার সংগ্রামে এই জনপদের শহীদ হুমায়ূন কবির নাহিদ মতো সারা দেশে অসংখ্য শহীদের আত্মদানের বিনিময়ে ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে বিএনপি’র প্রহসনমূলক নির্বাচনকে প্রতিহত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচিত অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট-৬ আসনে এ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাই। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ হলো দলের সকল নেতাকমীর্রা প্রত্যেক ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাধীনতার প্রতীক নৌকার মার্কার জন্য ভোট ভিক্ষা চাইবেন। সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকমীর্রা নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে নিবেদিত রাখেন নিঃস্বার্থ ভাবে এবং নিজের ক্ষমতার পরিধি অনুযায়ী ভোট ভিক্ষা চাইতে লাগলেন সবাই। তারই ধারাবাহিক নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসাবে নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাইকে সাথে নিয়ে শানেশ্বর গ্রামে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে আমাদের যাত্রার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ করুন ছিল। গৌরবান্বিত সেই গ্রামে আমার জীবনের প্রথম বিচরণ। পুরো এলাকা ঘুরে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে আমার মনে হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় হত দরিদ্র মানুষের বসতি শানেশ্বর গ্রামে। মনে হলো, এই গ্রামেটি রাষ্ট্রের অবহেলিত একটি এলাকা। এই এলাকায় সরকারের নজর কখনো পড়েছে বলে মনে হয় না। তখন ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ছিল। দেখতে দেখতে যেন আবার পাঁচটি বছর বছর চলে গেল। ২০০১ সালে আবার জাতীয় নির্বাচিত অনুষ্ঠিত হবে। পুনরায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব নুরুল নাহিদ ভাই, সাবেক বিয়ানীবাজার উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক জনাব আব্দুল বারী ও সাবেক বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজের জিএস এনাম উদ্দিন ভাইয়ের নির্দেশে অতীতের সকল মান অভিমান ভুলে প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা কে পুনরায় সরকার গঠন করতে সহযোগিতা করে উন্নয়নের দ্বারা অব্যাহত রেখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নৌকা মার্কার বিজয় নিশ্চিত করতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আবার সেই শানেশ্বর গ্রামে। এই যাত্রায় নাহিদ ভাই ছিলেন আমার মোটর সাইকেলের যাত্রী। আগেই বলেছি, সদর উপজেলা থেকে প্রায় ৮ কিমি দূরত্ব, যেতে যেতে নাহিদ ভাইকে বললাম আপনার কি মনে আছে, ১৯৯৬ সালে এই এলাকায় আমরা কত কষ্ট করে আসছিলাম। আজকে আমরা গাড়ি চালিয়ে যেতে পারছি? উত্তরে নাহিদ ভাই বললেন, ‘লোদী, শেখ হাসিনার সরকার সারাদেশে যে কাজ করিয়েছেন, স্বাধীনতার পরে এতো কাজ কোন সরকার করে নাই এবং অবহেলিত গ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়নের যাত্রা শুরু করেছেন। ইনশাআল্লাহ যদি আওয়ামীলীগ আবার সরকার গঠন করে তাহলে বাংলাদেশ এমন কোন গ্রাম থাকবেনা যেখানে মানুষ গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবেনা এবং এমন কোন গ্রাম থাকবেনা যেখানে বিদ্যুতের নেই।’
নির্বাচনী প্রচারণার শেষে আমরা নাহিদ ভাইকে নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে সুনাই নদীর তীরে অবস্থিত শানেশ্বর বাজারে এসে পৌঁছি। সেখানে আজকের নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হবে। আস্তে আস্তে এলাকার মানুষ জড়ো হতে থাকলো। সবাই আওয়ামীলীগের এতো নেতা কর্মীদেরকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। কারণ বিগত পাঁচ বছরে আওয়ামীলীগের সরকারের মাধ্যমে যে উন্নয়ন হয়েছে তারা তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি হয়তো। এই এলাকায় আওয়ামীলীগ যথেষ্ট ভোট পেয়েছিল। যদিও ২০০১ সালে জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাই সিলেট-৬ আসনে সংসদ সদস্য হতে পারেননি সেটা ছিল ভিন্ন বিষয় (নিজের ইউনিয়নে আশানুরূপ ভোট পাননি ২০০১ সালের নির্বাচনে, যার ফলাফল এখনো উপজেলা নির্বাচনী অফিসে সংরক্ষিত আছে)। ২০০৭ সালে সিলেট অঞ্চলে অধিকাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে, লন্ডন প্রবাসী বর্নমাউথ (Bournemouth) এলাকার আমার কয়েক জন বড় ভাই ও বন্ধুগণ গনমাধ্যমে খবরটি দেখে বন্যাদুর্গত অসহায় মানুষের জন্য সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন। আমি দেশে ছুটিতে ছিলাম এবং আমার সাথে যোগাযোগ করেন তাদের সাহায্য বন্যাদুর্গত এলাকার অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করে দিতে। আমিও যুক্ত হলাম তাদের সাথে। আমাদের এই অঞ্চলে সব চাইতে বন্যাদুর্গত এলাকা ছিল সেই শানেশ্বর গ্রামটি, এই গ্রামের সকল ফসলের জমি তলিয়ে গেছে পানির নিচে এবং এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষই দিন মজুর। প্রায় ২০০ বন্যাদুর্গত পরিবারের মধ্যে এক সপ্তাহ চলার মতো একটি ত্রাণ সামগ্রীর ব্যাগ হাতে তুলে দিতে সক্ষম হলাম। এই মহতি কাজে আমাকে যারা সহযোগিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বর্তমান উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব আতাউর রহমান খান এবং সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী আব্দুল ওয়াদুদ ভাই । আগেই বলেছিলাম ১৯৪৭ শাসন মুক্ত হলেও শোষণ মুক্ত হতে পারেনি এই দূর্ভাঘা বাঙালী। বৃটিশ শাসনামলে সব চাইতে নিকৃষ্টতম শোষণ পদ্ধতি ছিল নানকার প্রথা। সেই সময় প্রজারা জমিদারের দয়ায় কিছু জমি ভোগ করত। কিন্তু এই জমির ওপর কোন অধিকার ছিল না তাদের এবং প্রজারা বিনা মজুরিতে জমিদারের বাড়িতে কাজ করতে হতো। শুধু তাই নয় নানকার নারীদেরকেও ভোগের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতো। নানকার প্রজারা আস্তে আস্তে মুক্তির উপায় খুঁজতে থাকে এবং ধীরে ধীরে আন্দোলনের পথে অগ্রসর হয়, তখন সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানার অনেকে নানকার আন্দোলনে অংশ নেয়। তবে নানকার বিদ্রোহের মূল কেন্দ্রভূমি হলো বিয়ানীবাজার থানার শানেশ্বর গ্রাম। লাউতা ও বাহাদুরপুরের জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নানকাররা জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ১৯৪৯ সালের ১৮ই আগস্ট সূর্যোদয়ের আগে তৎতকালীন সরকারের পুলিশ ও জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। পরে নানকাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে মুখোমুখি হয় শাসক গোষ্ঠীর পেটোয়া বাহিনী বিরুদ্ধে সুনাই নদীর তীরে। জন্ম নেয় এক নির্মম ইতিহাস। রণক্ষেত্রেই নিহত হন শানেশ্বর গ্রামের ছয় বীর সেনা- ব্রজনাথ দাস (৫০), কুটু মণি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৫০), রজনী দাস (৫০), অমূল্য কুমার দাস (১৭)। তাদের রক্ত স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল শানেশ্বর গ্রামের মাটি আর সুনাই নদীর জল সহ সারা বাংলাদেশে। পরে এই বিদ্রোহের কারণেই বিলুপ্ত হয়েছিল নানকার প্রথা। এর পরে বাংলাদেশে যত আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছিল সব আন্দোলনের প্রেরণার মিছিলে ছিলো নানকার শহীদ ছয় বীর সেনারা। কিন্তু বড়ই আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘ পাঁচ যোগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই বীর সেনাদের স্মৃতি সংরক্ষণে জন্য কিছু করা হয়নি।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় বঙ্গকন্যার রাষ্ট্র পরিচালনার বিয়ানীবাজার মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ডের প্রচেষ্টায় স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠিত হয় বীর কৃষক যোদ্ধাদের জন্মস্থান শানেশ্বরে। তাদের বীরত্ব গাথা আগামী প্রজন্মের কাছে অমর করে রাখতে। ১৮ই আগস্ট ২০১৬ মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ডের উদ্যোগে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানকার শহীদদের নিয়ে একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমার উপস্থিতির কারণ হিসেবে বলা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক কমান্ডের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটি এবং আমি উক্ত সংগঠনের সাথে প্রতিষ্ঠিতালগ্ন থেকে সম্পৃক্ত। তবে একটি কথা বলতেই হয়, যেতে যেতে এলাকার যে উন্নয়নের পরিবর্তন চোখে পড়ছে তাতে মুগ্ধ আমি। গ্রামের ছোট বড় সবগুলো রাস্তা পাকা, বঙ্গকন্যার স্বপ্নের বাংলাদেশে এই গ্রামের চিত্র দেখলে বুঝা যায় উন্নয়নের মহাসড়ক আজ এদেশের অজপাড়া গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শানেশ্বর গ্রামের প্রবীণ মানুষের মুখে ছয় বীর সেনাদের নিয়ে যে আলোচনা শুনতে পেলাম তাতে নানকারদের ইতিহাস জানার প্রচুর আগ্রহ বেড়ে গেল। ইতিহাস থেকে জানতে পারলাম ১৯৩৭ সালের নানকার প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা মাধ্যমে। ১৯৪৯ সালের ১৮ই আগস্ট জমিদারদের পোষা পেটোয়া বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নানকার আন্দোলনের অন্য তম নেত্রী অন্তঃসত্ত্বা অর্পণা চৌধুরীর ঘটনাস্থলে গর্ভপাত ঘটে। এই এলাকার মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি আজও আমার স্মৃতিপটে অমলিন। সুনাই নদীর তীরে অবস্থিত ছোট একটি শানেশ্বর বাজার। সেখানকার শত গজের ব্যাবধানে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলমানদের মসজিদ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরসহ অবস্থান দেখে মনে হলো, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায়, এই এক টুকরো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
লেখক সদস্য, এনআরবি সাপোর্ট গ্রুপ ইউকে
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!