শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

পরলে ভালো করে পরেন, না পরলে খুলে ফেলেন

কামরুন নাহার:
ইদানীং হিজাব পরা কালচার বেশ জনপ্রিয় । আর সেই হিজাবের ফাঁকিটা ফেসবুকের কল্যাণে খোলামেলা । হিজাব পরা ছাত্রীটিকে দেখি ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে হিজাব খুলে প্রেমিকের বগলদাবা হয়ে ঘুরছে । বোরকার লেবাস পরে বা মাথায় বেশ কায়দা করে হিজাব পরে সবার সামনে ঘুরে বেড়ালেও অনেকে পাহাড়ে বা সমুদ্রে গিয়ে বেশ হট ড্রেস পরে ছবি তুলে তা ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছেন । যারা হিজাব পরা আপনাকে রোজ দেখেন তারা যখন আপনার এমন ছবি দেখেন তখন তাদের মনে হিজাব এবং আপনি দুই ব্যাপারেই নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি হয় । আমার অন্তত হয় ।

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম তখন হাতেগোনা কয়েকজনকে দেখেছিলাম বোরকা পরতে । বোরকা ছাড়া আলাদা করে হিজাব ব্যবহার করা কাউকে আমি পাইনি । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষের দিকে দু -একজনকে দেখেছিলাম খুব ইন্টেনশোনালি বোরকা পরছে – সেই ইন্টেনশন অবশ্যই ধর্ম কর্ম নয় ( কী সেটা বুঝে নেন সবাই ) ।

আমি আমার মা, খালা, ফুপু, চাচী সবাইকেই ছোটবেলা থেকে কালো বোরকায় আবৃত অবস্থায় দেখে এসেছি, এখনও দেখছি । ওনারা সবাই পরহেজগার; পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা এমনকি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া মানুষ তাঁরা । আর বোরকাটাও তাঁদের সেই ধর্ম কর্মেরই অপরিহার্য অংশ ছিলো, আছে এবং ওনারা সবাই যতদিন বাঁচবেন তাই থাকবে । আমাকে দেখে কেউ আঁচও করতে পারবেন না আমার মা কোন লেভেলের পরহেজগার নারী ছিলেন । চিকিৎসার জন্য দেবী শেঠীর কাছে ওনাকে নিয়ে যেতে না পারার অন্যতম কারণ ছিলো তিনি পুরুষ । দেবী শেঠীর উদাহরণটা দিলাম ধর্মের প্রতি ওনার নিজেকে সঁপে দেবার কাঠিন্যটুকু বুঝাতে । তাই আমার কাছে ছোটবেলা থেকেই বোরকা পবিত্র পোশাকের একটা সিম্বল যেটা ধর্মে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিতে পারলেই পরা উচিত – কারণ তাহলেই শুধু ‘পর্দার’ সত্যিকার মাহাত্ম্য খুঁজে পাওয়া যায় ।

কিন্তু বেশ লম্বা সময় ধরে আমি বোরকা আর হিজাবের তথা পর্দার যে ব্যবহার দেখছি তাতে মর্মাহত হই খুব! ভাবছেন আমার মতো পর্দাহীন মেয়ের মুখে এসব কী কথা! শোনেন নতুন করে কিছু পুরনো গল্প বলি। একবার বাড়ি যাচ্ছি । জ্যামে বসে আছি । হঠাৎ পাশে একটি মোটর বাইক এসে থামলো । বাইকে বোরকা পরা একটি মেয়ে আর একটি ছেলে। হটাৎ মেয়েটি বাইক থেকে নামলো । নেমেই বোরকাটা খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার বাইকে বসে পড়লো । বসে বসে দেখলাম আর বিস্ময়ে অভিভূত (!) হলাম। এমন ঘটনা আমি এবং অনেকেই অনেকবার ঘটতে দেখেছেন, আমি বিশ্বাস করি। পরিচিত, খুব টাইসটুইস করা একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষের দিকে দেখলাম হঠাৎ বোরকা পরে বেশ ধার্মিক ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । ঘটনা কিছু একটা আছে বলে মনে হলো । দেখলাম আসলেও তাই । শেষের দিকে তার প্রেম হয়েছিলো এবং প্রেমিক তাকে রোজ নিতে আসতো । বোরকা পরা থাকলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায় … মা-বাবা ‘মাশাআল্লাহ মেয়েটা আমাদের সোনার টুকরা হয়েছে ‘ এই ভেবে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ফেলেন আর মেয়েও সবার কাছ থেকে লুকিয়ে দিব্যি শুধু চোখ দুটো বের করে প্রেমিকের সাথে বাইকে ঘুরে বেড়াতে পারে । প্রেম খারাপ আমি বলছিনা …… কিন্ত সেটাকে লুকানোর জন্য বোরকার আশ্রয় নেয়া জাস্ট নিতে পারিনা ।

সময়ের হাত ধরে বোরকাতেও এলো বিবর্তন । আসলো বডি ফিটিং বোরকা; ৩৬-২৪-৩৬ এর এক্স্যাক্ট ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস একেবারে ট্রান্সপারেন্ট বোরকায় । মেয়েদের মধ্যে সেই বোরকা কিনে পরার হিড়িক লেগে গেলো । মাথায় উপরের অংশটা খুব সুন্দর করে সুন্দর সুন্দর ক্লিপ দিয়ে টাইট করে পরছে সবাই । সেই কাপড় গলা থেকে আর নিচে নামানো যায়না টেনে । সালোয়ার কামিজ বা শাড়িতে শরীরের যতোটুকু প্রদর্শিত হতো এই বোরকায় তার দ্বিগুণ বা বলা চলে পুরোটাই হতে থাকলো। কী পর্দা হয় এই বোরকা পরে আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

আমি পর্দার বিপক্ষে না কিন্তু পর্দা করার মতো পর্দা করেন । যদি ধর্মের জন্য পর্দা করেন তাহলে ঠিকঠাক নামাজ-রোজা করে, ঠিকঠাক বোরকা পরে, পর্দা করে সত্যিকারের ঈমানদার হোন । এখন আপনার প্রশ্ন জাগবে নামাজ পড়িনা বলে কী পর্দা করে নিজেকে রক্ষা করবোনা? মনে রাখবেন বোরকা পরা মেয়েও কিন্তু ধর্ষণ থেকে রক্ষা পায়না । যে খারাপভাবে দেখার সে তার দুচোখ দিয়ে আপনার বোরকা আবৃত বডিও স্ক্যান করে ফেলবে । আপনি বোরকা পরেও রক্ষা পাবেন না । কিন্তু নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকার একটা ব্যাপার আছে। আপনি বডি ফিটিং বোরকা পরে ক্লাশে যাবেন , কাজে যাবেন , প্রেমিকের বগলদাবা হয়ে ঘুরবেন আর কর্মক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে হিজাব ফেলে, স্কিনটাইট গেঞ্জি পরা ছবি ফেসবুকে আপলোড দেবেন আর সেই ছবিতে ‘লুকিং হট’ টাইপ কমেন্ট পড়লে আপনি একজনকে তার নজর ঠিক করতে বলবেন তাহলেতো আর নিজেকে রক্ষা করা হলোনা, পর্দা হলোনা। যেটা পরবেন সেটা ঠিক করে পরেন । হিজাবটা পরলে সেটা পাহাড়ে গিয়েও পরেন, সাগরে গিয়েও পরেন ।

মনে রাখবেন আপনার চুলের রঙ দেখে মুগ্ধ হতে হতে আপনাকে নিয়ে দুই লাইন কবিতা লিখে ফেলবে বা আপনার বুকের ভাঁজ দেখার জন্য সবসময় উৎসুক হয়ে থাকবে এতো সময় আপনার সহকর্মীর নেই । যে পোশাকটি পরছেন সেটিই সুন্দর করে পরুন; হিজাব-বোরকা কিচ্ছু লাগবেনা। নিজেকে যেদিন সম্পূর্ণরূপে ধর্মের কাছে সঁপে দিতে পারবেন সেদিনই বোরকা পরবেন, পর্দা করবেন এছাড়া এই পর্দা নামের ভণ্ডামি করা থেকে বিরত থাকুন।
লেখক: কামরুন নাহার, সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট।

(সুরমানিউজ’র কলামে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় সুরমানিউজ বহন করবে না। সুরমানিউজ’র কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
632Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!