সোমবার, ২৫ জুন, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

শীতে কাবু সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের কৃষকরা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
তীব্র শীতে কাবু হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের কৃষকরা। দুদফায় ফসল হারিয়ে খাবারের জোগান দিতেই হিমশিম চাষিরা শীতের কাপড় কিনতে পারছেন না। তাই গত কয়েকদিন ধরে শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কষ্ট বেড়েছে কয়েক গুণ। এদিকে, কনকনে শীতে মাঠে কাজ করতে পারছেন না চাষিরা। সকাল ১০ টার আগে কৃষি শ্রমিকদের হাওরে দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে বোরোর চাষাবাদ বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত শীত পড়ায় হাওরে কৃষি শ্রমিকও মিলছে না। মঙ্গলবার জেলার বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরে গিয়ে দেখা গেছে অনেক কৃষক পরিবারের মহিলা সদস্যদের নিয়েও চাষাবাদে নেমেছেন।
সুনামগঞ্জে এবার বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ হেক্টর। এই পর্যন্ত চাষাবাদ হয়েছে ৭১ হাজার হেক্টর। জেলার তিন লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ জন কৃষকের সকলেই এখন চাষাবাদে ব্যস্ত। কিন্তু শীতের তীব্রতায় কাবু করেছে তাঁদের। হাওরাঞ্চলের কৃষক ও কৃষণীরা এই সময়ে ভোর ৫ টা থেকে চাষাবাদে নামলেও গত ৩ দিন হয় সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে ১০ টার আগে চাষাবাদে নামতে পারছেন না কৃষকরা। কৃষকরা জানিয়েছেন, শীতের তীব্রতা এতো বেশি যে, জমিতে থাকা কাদা বা পানিতে হালের গরুও নামানো যাচ্ছে না। হাওরে গরু নিয়ে রওয়ানা হলে গরু হাঁটছে না। জমির কাদায় বা পানিতে গরু পা নামাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার টুকেরগাঁও’এর বর্গাচাষী আব্দুল লতিফ (৫৫) মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় বোরো ধানের চারা তোলার কাজ করছিলেন স্ত্রী জহুরা বেগম (৫০), ছেলে তাজুল ইসলাম (৩৫), মেয়ে শাহানারা বেগম (৩০)কে নিয়ে। আব্দুল লতিফ বললেন,‘৭ কেয়ার (২ একর ১ কেয়ার) ক্ষেত (জমি) বাগিতে (বর্গা) কররাম, (করতেছি) ৪ কেয়ার করার পড়ে যেলাখান ঠান্ডা পড়ছে, বাকী ৩ কেয়ার কিলাখান (কীভাবে) করমু বুঝরাম না। সাড়ে ৯ টায় ক্ষেতও আইছি (এসেছি), যদি ভোরে আইতাম অতসময়ে (এতক্ষণে) হালি পুইড়া (চারা তুলে) এক কেয়ার (৩০ শতক) রই লাইলামনে (রোয়া শেষ হয়ে যেতো)। শীত না থাকলে আমরা ভোর ৬ টায় কামও (কাজে) লাগি। ৩ দিন ধইরা (ধরে) সকাল সাড়ে ৯ টা-১০ টার আগে কামও লাগা যার না।’
তাঁর স্ত্রী জহুরা বেগম জানালেন, শীতের তীব্রতায় রাতে ঘুমাতে পারেন নি। কোন ভাবে রাত কাটিয়েছেন। ভোর হবার পর কাজে নামার সাহস করেন নি। একটু রোদ ওঠার পর পরিবারের সকলে মিলে হাওরে কাজে এসেছেন।
একই গ্রামের শাহাব উদ্দিনের (৩৮) নিজের জমি ৪ কেয়ার, বর্গা করেন আরও ৪ কেয়ার। শাহাব উদ্দিন বললেন,‘আমি দিন মজুর দিয়ে রোয়া দেই, ৩ জন মজুর এক কেয়ার জমি একদিনে রোয়া দিয়া শেষ করতো পারে, শীত বেশি পড়ায় গত দুই দিনে ৩ জনে এক কেয়ার জমি রোয়া দিছে। ঠান্ডা কম থাকলে মানুষ ৮ টায় কাজে লাগতো, এখন কাজে লাগছে ১০ টায়, এভাবে পুষানো সম্ভব নয়।’
টুকেরগাঁও’এর আলাউদ্দিন আহমদ (৫৫) বললেন, ‘শীত বেশি পড়ায় দিনমজুরও পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও তারা ৩০০ টাকা মজুরি নিয়ে যে কাজ করে, তাতে কাজে এবং টাকায় পুষাবে না।’ তিনি মঙ্গলবার সকালে ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে সাজুল ইসলাম, ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে সফিকুল ইসলাম এবং ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া ভাগিনা মোশাহিদ আলীকে নিয়ে জমিতে রোয়া দেওয়া শুরু করেছেন।
আলউদ্দিন জানান, গত দুই সপ্তাহ হাওর থেকে পানি না নামায় চাষাবাদে বিলম্বিত হয়েছে। এখন শীতের তীব্রতায় কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে।
কুতুবপুরের কৃষক আব্দুল গফুর বললেন,‘এমন শৈত্যপ্রবাহে গরু হাওরে নিয়ে গেলে অসুস্থ হয়ে মারাও যেতে পারে। এজন্য রোদ ওঠার পর গরু নিয়ে বের হতে হয়।’
সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের তাপমাত্রা ১৯ তারিখ পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠা-নামা করবে। ১৮ এবং ১৯ তারিখে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নামবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘গত দুই দিন হয় প্রচন্ড শীত পড়েছে হাওরাঞ্চলে। শীতের তীব্রতা থেকে ধানের চারা বাঁচানোর জন্য রাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ডেকে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। তিনি আরো বলেন, শীতের কারণে হাওরাঞ্চলে কোন ক্ষতি না হলেও শীতের তীব্রতা প্রলম্বিত হলে হাওরের চাষাবাদ বিলম্বিত হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবর রহমান জানান, শীতার্ত মানুষদের মধ্যে বিতরণের জন্য এই পর্যন্ত ৪৮ হাজার ২৭৭ টি কম্বল পেয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ ৯২ টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ৩৫০ টি করে কম্বল দেওয়া হয়েছে। এসব কম্বল প্রান্তিক কৃষক, দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষদের মধ্যে বিতরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস জানান, শীতজনিত কারণে এখনো হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম জানালেন, ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়া শীতবস্ত্র ছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫ হাজার শীতবস্ত্র সংগ্রহ করেছেন তিনি। এগুলো বিতরণ করা হচ্ছে দরিদ্র শীতার্ত মানুষের মধ্যে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!