বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
টাঙ্গাইলের কিশোরীকে বিশ্বনাথে এনে ধর্ষণের পর হত্যা  » «   থানা পুলিশের প্রেসব্রিফিং বর্জন করল বিশ্বনাথ সাংবাদিক ইউনিয়ন  » «   ‘ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর অনুভূতি’ রচনা প্রতিযোগিতায় ওসমানীনগরের রিমা প্রথম  » «   সন্ধান মিলেছে নিখোঁজ এমসি কলেজ শিক্ষার্থী সাজ্জাদের  » «   সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার, থানায় জিডি  » «   কমলগঞ্জে বিশ্বকর্মা পুজায় দুষ্কৃতিকারীর হামলায় মহিলাসহ আহত ৬  » «   নবীগঞ্জে কুশিয়ারা বুকে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত  » «   বিশ্বনাথে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের আতঙ্ক ‘ভূতুড়ে বিল’  » «   বিশ্বনাথে ১২ দিনেই জমি নামজারির সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসীরা  » «   মৌলভীবাজারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক রাজাকার আনিছের মৃত্যু  » «  

সামনে বৈরাগী বাজার (চার)

ময়নূর রহমান বাবুল:
ডাক প্রথা বা চিঠি আদান-প্রদানের প্রচলন কবে শুরু হয় তা আজ ইতিহাস। সভ্যতার প্রারম্ভ থেকে এর বর্নাঢ্য জীবন কাহিনী রচিত হলেও পাথরে ছবি এঁকে কিংবা প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে খবরাখবর দেনা-আনা সেই গুহাবাসী যুগ থেকে প্রচলিত ছিলো। পরবর্তী সময়ে চানক্যের শ্লোক থেকে প্রচীন বৈদিক গ্রন্থ পর্যন্ত চিঠির কথা বিবৃত আছে। আদি সাহিত্য, ছড়া শ্লোক কবিতায়ও চিঠি নিয়ে বহু কতাবার্তার উল্লেখ পাওয়া গেলেও ভারতবর্ষে চিঠি আদান-প্রদান বা ডাক প্রথা চালু হয়ে ছিলো দিল্লীর সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবক (১২০৬) আলাউদ্দিন খিলজি (১২৯৬) কিংবা শের শাহ (১৫৪১) আমলে। তখন ঘোড়ার সাহায্যে চিঠির ব্যাগ বা থলিয়া বহন করা হতো। ডাক চলাচলের এই ঘোড়া বদলাবার জন্য জাগায় জাগায় সরাইখানা থাকতো। এই চিঠি আদান-প্রদান বা ডাক প্রথা চালু করা প্রথম কবে কখন কার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছিলো তা কেইবা জানে ! বাস্তবে গলায় ঘণ্টা বেঁধেছেন হয়তো এসব সুলতান আর সম্রাটগণ। কবি কালিদাস এবং ধোয়ী মৌসুমী মেঘ বা বাতাসকেও দূত বানিয়ে কল্পচিত্র এঁকেছেন মেঘদূত বা পবন দূত-এ। আর হাঁস হনুমান হরিণ প্রভৃত্তি প্রাণীর ব্যবহার হয়েছে বলেও জানা যায়। যদিও কথায় আছে কবুতরই প্রথম চিঠি বাহক দূত হিসাবে আদী যুগে কাজ করেছে মানুষের জন্য – মানব কল্যাণে। তবে ইতিহাস বলে যে, ১৮৪০ খৃস্টাব্দের ১লা মে থেকে ইংল্যন্ডে ডাক টিকেটের প্রচলন শুরু হয়। আর প্রথম পোষ্টকার্ড ব্যবহার শুরু হয় ১৮৬৯ খৃস্টাব্দে অষ্ট্রিয়ায়। ভারতবর্ষে তা শুরু হয় ১৮৭৯ খৃস্টাব্দে। আদি কালের সে সব সরাইখানাগুলোই আস্তে আস্তে রুপান্তরিত হয়ে স্থানে স্থানে গড়ে উঠে পোস্টঅফিস বা ডাকঘর। ডাক অর্থ আহ্বান বা ডাকা, মনোযোগ আকর্ষণ করা। এ থেকেই ডাকঘর, ডাকবিভাগ, ডাকব্যবস্থা, ডাকহরকরা হয়েছে। একটা বাঁশের লাঠির মাথায় লোহার ধারালো পাত বসানো অস্ত্র, তার সাথে বাঁধা একটা লণ্ঠন, কাধে ঝুলানো চটের ব্যগ এ নিয়ে ছুটে চলা মানুষটিই ডাকহরকরা – এইতো পরিচয়। আর ডাকঘরগুলো সহজেই চেনার উপায় হলো তার সামনে লটকানো থাকে লাল রঙের একটি ডাকবাক্স।

পাতলা লোহার পাত দিয়ে তৈরী ডাকবাক্স। সৈন্য বাহিনীর মাথার লোহার টুপির আদলে বাক্সের মাথায় লোহার হ্যালমেট পরানো। দুই কানে লোহার রডের দুই মাথায় বেঁধে দেয়া হয় লটকানোর জন্য হাতল। চিঠি ছাড়া বা ভিতরে ঢুকানোর জন্য দেয়া বাক্সের চোখের উপর দেয়া হুড বা বৃষ্টি বাদল প্রতিরোধক আবরন ঠেলে চিঠি ফেলতে হয় ভেতরে। পেটের মধ্যে নাভী বরাবর একখানা খিড়কী। তালাচাবি আঁটা হয় এখানেই। তারপর উপরে সারা গা জোড়ে কড়া লাল, বিপ্লবী রঙ। রঙ মাখিয়ে দেয়া হয় ঝকঝকা করে। কিন্তু হয়তো সে ঐ একবারই। এই লাল বিপ্লবী রঙের উপর বছরের পর বছর রোদ বৃষ্টি ঝড় ঝঞ্জায় প্রথমে হলুদ রঙের তারপর সময় গড়াতে গড়াতে তার উপর জং এর রঙ পরিবর্তীত হতে হতে কালো বা ছাই রঙ ধারন করে। তবু ডাক বাক্স ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে পোষ্ট অফিসের সামনে নাকের ডগার উপর লটকে থাকে যুগ যুগ – অনাধিকাল ধরে।

গ্রামের অশিতিপর বৃদ্ধ রমিজ উল্লা ডাকবাক্সের দিকে চেয়ে প্রায়ই ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। সময় যায়, সময় যায় – ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়। রমিজ উল্লা চিন্তা করে বের করতে পারেন না যে, এখানে এই লটকানো লাল বাক্সে চিঠি ছাড়লে, তালাদেয়া বাক্সের ভিতর থেকে বেরিয়ে কিভাবে কোন্ দিকে চিঠিখানা কলকাত্তা গিয়ে আফিজ উল্লার কাছে পৌঁছে ! য়্যাঁ? যায় ক্যামনে ? আফিজের দেয়া চিঠির উত্তর না হয় ডাকপিয়ন ভানুদেব হাতে হাতে এনে দিয়ে যায়। কিন্তু রমিজ উল্লা চিন্তা করে পায়না – তার চিঠি কলিকাতা যায় কেমনে ?

রমিজের ছিঠি যেভাবেই যাকনা কেন। এই পোষ্ট অফিস আর লাল রঙের জংধরা বাক্সের বদৌলতেই ফুলবানু মাসে একটা করে নীল খামের চিঠি পায় মনুর কাছ থেকে। মনুর নিজের হাতের লেখা চিঠি। নীল খামের চার কিনারে ঘাঢ় নীল আর লাল রঙের চৌসীমানা দেয়া খাম। সুন্দর কারুকাজ করা ছবি আঁকা ডাকটিকেটের উপর পোষ্ট অফিসের কালো কালির সীল-মোহর মারা চিঠি। ঠিকানায় মনুর হাতের গোল গোল অক্ষরের লেখা নাম ফুলবানু। গ্রাম পোষ্ট-অফিস লেখা ঠিকানা। ভানুদেব ধূতির খুঁট আরেকটু উপরে তুলে কাঁদা-জল ভাংতে ভাংতে সামনে এগোয়। রাস্তার পাশে জংধরা, ঝড়ে হেলেপড়া একটুকরো পুরানো টিনের উপর ‘‘সামনে বৈরাগী বাজার’’ লেখা সাইনবোর্ডখানা পেরিয়ে ফুলবানুর খুপড়ি ঘরের সামনে গিয়ে পৌঁছে। চিঠিখানা হাতে নিয়ে তার উপর ফলবানু আদরে আদরে চোখ বুলায়। মনুর মুখায়াবয়বখানা নীলখামের উপর ভেসে উঠে স্পষ্ট। ফুলবানু স্পষ্টই দেখতে পায় মনুর চেহারা। যেখানে মনুর নিজের হাতেই লেখা আছে ঠিকানা – বৈরাগী বাজার…

ময়নূর রহমান বাবুল (কবি ও গল্পকার)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!