বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
সিলেটে দেশের ৩য় বৃহত্তম চিড়িয়াখানা, চালু হচ্ছে সীমিত জনবল নিয়ে  » «   ছাত্রলীগকর্মী তানিম হত্যা : আসামী ডায়মন্ড ও রুহেল ৫ দিনের রিমান্ডে  » «   জামেয়া গহরপুর মাদ্রাসার ৬১ তম বার্ষিক মাহফিল আজ  » «   সিলেটে অস্ত্রসহ হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার  » «   কার্ডিফের মতো সিলেট গড়তে চাই : মেয়র আরিফ  » «   সুনামগঞ্জে বোরো আবাদ : কৃষকদের চরম হতাশা, লক্ষ্যমাত্রা সোয়া ২ লাখ হেক্টর জমি  » «   সিলেটে পাথর কোয়ারীতে অভিযান : ১৫টি লিস্টার মেশিন ধ্বংস  » «   সিলেটে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল  » «   সিলেটে ওসমানী স্মৃতি পরিষদের শীতবস্ত্র বিতরণ  » «   ওসমানীনগরে ইলিয়াস আলীর জন্য বিএনপি নেতা ফারুকের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ  » «  

সামনে বৈরাগী বাজার (চার)

ময়নূর রহমান বাবুল:
ডাক প্রথা বা চিঠি আদান-প্রদানের প্রচলন কবে শুরু হয় তা আজ ইতিহাস। সভ্যতার প্রারম্ভ থেকে এর বর্নাঢ্য জীবন কাহিনী রচিত হলেও পাথরে ছবি এঁকে কিংবা প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে খবরাখবর দেনা-আনা সেই গুহাবাসী যুগ থেকে প্রচলিত ছিলো। পরবর্তী সময়ে চানক্যের শ্লোক থেকে প্রচীন বৈদিক গ্রন্থ পর্যন্ত চিঠির কথা বিবৃত আছে। আদি সাহিত্য, ছড়া শ্লোক কবিতায়ও চিঠি নিয়ে বহু কতাবার্তার উল্লেখ পাওয়া গেলেও ভারতবর্ষে চিঠি আদান-প্রদান বা ডাক প্রথা চালু হয়ে ছিলো দিল্লীর সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবক (১২০৬) আলাউদ্দিন খিলজি (১২৯৬) কিংবা শের শাহ (১৫৪১) আমলে। তখন ঘোড়ার সাহায্যে চিঠির ব্যাগ বা থলিয়া বহন করা হতো। ডাক চলাচলের এই ঘোড়া বদলাবার জন্য জাগায় জাগায় সরাইখানা থাকতো। এই চিঠি আদান-প্রদান বা ডাক প্রথা চালু করা প্রথম কবে কখন কার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছিলো তা কেইবা জানে ! বাস্তবে গলায় ঘণ্টা বেঁধেছেন হয়তো এসব সুলতান আর সম্রাটগণ। কবি কালিদাস এবং ধোয়ী মৌসুমী মেঘ বা বাতাসকেও দূত বানিয়ে কল্পচিত্র এঁকেছেন মেঘদূত বা পবন দূত-এ। আর হাঁস হনুমান হরিণ প্রভৃত্তি প্রাণীর ব্যবহার হয়েছে বলেও জানা যায়। যদিও কথায় আছে কবুতরই প্রথম চিঠি বাহক দূত হিসাবে আদী যুগে কাজ করেছে মানুষের জন্য – মানব কল্যাণে। তবে ইতিহাস বলে যে, ১৮৪০ খৃস্টাব্দের ১লা মে থেকে ইংল্যন্ডে ডাক টিকেটের প্রচলন শুরু হয়। আর প্রথম পোষ্টকার্ড ব্যবহার শুরু হয় ১৮৬৯ খৃস্টাব্দে অষ্ট্রিয়ায়। ভারতবর্ষে তা শুরু হয় ১৮৭৯ খৃস্টাব্দে। আদি কালের সে সব সরাইখানাগুলোই আস্তে আস্তে রুপান্তরিত হয়ে স্থানে স্থানে গড়ে উঠে পোস্টঅফিস বা ডাকঘর। ডাক অর্থ আহ্বান বা ডাকা, মনোযোগ আকর্ষণ করা। এ থেকেই ডাকঘর, ডাকবিভাগ, ডাকব্যবস্থা, ডাকহরকরা হয়েছে। একটা বাঁশের লাঠির মাথায় লোহার ধারালো পাত বসানো অস্ত্র, তার সাথে বাঁধা একটা লণ্ঠন, কাধে ঝুলানো চটের ব্যগ এ নিয়ে ছুটে চলা মানুষটিই ডাকহরকরা – এইতো পরিচয়। আর ডাকঘরগুলো সহজেই চেনার উপায় হলো তার সামনে লটকানো থাকে লাল রঙের একটি ডাকবাক্স।

পাতলা লোহার পাত দিয়ে তৈরী ডাকবাক্স। সৈন্য বাহিনীর মাথার লোহার টুপির আদলে বাক্সের মাথায় লোহার হ্যালমেট পরানো। দুই কানে লোহার রডের দুই মাথায় বেঁধে দেয়া হয় লটকানোর জন্য হাতল। চিঠি ছাড়া বা ভিতরে ঢুকানোর জন্য দেয়া বাক্সের চোখের উপর দেয়া হুড বা বৃষ্টি বাদল প্রতিরোধক আবরন ঠেলে চিঠি ফেলতে হয় ভেতরে। পেটের মধ্যে নাভী বরাবর একখানা খিড়কী। তালাচাবি আঁটা হয় এখানেই। তারপর উপরে সারা গা জোড়ে কড়া লাল, বিপ্লবী রঙ। রঙ মাখিয়ে দেয়া হয় ঝকঝকা করে। কিন্তু হয়তো সে ঐ একবারই। এই লাল বিপ্লবী রঙের উপর বছরের পর বছর রোদ বৃষ্টি ঝড় ঝঞ্জায় প্রথমে হলুদ রঙের তারপর সময় গড়াতে গড়াতে তার উপর জং এর রঙ পরিবর্তীত হতে হতে কালো বা ছাই রঙ ধারন করে। তবু ডাক বাক্স ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে পোষ্ট অফিসের সামনে নাকের ডগার উপর লটকে থাকে যুগ যুগ – অনাধিকাল ধরে।

গ্রামের অশিতিপর বৃদ্ধ রমিজ উল্লা ডাকবাক্সের দিকে চেয়ে প্রায়ই ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। সময় যায়, সময় যায় – ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়। রমিজ উল্লা চিন্তা করে বের করতে পারেন না যে, এখানে এই লটকানো লাল বাক্সে চিঠি ছাড়লে, তালাদেয়া বাক্সের ভিতর থেকে বেরিয়ে কিভাবে কোন্ দিকে চিঠিখানা কলকাত্তা গিয়ে আফিজ উল্লার কাছে পৌঁছে ! য়্যাঁ? যায় ক্যামনে ? আফিজের দেয়া চিঠির উত্তর না হয় ডাকপিয়ন ভানুদেব হাতে হাতে এনে দিয়ে যায়। কিন্তু রমিজ উল্লা চিন্তা করে পায়না – তার চিঠি কলিকাতা যায় কেমনে ?

রমিজের ছিঠি যেভাবেই যাকনা কেন। এই পোষ্ট অফিস আর লাল রঙের জংধরা বাক্সের বদৌলতেই ফুলবানু মাসে একটা করে নীল খামের চিঠি পায় মনুর কাছ থেকে। মনুর নিজের হাতের লেখা চিঠি। নীল খামের চার কিনারে ঘাঢ় নীল আর লাল রঙের চৌসীমানা দেয়া খাম। সুন্দর কারুকাজ করা ছবি আঁকা ডাকটিকেটের উপর পোষ্ট অফিসের কালো কালির সীল-মোহর মারা চিঠি। ঠিকানায় মনুর হাতের গোল গোল অক্ষরের লেখা নাম ফুলবানু। গ্রাম পোষ্ট-অফিস লেখা ঠিকানা। ভানুদেব ধূতির খুঁট আরেকটু উপরে তুলে কাঁদা-জল ভাংতে ভাংতে সামনে এগোয়। রাস্তার পাশে জংধরা, ঝড়ে হেলেপড়া একটুকরো পুরানো টিনের উপর ‘‘সামনে বৈরাগী বাজার’’ লেখা সাইনবোর্ডখানা পেরিয়ে ফুলবানুর খুপড়ি ঘরের সামনে গিয়ে পৌঁছে। চিঠিখানা হাতে নিয়ে তার উপর ফলবানু আদরে আদরে চোখ বুলায়। মনুর মুখায়াবয়বখানা নীলখামের উপর ভেসে উঠে স্পষ্ট। ফুলবানু স্পষ্টই দেখতে পায় মনুর চেহারা। যেখানে মনুর নিজের হাতেই লেখা আছে ঠিকানা – বৈরাগী বাজার…

ময়নূর রহমান বাবুল (কবি ও গল্পকার)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

সর্বশেষ সংবাদ