রবিবার, ২০ মে, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, বিব্রত দল

সুরমা নিউজ ডেস্ক:
নারায়ণগঞ্জে মেয়রের ওপর সশস্ত্র হামলা এবং এরপর দুই জনপ্রতিনিধির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের ওপরই অসন্তুষ্ট হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এই অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে ওবায়দুল কাদের কথা বলেছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানের সঙ্গে।

আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। সূত্র বলেছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন হকার উচ্ছেদের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এ ধরনের ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

গত মঙ্গলবার শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করা নিয়ে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালান সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থকেরা। হামলায় আইভী এবং ১০ সাংবাদিকসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। ঘটনাস্থলে শামীম ওসমানের ক্যাডার বলে পরিচিত নিয়াজুল ইসলামকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়। পরে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আইভী মেয়র হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি করার ক্ষেত্রে তাঁর মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জে এবং দলীয় নেতৃত্বের কাছে এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শামীম ওসমানকে তিরস্কার করেন।

এ অবস্থায় শামীম ওসমান বেশ ক্ষুব্ধ। আইভী তাঁর ফাঁদে পা দিয়েছেন বলে মত দেন স্থানীয় ও জাতীয় নেতাদের কেউ কেউ। তা ছাড়া শামীমের নিজ সংসদীয় আসনের বাইরে গিয়ে সংঘর্ষে জড়ানোর বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ভালোভাবে নেননি।

সূত্র আরও জানায়, ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া প্রসঙ্গে শামীম ওসমানের প্রকাশ্য বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি গতকাল কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সামনে বলেন, ‘শামীম এভাবে আমার নাম বিক্রি করে ঠিক করেননি। আমি তো দুজনকেই যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসার নির্দেশনা দিয়েছি।’

এদিকে গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ও দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘আমি শামীম ওসমানকে ফোন করব কি মারামারি করতে? আমি মারামারি বন্ধ করতেই ফোন করেছি। আজ সকালেও দুজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।’

সেতুমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জে যদি অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে থাকে এবং গোলাগুলি হয়ে থাকে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তা অনভিপ্রেত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি
হকার উচ্ছেদ নিয়ে মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের কমিটি করেছে। বুধবার বিকেলে জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জসীম উদ্দিন হায়দারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আইভী-শামীমের সংবাদ সম্মেলন
নারায়ণগঞ্জে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ তাঁর সমর্থকদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় গতকাল পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমান। বেলা তিনটার দিকে নারায়ণগঞ্জ নগর ভবনে আইভী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। আর বিকেল চারটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার রাইফেলস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান।

হামলার ঘটনায় মেয়র আইভী আবারও শামীম ওসমানকে দায়ী করে বলেছেন, ‘আমার দুই গজ সামনেই পিস্তল বের করেছে। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে, গুলি ছোড়া হয়েছে। আমি তো নিরস্ত্র ছিলাম। এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেব। আমি নিজেও পায়ে ব্যথা পেয়েছি।’

সিটি মেয়র বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ ফুটপাতে হাঁটবে আর হকাররা মার্কেটে থাকবে। এমন না যে হকারদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না রেখে উচ্ছেদ করেছি। আমরা হকারদের বিভিন্ন গলির মধ্যে জায়গা করে দিচ্ছি।’

আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জ এক রাস্তার সড়ক। হকার দেড় হাজারের মতো। এখানে এত হকার বসলে শহরের মানুষ কীভাবে চলাচল করবে। সরকারের কাছে হকারদের জন্য টাকাও চাওয়া হয়েছে।

এটা দুই পরিবার বা শামীম ওসমান-আইভী পক্ষের দ্বন্দ্বের ফল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র আইভী বলেন, ‘এটা পারিবারিক কোনো দ্বন্দ্ব না। আমি কোনো দিন আগ বাড়িয়ে কারও সঙ্গে লাগতে যাই না। এখানে তো এক পক্ষ মারল, আরেক পক্ষ মার খেল। উনি (শামীম ওসমান) তো আগের দিন ঘোষণাই দিয়েছেন।’

হকারদের বিষয়ে এখন ভাবনা কী হবে—জানতে চাইলে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, হকাররা আর আগের মতো ফুটপাতে বসবে না।

অপরদিকে সাংসদ শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে অথবা প্রকৃত সত্য না জেনেই অনেক গণমাধ্যম সংঘর্ষটিকে শামীম ওসমান বনাম আইভীর সংঘর্ষ বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো এটা হকার বনাম আইভীর দ্বন্দ্ব। গরিব বনাম গরিবদের বিপক্ষের দ্বন্দ্ব।

শামীম ওসমান বলেন, ‘গতকাল (গত মঙ্গলবার) আমি শুনলাম উনি (আইভী) লোকজন নিয়ে চাষাঢ়া আসবেন। তাহলে ২৫ দিন তিনি কী করলেন? তিনি যদি ভোটের সময় সবাইকে বাবা-ভাই বলতে পারেন, তাহলে এখন তাদের পেটে লাথি মারবেন কেন?’

শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার দলের সাধারণ সম্পাদক আমাকে ফোন করে জানালেন সেখানে এখনই যাও, এগুলো থামাও। পরে আমি নির্দেশ পেয়ে দৌড়ে সেখানে যাই ও পরিস্থিতি শান্ত করি।’

শামীম বলেন, ‘আমি একটাই অপরাধ করেছি। আর সেটা হলো গরিব মানুষের পক্ষে কথা বলেছি। আমি আগেই বিষয়টি পরিষ্কার করেছি যে ফুটপাতে হকার থাকুক, বস্তি থাকুক এটা আমিও চাই না। কিন্তু আমি চাই সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকুক।’

এটা তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী
মেয়র আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়েছে, সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে ঘটেছে বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপের দরকার হলে তা করা হবে বলেও জানান তিনি। বলেন, এটা (হস্তক্ষেপ) করবেন প্রধানমন্ত্রী।

হকার দেখা যায়নি
গতকাল নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে দু-একজন বুট-বাদাম বিক্রেতা ছাড়া হকার দেখা যায়নি। শহরে যান চলাচল, দোকানপাট চলেছে স্বাভাবিকভাবেই। আগের দিনে কী হয়েছে, তা বোঝার উপায় নেই। শহরের পুলিশের নিরাপত্তা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। আগের দিনের পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা ছিল গতকাল। বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, শহর হকারমুক্ত থাকুক। তবে তাঁরা মনে করেন, গরিব মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত।

কয়েকটি ফুটপাতে হকার বসবে
নারায়ণগঞ্জ নগরীর প্রধান বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া কয়েকটি সড়কের ফুটপাতে সাময়িকভাবে হকার বসতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ওই সড়কগুলোর ফুটপাতে হকার বসতে পারবে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক।

হকার্স আন্দোলনের অন্যতম নেতা জেলা সিপিবির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম জানান, দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হকার্স সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের ডেকে নেওয়া হয়। তাঁদের জানানো হয়, নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া কয়েকটি সড়কে প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর ফুটপাতে হকার বসতে পারবে। জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক, র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক কামরুল হাসান ছাড়াও হকার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি হকারদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!