শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বিলাতে সিলেটের বিজয়গাঁথা

লন্ডন অফিস:

ভারতীয় উপমহাদেশের ছোট্ট একখণ্ড ভূমি পদ্মা ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটা বদ্বীপ ‘বাংলা’। ২৫০টির বেশি নদ-নদী ও ১ হাজারের বেশি মোহনা নিয়ে এই বাংলা সারা দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় বদ্বীপ। এই ভূমিতেই বসবাস করে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগত জনগোষ্ঠী বাঙালি জনগোষ্ঠী। হান জাতিগোষ্ঠী (চায়নিজ) ও আরব জাতিগোষ্ঠীর পর পৃথিবীর কোথাও এত বড় এথনিক গ্রুপ আর নেই।

বাংলার জনগণ আর ব্রিটিশদের সম্পর্ক সেই ষোড়শ শতাব্দী থেকে—ভারতীয় ব্রিটিশ কলোনির গোড়াপত্তন ঐতিহাসিকভাবে হয়েছিল বাংলা থেকে সেই ১৭৫৭ সালের বর্ষাকালে, পলাশীর আম্রকাননে। তারও ১০০ থেকে ১৫০ বছর আগে ব্রিটিশ বণিকেরা মসলিন-পাট-মসলা-ধনিয়া-ডাল-চাল-আফিম-নীল-গাঁজা-খদ্দর কাপড় আমদানি-রপ্তানির কাজে ছিল বাংলায়।

১৭৫৭ সালে এসে ওদের ঔপনিবেশিকতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তারপর থেকে শুরু হয় বাংলা ও ব্রিটিশ সম্পর্ক, যা আজও অটুট আছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম বিশাল প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি—লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত। শেয়ারবাজারে তার শেয়ার খুবই চড়া দামে লেনদেন হতো ওই আমলে। এই ছোট্ট কোম্পানিটা তখন শাসন করত প্রায় ৭৫ ভাগ মোগল সাম্রাজ্যকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এতই বিশাল এবং এতই ছিল তার প্রতিপত্তি, ১৭০০ সালে স্বয়ং ব্রিটিশ সরকারকে সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঋণ দিত। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এত টাকার প্রধান উৎস ছিল তখনকার বেঙ্গল গোল্ডেন।

সরীসৃপের মতো আঁকাবাঁকা বাংলার নদ-নদীতে ভারী মালামাল বহনের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা-বজরা এবং পাল তোলা ছোট জাহাজ। খরস্রোতা নদীগুলোতে উজানে পাল তোলা নৌকা আর গুণ টেনে সরবরাহ পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তখনই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চালু করতে লাগল বেঙ্গলে জাহাজ বানানো শিল্প, বাংলার তৎকালীন যানবাহন ও মালামাল বহনের ব্যবস্থাকে উন্নত করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবদান অনস্বীকার্য। এগুলো সবই হয়েছে ১৭৫৭ ও ১৮৬০ সালের আগে। সিলেট ইস্ট কোম্পানির অধীনে আসে ১৭৭৫ সালের দিকে। জৈন্তা-খাসিয়াদের পরাজিত করে ১৮৩৫ সালে তারা সিলেট দখল করে। ব্রিটিশ পতাকাবাহী নদীমাতৃক জাহাজগুলো বানানো হতো তখন ইংল্যান্ডের পাইন আর ওক কাঠ দিয়ে, যার আয়ুষ্কাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। অনেক ভেবেচিন্তে ব্রিটিশ বাংলার মেহগনি ও আসামের আর পার্বত্য চট্টগ্রামের সেগুন (টিক) দিয়ে বানানো শুরু করল নদী ও সমুদ্রগামী কাঠের পাল তোলা নৌকা ও জাহাজ। মেহগনি ও টিকের বানানো জাহাজের আয়ুষ্কাল ব্রিটিশ কাঠের চেয়ে কম করে হলেও ১২ থেকে ১৫ বছর বেশি হতে লাগল।

ঐতিহাসিক ওই সব পাল তোলা নৌকা ও সমুদ্রগামী জাহাজগুলো চাঁদপুর-ভৈরব-সিলেট-করিমগঞ্জ হয়ে মেঘনা-সুরমা-কুশিয়ারা-বরাক নদীতে উজান বেয়ে পৌঁছে যেত বর্তমান আসামের শিলচরে। চাঁদপুরে এসে কোন কোন জাহাজ চলে যেত বার্মার রেঙ্গুনে আর বাকিগুলো চলে যেত কলকাতার হুগলি বন্দরে। নিত্য আসা-যাওয়ার নদীপথ।
১৮১২ সালে বাংলায় নির্মিত ‘বেঙ্গল মার্চেন্ট’ জাহাজ ১৮২৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পতাকা মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। নোঙর গেড়েছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবারে, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন, অকল্যান্ড, ক্রাইস্টচার্চ বন্দরে, লন্ডন, লা হারভে হয়ে ১৮২৭ সালে শেষবারের মতো নোঙর গেড়েছিল স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো পোর্টে।
দিনে দিনে সিলেট শহরের পাশেই গড়ে উঠল নদীবন্দর। উজানে যাওয়ার আগে সবচেয়ে বড় শহর। এভাবেই সবার অজান্তে সিলেট এলাকার হাঁটে, ঘাটে, হাওরের বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা, যুবকেরা সন্তর্পণে চাকরি নিতে থাকে ওই সব জাহাজে আর বিশাল বিশাল নৌকায়, সিলেট-শিলচর-চাঁদপুর রুটের জাহাজগুলোতে।

এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে, সিলেট শহরে বন্দর নামের সেই বিশাল নদীবন্দর, চালের জন্য চালিবন্দর দাঁড়িয়ে আছে আজও কালের সাক্ষী হয়ে, দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের ঐতিহ্যকে বুকে নিয়ে। সিলেট শহরের চাঁদনি ঘাট নদীবন্দর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রিত্তিমপাশার নবাবেরা।

১৮৯৭ সালের বিশাল ভূমিকম্প সিলেট শহরের ৯৫ ভাগ বাড়ি-দালান-কোঠা-মাটির ঘর ধূলিসাৎ করে দেয়। শুরু হলো জরিপ। ব্রিটিশরা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে উন্মোচন করল ডাউকি ফল্ট নামের এই জায়গায় একটা ভূমিকম্প হওয়ার তথ্য। ভূকম্পীয় জরিপের ফলাফল আবিষ্কার করল, নাম দিল ডাউকি ফল্ট। ইতিমধ্যে সিলেট ক্রমাগত ওদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। এই সিলেটেই ব্রিটিশরা চীন থেকে আনা চায়ের প্রথম চা–গাছ রোপণ করার চিন্তা করল। মালনীছড়াতেই উপমহাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা–বাগান শুরু করল ১৮৫৭ সালে।
কিন্তু ভূমিকম্পের ভয় ও তাদের এত বড় পুঁজি বিনিয়োগ যাতে লোকসানে পরিণত না হয়, সে জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও সিলেট বা আসাম অঞ্চলের অভিজাত পরিবারগুলোর সদস্যরা রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রিদের দিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বানানো শুরু করল হালকা ওজনের ঘরের বেড়া, যা নাকি ভূকম্পনে কম জানমালের ক্ষতি সাধন করবে। সেই ঘরবাড়ির অর্ধেক বেড়া হালকা ও পলেস্তারা করা এবং বাকিটা কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে চার কোনায় বড় বড় কাঠের খুঁটি ও ওপরে হালকা ওজনসমৃদ্ধ চাল। অনেকটা ব্রিটেনের টিউডর আমলের ঘরের নকশা অনুসরণ করে। ওদের জরিপ বলল, এই এলাকায় ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা অনেক, যাতে করে ডাউকি ফল্টের কারণে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পে বড় ধরনের জানমালের ক্ষতি হয়। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতেও দেখা যেত, ওই সব বাড়ি শোভা বৃদ্ধি করছে সিলেট অঞ্চলের। আর সঙ্গে সঙ্গে সিলেটের উৎপাদিত চা নৌকা-জাহাজে করে চলে যেতে লাগল সিলেট-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-রেঙ্গুন-কলকাতা-লন্ডনে। ক্রমে সুরমা-কুশিয়ারা-মনু নদীর উপত্যকায় সিলেট-তামাবিল-জুড়ী-বড়লেখা-ছোটলেখা-লাতু-কুমারশিল-করিমগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা-সাতগাঁ-রশিদপুর-চাতলাপুঞ্জি-

মৌলভীবাজার হয়ে শ্রীমঙ্গল থেকে সেই তেলিয়াপাড়া পর্যন্ত ৫৭ হাজার হেক্টর এলাকায় গড়ে উঠল কয়েক শ চা–বাগান। সিলেট পরিণত হলো বিদেশিদের পর্যটন ও পুঁজি বিনিয়োগের তীর্থস্থান হিসেবে। বিশ্ববিখ্যাত স’ অয়ালেস, জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদার্সের মতো বহুজাতিক কোম্পানি চা–বাগানে অর্থ লগ্নি করতে শুরু করল। সিলেটের অনেক অভিজাত পরিবার এবং প্রিত্তিমপাশার নবাবেরাও পিছিয়ে থাকলেন না। রুঙ্গিছেরা টি এস্টেট ছিল নবাবদের। চা রপ্তানিতে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর বিভিন্ন পদে চাকরি হতে থাকল সিলেটের বেকার শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত যুবকদের। এভাবেই আস্তে আস্তে পাল তোলা জাহাজ থেকে জেমস ওয়াট সাহেবের বানানো স্টিম ইঞ্জিনচালিত জাহাজ স্বয়ংক্রিয় মেশিনচালিত হয়ে সিলেটের উজান থেকে বয়ে আনতে লাগল চা, কাঠ-পাথর ও খনিজ পদার্থ। নিয়োগ পেতে থাকল সারেং, বইঠাওয়ালা, খালাসি ও লস্কর। সিলেটের এরাই সম্ভবত প্রথম সিলেটি, যারা প্রথম পদার্পণ করতে শুরু করল ভিনদেশের মাটিতে; সিলেটের রাষ্ট্রদূত হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল—পুরোনো সিল্ক রুটের নতুন যানবাহন-জাহাজের জাহাজি হিসেবে।

ওই সব লস্কর এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে নোঙর গাড়তে গাড়তে একদিন বিবাগীর মতো বিদায় দিল তাদের সেই রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পেশাকে। আবাসন গড়ড়ে শুরু করল স্বপ্নের শহর, যার নাম তারা শুনে এসেছে জন্মের পর থেকেই। এক নাম, এক দেশ, এক আশা, এক ভরসা, চোখধাঁধানো বিশাল বিশাল অট্টালিকা, কারুকার্যমণ্ডিত অপরূপ ভাস্কর্য, পিচঢালা পথ, পোশাকে পরিচ্ছন্নতা, ব্যস্ত এক মহাজাতির জনপদ লন্ডন বাংলায় যার পরিচিতি ‘বিলাত’ নামে, যেখানে পদচারণ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের। চিরতরে নোঙর গেড়ে আমাদের সিলেটের সেসব উচ্চাভিলাষী লস্কর বিলাতে আবাস গড়ল। আজও সিলেট অঞ্চলে অনেকেরই নামের পদবি লস্কর। শুরু হলো আন্দোলন, শুরু হলো ‘ভারত ছাড়ো, ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। এরই মধ্যে শুরু হলো প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সিলেট অঞ্চলের ওপর নেমে এল সীমারের খঞ্জরের চেয়েও ধারালো দেশভাগের খঞ্জর। কারও শোবার ঘর পূর্ব পাকিস্তানে-রান্নাঘর ভারতে, গোয়ালঘর আর গরু পূর্ব পাকিস্তানে আর তার গরুগুলো দিয়ে হাল চাষ করার জমি নো ম্যান্স ল্যান্ডে। বিতর্কিত জায়গায় হওয়ায় জমির মালিক হাল চাষ করতে পারছিলেন না তাদের বাপ-দাদার জমিতে।

জগদ্দল পাথরের বোঝা নেমে এল যেন এই অঞ্চলে শুরু হলো গণভোট। কিন্তু অত সব ঝক্কি–ঝামেলার মধ্যে বহাল তবিয়তে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল লস্কর পরিবারগুলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একদা সূর্য অস্ত যেত না, এত বিশাল ছিল তার ব্যাপ্তি। নাৎসি জার্মানিকে পরাভূত করতে গিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতি পর্যুদস্ত। মিল কারখানায় যুদ্ধে অনেক পুরুষ নিহত হওয়ায় ফলে শ্রমিকের অভাব-অর্থনীতি নতজানু অবস্থা, তার নতুন উটকো ঝামেলা রাশিয়ান কমিউনিস্টদের নতুন সাম্রাজ্যবাদী স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে ত্রাহি অবস্থা। কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ক্রমাগত নতুন নতুন উপনিবেশ স্বাধীনতা দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকল ব্রিটেন। ঔপনিবেশিক রাজ্য থেকে রাজস্ব আসা বন্ধ হতে থাকল দিন দিন।

সিলেট অঞ্চলে জনশ্রুতিতে বলা হয়, ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাদের দেশে আসার জন্য ওয়ার্ক পারমিটের সুযোগ দিয়েছিল। গ্রাম, গঞ্জ, শহরে, বন্দরে ও হাওরে হইহই কাণ্ড রইরই ব্যাপারের মতো লোকজন, যুবক, ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, কৃষক—সবাই সেসব সচ্ছল লস্কর পরিবারদের মতো স্বাবলম্বী জীবনযাপনের নেশায় মেতে উঠল বিলাতে যেতে। শুরু হলো স্মরণকালের সবচেয়ে বড় এক্সোডাজ (প্রস্থান)। সিলেটের গ্রাম-গঞ্জ, হাটবাজার শূন্য করে দলে দলে লোকজন পাড়ি জমাতে লাগল বিলাতে।

বাঙালির প্রিয় অভ্যাস আড্ডা, গল্প, সারা রাত পালা গান, জারি, সারি, পুঁথি, যাত্রা নাটক, হাসন রাজার গান গাওয়া—এসব পার্থিব মোহকে পেছনে ফেলে এক স্যাঁতসেঁতে আঁধার কালো, কনকনে ঠান্ডা, কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভোরে পদার্পণ করল বিলাতের মাটিতে। নেই কেউ পরিচিত, নেই কোনো আত্মীয়স্বজন। শুধু রাতারগুলের বেতের বানানো একটি স্যুটকেস বগলদাবা করে চলে আসল বিলাতে। না জানে এক লাইন ইংরেজি, না জানে নিয়মকানুন, না বুঝে কথা বা ভাষা। বৈরী পরিবেশ, কনকনে শীত, সূর্যবিহীন আকাশ, ঠান্ডার প্রকোপে কুপোকাত, বর্ণবৈষম্য, বিমাতাসুলভ আচরণ ও নাক সিটকানো সমাজব্যবস্থা—এসব কোনো বাধাই হতে পারেনি বিলেতে আসা তখনকার সিলেটিদের। কলকারখানা, ইটের ভাটা, ডান্ডির পাটের মিলে, ব্যাডফোর্ডের টেক্সটাইল মিলে, পূর্ব লন্ডনের ইহুদি–অধ্যুষিত ইহুদি মালিকানাধীন তৈরি পোশাক কারখানায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত কাজ করে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে আজকের সমৃদ্ধিশালী সিলেট অঞ্চলকে। হিমালয়সম আত্মবিশ্বাস, শ্রম, নিষ্ঠা, মূল্যবোধ ও সততা দিয়ে ব্রিটেনের ভগ্নপ্রায় হোঁচট খাওয়া অর্থনীতির চাকা আবারও সচল করার পেছনে বাঙালি অভিবাসীদের অগ্রজদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সবাই এসেছিল ভাগ্যোন্নয়নে। মনে মনে ভেবেছিল আবার যাব ফিরে সেই বাংলার নদী, হাওরের তীরে। হয়ে যাবে একটা বেটনের বাড়ি, কয়েক বিঘা আবাদি জমি, হাল চাষ করার জন্য দুই জোড়া গরু আর ব্যাংকে কয়েক লাখ টাকা। আজ প্রায় সত্তর বছর পর তাঁরই চতুর্থ প্রজন্ম বেনটলি বা রোলস রয়েস হাঁকিয়ে চষে বেড়াচ্ছে ব্রিটেন; বালাম থেকে ফোর্ট উইলিয়াম, ডারাম থেকে কোবাম এমন কোনো শহর, নগর বা গ্রাম নেই, যেখানে সিলেটের বাঙালি নেই। শহর, বন্দর, গ্রামে-গঞ্জে ব্রিটেনের আনাচে-কানাচে গড়ে তুলেছে এক বিশাল রেস্টুরেন্ট সাম্রাজ্য। যে ব্রিটিশরা একসময় আমাদের চা খাওয়া শিখিয়েছিল, আজ সেই ইংরেজদের বাঙালিরা এমনভাবে তরকারি খাওয়া শিখিয়েছে—আজ বাঙালি সেফদের চিকেন টিকা মসলা ব্রিটিশ জাতির জাতীয় খাবার।

এখন ১৫ থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ আছে ব্রিটেনে। ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার মুদি দোকান, কয়েক শ পাইকারি সরবরাহ চেইন এবং কম করে হলেও আরও ১০ হাজার নানা ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক আজ সিলেটি অভিবাসী। কী ভীষণ এক বিজয়গাথা!

আজকে ব্রিটেনে বাঙালিরা পার্লামেন্টের আসন অলংকৃত করছেন। পৃথিবীর গণতন্ত্রের সূতিকাগার ওয়েস্টমিনস্টার সংসদে তিন বাঙালি নারী, কয়েক শ নির্বাচিত কাউন্সিলর, মেয়র, স্পিকার রয়েছেন। ব্যারিস্টার, সলিসিটার, চিকিৎসক, শিক্ষক, বিচারক পেশায় নিয়োজিত আরও প্রচুর বাঙালি রয়েছেন। আজ সেই অভিবাসীর ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিরা ব্রিটেনের ইংলিশ ভাষাভাষী ছাত্র-ছাত্রীদের ইংলিশ শিক্ষা দিচ্ছে। কীভাবে যে টেবিলটা ঘুরে গেল, ভাবতেই অবাক লাগে!

আজ সমৃদ্ধির জয়গান গেয়ে শেষ করা খুবই কষ্টসাধ্য। কেউ কি কখনো ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিল, ওই সব অগ্রজের ছোট্ট পদক্ষেপ একদিন রূপান্তরিত হবে এক লাফে। এত কিছু করে দিনের শেষে বাঙালিদের মহামিলনের প্রসিদ্ধ ব্রিকলেনে গিয়ে এক প্লেট বিরন চালের ভাতের সঙ্গে হাকালুকি হাওরের বোয়াল মাছের ঝোল খেয়ে পাশের পান দোকানে ঢুকে খাসিয়া পানের এক খিলি পান আর কাঁচা সুপারি চিবাতে চিবাতে ঘরে ফেরার পথে দূরে ব্যাকগ্রাউন্ডে সংগীতা মিউজিকের দোকানে বেজে উঠল হাসন রাজার সেই অতি পরিচিত প্রিয় গান, ‘লোকে বলে, বলে রে, ঘর বাড়ি বালা নাই আমার…।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!