বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ছাতক সিমেন্ট কারখানায় চলছে লুটপাট

ছাতক প্রতিনিধি :
দেশের প্রাচীনতম শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কারখানা দুর্নীতিবাজদের কারণে এখন তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। ছোট-বড় অনিয়ম দুর্নীতির পাশাপাশি পুকুর চুরির মতো ঘটনা এখানে ঘটলেও এসব নিয়ে যেন কারো মাথা ব্যথা নেই।

ছাতক সিমেন্ট কারখানায় একের পর এক অব্যাহতভাবে ভয়াবহ জাল-জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়ে অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে জালিয়াতরা। কারখানার কতিপয় দুর্নীবাজ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী শ্রমিকনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত চক্রের কারণে বর্তমানে কারখানাটি মৃত প্রায় অবস্থায় রয়েছে। কোন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনী ব্যবস্থা না নেয়ায় সাধারন মানুষের ধারনা কারখানার শ্রমিক শ্রেণি থেকে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি বিসিআইসির কর্মকর্তারাও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতিবাজচক্র জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার সিমেন্ট উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল কারখানার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা।

জানা যায়, ছাতক সিমেন্ট  কারখানা থেকে ভুয়া কাগজপত্রে কোটি টাকার সিমেন্ট উত্তোলন করে নিয়ে যায়। মেসার্স সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক রুবেল মিয়া ৮টি ক্রেডিট ভাউসার জাল করে পুবালী ব্যাংক ছাতক শাখায় জমা দিয়ে ৯২ লক্ষা টাকা মূল্যের সিমেন্ট উত্তোলন করে নিয়ে যায়। গত বছারের ১৩ ডিসেম্বর ছাতক পূবালী ব্যাংকের দেয়া মাসিক হিসাব বিবরনীতে এই ভয়াবহ জালিয়াতির ধরা পড়ায় কারখানার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রেজাউল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ করলে জালিয়াতির ঘটনাটি জন সম্মূখে চলে আসে।

গত বছরের ৫ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পা ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের নামে ভুয়া ৮টি ভাউচারে ৯২লাখ টাকা আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে কর্তৃপক্ষ কারখানার সহকারী প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুল হক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম ও হিসাবরক্ষণ বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর ইছতিয়ার আলমকে অফিসিয়াল নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশ প্রাপ্তির পর সহকারী প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুল হক বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

এসব অভিযোগ এনে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণে গত ৩ জানুয়ারি প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুল হক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম, হিসাব রক্ষণ বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর ইছতিয়ার এং সম্পা ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক, শহরের ফকিরটিলা এলাকার মৃত. কালা মিয়ার পুত্র রুবেল মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতিদমন কমিশন ঢাকা, পুলিশ মহাপরিচালক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিসিআইসি কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দুর্নীতিদমন কমিশন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শহরের ফকিরটিলা এলাকার শাহ তেরা মিয়ার পুত্র শাহ আরজ মিয়া।

অভিযোগ থেকে আরো জানা যায়, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুল হক দুর্নীতির মাধ্যমে কারখানার কোটি-কোটি টাকা আত্মসাত করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। কারখানার কেপিএম থেকে দুর্নীতির অভিযোগে বদলিকৃত জনৈক কর্মকর্তা কারখানার লুঠপাটের মূলহোতা বলে স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন।

ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় ছাতক সিমেন্ট কারখানার রোপওয়ের বিভাগীয় প্রধান মাহবুব এলাহীকে প্রধান করে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বিসিআইসির মাধ্যমে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে জালিয়াতিসহ লুটপাটের ঘটনায় জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নতুন প্রজেক্টের ডিপিডি আব্দুর রহমান বাদশার নাম সামনে চলে এসেছে।

একটি সূত্র জানায়, আব্দুর রহমান বাদশা কারখানার বড়ধরনের সবগুলো দুর্নীতির সাথে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রায় দু’মাস আগে ওই কর্মকর্তা বিনা টেন্ডারে মাত্র ৩৫ লাখ টাকায় কারখানার পুরাতন পাওয়ার প্লান্ট বিক্রির পাঁয়তারা করেছিলেন। পরে স্থানীদের প্রতিবাদের মুখে বাধ্য হয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে প্লান্টটি আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়।

এছাড়া গত এক বছরে ভারত নিজস্ব খনি প্রকল্প থেকে রজ্জুপথে আসা কারখানার চুনাপাথর সেনাকল্যাণ সংস্থার নাম ব্যবহার করে খোলাবাজারে প্রতিটন ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে কারখানার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বাদশাসহ এসব জালিয়াত চক্র। এভাবে বিএমআরই’র জন্য সরকারের দেয়া দুু’দফায় ৩৫ কোটি টাকা শতকরা ৩০ ভাগ কাজ করে বাকি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয় এসব অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক নেতারা। বর্তমানে কারখানার ড্রাই প্রসেস প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পে সরকার ৬৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ প্রজেক্টে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুল হককে হিসাব রক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র জানায়।

সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক রুবেল মিয়া জানান, সিমেন্টের টাকা নিয়ে কারখানার সাথে তার কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে।

ছাতক সিমেন্ট কারখানার সিবিএ সেক্রেটারী আব্দুল কুদ্দুছ কারখানায় জালিয়াতির ঘটনা স্বীকার করে জানান,  বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। নতুন প্রজেক্টের ১৩ কোটি টাকা এ পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে। এসব টাকার কাজ চলমান রয়েছে। ডিপিডি আব্দুর রহমান বাদশা তার বিরুদ্ধে আনিত লুটপাট ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এব্যাপারে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। ছাতক সিমেন্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেপাল কৃষ্ণ হাওলাদার সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের বিষয়টি  নিয়ে দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় কারখানার ৪জন কর্মকর্তাকে শোকজ করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, বিএমআরই প্রজেক্টের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
60Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!