রবিবার, ২২ জুলাই, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
সিলেট নগরে নৌকা মার্কার জোয়ার উঠেছে : আসাদ উদ্দিন  » «   শাল্লায় ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের উপজেলা পর্যায়ে প্রথম সম্মেলন  » «   কমলগঞ্জে শতভাগ পাশ শমশেরনগর বিএএফ শাহীন কলেজ  » «   এবার ব্যর্থ হয়ে ফিরলেন আরিফ, কামরান বললেন ‘নাটক’  » «   কমলগঞ্জে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে স্বামী আটক  » «   সিলেটে যুবলীগ নেতার রেস্টুরেন্টে শিবিরের হামলা  » «   নৌকা প্রতীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে শফিকুর রহমানের গণসংযোগ  » «   ২ কর্মীকে ছাড়াতে পুলিশ কার্যালয়ের সামনে আরিফসহ বিএনপি নেতাদের অবস্থান  » «   বাংলাদেশি যেসব পেশাজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হলো আরব আমিরাত…  » «   একসঙ্গে ৬ মৃত সন্তান প্রসব মৌসুমীর  » «  

কমলগঞ্জে বন্যাক্রান্ত মানুষের চরম দুর্ভোগ : পানিবন্দিদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী

স্বপন কুমার দেব, মৌলভীবাজার:
ধলাই ও মনু নদীর একাধিক স্থানে বাঁধ ভেঙে গত পাঁচদিনের ভয়াবহ বন্যায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে শিশুসহ ৫ জন মারা গেছেন। সহস্রাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পাঁচশতাধিক টিউবওয়েল অকেজো অবস্থায় রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়া প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

বন্যায় আটকা পড়া লোকদের উদ্ধারে সর্বশেষ কয়েকটি স্থানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় সেনাবাহিনী। সরকারি ও বেসরকারি মৎস্য প্রদর্শনী খামারসহ দেড় হাজারেরও বেশি পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। ১৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১২৫০ টি পরিবারের সদস্যদের আশ্রয় নেয়া প্রায় ছয় হাজার মানুষকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংস্থা রান্নাবান্না করে ও শুকনো খাবার বিতরণ করছে। পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধার কার্যক্রমে রোববার থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তৎপরতা শুরু করেছেন। বন্যাক্রান্ত এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটেশন এর যখেষ্ট অভাব রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ কার্যক্রম চলছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ধলাই নদীর ৮টি স্থান দিয়ে ভাঙন দেখা দেয়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যায় ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর, মাধবপুর, কমলগঞ্জ সদর, পৌরসভা, শমশেরনগর, রহিমপুর, মুন্সীবাজার ও পতনঊষার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় বাড়িঘরে চার থেকে পাঁচ ফুট পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত হয়। এসব এলাকার প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। চারদিনের বন্যার প্রবল স্রোতে কমলগঞ্জ উপজেলার কাঠালকান্দি গ্রামের আব্দুল ছত্তার (৫০) ও তার ছেলে আব্দুল করিম (২৫), আলীনগর বস্তির পরিবহন শ্রমিক সেলিম মিয়া (৩৮), শমশেরনগর ভাদাইরদেউলের প্রতিবন্ধি রমজান আলী (৪০) ও রহিমপুর ইউনিয়নের প্রতাপী গ্রামে মিছির মিয়ার দেড় বছর বয়সি শিশু সন্তান ছাদির মিয়া পানিতে ডুবে মারা যান। পানির স্রোতে ভারতের কৈলাশহরে যাতায়াতে শমশেরনগর-চাতলাপুর সড়কে কালভার্ট ব্রিজ ধ্বসে পড়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। শমশেরনগর-মৌলভীবাজার, শমশেরনগর-কুলাউড়া সড়ক যোগাযোগ তিনদিন বন্ধ ছিল। আদমপুর, পৌরসভা, মুন্সীবাজার, পতনঊষার সহ বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা, আধাকাঁচা প্রায় সহস্রাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সীবাজার ইউনিয়ন সহ উপজেলায় ১৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয় এবং এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আসা লোকদের মধ্যে সরকারি, বেসরকারি, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে রান্না করা খাবার ও শুকনো খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বন্যার শুরু থেকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে নৌকা ও স্পিডবোট না থাকায় বেশ কিছু পরিবার বাড়িঘরে পানিতে আটকা পড়ায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্যায় আটকা পড়া লোকদের উদ্ধারে সর্বশেষ কয়েকটি স্থানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় সেনাবাহিনী টিম।

গত শনিবার বিকাল থেকে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার, মুন্সীবাজার, রহিমপুর, ইসলামপুর, কমলগঞ্জ পৌরসভা, শমশেরনগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ ড. মো: আব্দুস শহীদ বন্যা দূর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেন। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের নেতৃত্বে গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় নৌকাযোগে পতনঊষার ইউনিয়নের আহমদনগর দাখিল মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া বন্যাক্রান্ত তিনশত লোকের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, মুন্সীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জুনেল আহমদ তরফদার, সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান, সাংবাদিক প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, সমাজসেবক হামিদুল হক চৌধুরী বাবর, স্থানীয় ইউপি সদস্য এখলাছুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ড. মো: আব্দুস শহীদ এমপি’র উদ্যোগে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কমলগঞ্জে বিভিন্ন বন্যা দুর্গত এলাকায় শুকনো খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখছেন। এছাড়া কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো: জুয়েল আহমদ ও ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা দুর্গতদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। ঢাকার ব্যবসায়ী মুহিবুর রহমান, মুন্সীবাজারের ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন, জেলা পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দীন, মুন্সীবাজার-রহিমপুর দরিদ্র কল্যাণ ট্রাষ্ট, কমলগঞ্জ সমাজ কল্যাণ পরিষদ, মীর্জাপুর নবীন সেবা সংঘসহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই পানিবন্দি গ্রামে গিয়ে ও আশ্রয় কেন্দ্রে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। যুক্তরাজ্য প্রবাসী নাজমুল ইসলাম ইমনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের এদিকে উপজেলার নব্বই শতাংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মৎস্য প্রদর্শনী খামারসহ প্রায় ১,৫৫০টি পুকুর প্লাবিত হয়। ভেসে যাওয়া মাছ ও পোনার পরিমাণ প্রায় ৪৭০ মে.টন। খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা এবং মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় চার কোটি বিশ লক্ষ টাকা বলে মৎস্য অফিস সূত্র নিশ্চিত করে। এছাড়া প্রায় তিন হাজার হেক্টর আউশ ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক পানিতে ডুবে শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ পর্যন্ত উপজেলায় সহস্রাধিক কাঁচা ঘর সম্পূর্ণ ও আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর মেরামতে সরকারিভাবে বরাদ্ধ প্রদান করা হবে। তিনি আরও বলেন, নিহত পরিবারদের ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া সবকটি আশ্রয় কেন্দ্র ও বন্যাপ্লাবিত লোকদের মধ্যে অব্যাহতভাবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি ও ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরো জানান, বন্যাক্রান্ত কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের রোববার থেকে মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন উজানে ভারতীয় অংশে বৃষ্টিপাত না হলে বন্যা পরিস্থিতির পর্যায়ক্রমে উন্নতি হবে।

মৌলভীবাজারে বন্যার ভয়াবহ অবস্থা দেখুন নীচের লিঙ্কে-

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!