রবিবার, ২৪ জুন, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ছাত্রলীগ এখন বিষফোঁড়া : কোন্দলে ১০খুন, বাড়ছে লাশের বহর

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গ্রুপিং। পড়ছে লাশ। থামছে না কান্না। অকালেই ঝরছে একের পর এক তরতাজা প্রাণ। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। বাড়ছে আহাজারি। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের বহর। সিলেটে লাশের মিছিলে বার বার যুক্ত হচ্ছে ছাত্রলীগ। সিলেটে ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্রসংগঠনটিকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। এখন রীতিমতো বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং মহাজোট সরকারের জন্য। সিলেট ছাত্রলীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাত বছরে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে ১০ কর্মী খুন হয়েছেন। এছাড়া তাদের হাতে প্রাণ ঝরেছে এক ব্যবসায়ী ও এক শ্রমিকের। এখন পর্যন্ত কোন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়নি। ফলে এসব হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে নিহতের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিলেটের টিলাগড় পয়েন্ট বর্তমানে মার্ডার পয়েন্ট নামে খ্যাত। সর্বশেষ খুন হওয়া তানিম ও মিয়াদের স্পট টিলাগড়।
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বিচার, দোষীদের গ্রেপ্তারের মুখস্থ বাণী আওড়ালেও কিছুদিন পরই তা অতীত হয়ে যায়। আবার যখন কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তখন আবার আলোচিত হয় বিগত দিনে নিজ দলের কর্মীদের হাতে বলি হওয়া দুর্ভাগা কর্মীদের কথা। অথচ সামান্য রেষারেষির কারণে খালি হচ্ছে কতো মায়ের কোল। এসব পরিবারের একটাই প্রশ্ন, এভাবে আর কতো মায়ের কোল খালি হবে? বিচারের বাণী কী এভাবেই নিভৃতে কেঁদে যাবে? সর্বশেষ এই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হলেন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান। রোববার (৭ জানুয়ারি) রাত পৌনে নয়টার দিকে নগরীর টিলাগড় এলাকায় রাজমহলের সামনে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিলেট সরকারি কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তানিম টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগের এক পক্ষের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটে। ওই ঘটনার জের ধরে রোববার রাতে তানিমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁর সহপাঠীরা জানিয়েছেন। অক্টোবরে আরেক ছাত্রলীগকর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ খুন হন নিজ দলের কর্মীর হাতে। নিহত মিয়াদ লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করছিলেন। টিলাগড় মসজিদের সামনে কয়েকজন যুবক অতর্কিত হামলা চালায় মিয়াদের উপর। এসময় তার বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অভিযোগ, প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার এড়িয়ে প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু-একজন গ্রেফতার হলেও খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে। হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দোষীদের গ্রেফতার ও সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থের প্যাঁচে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিহতদের পরিবারগুলো। ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই সিলেটের বিয়ানীবাজারে ঘটে খুনের ঘটনা। বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের শ্রেণীকক্ষের ভেতরে নিজ দলের কর্মীদের গুলিতে প্রাণ হারান জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক পাভেল গ্রুপের কর্মী খালেদ আহমদ লিটু। তার বাবা ফয়জুর রহমান ছাত্রলীগ কর্মী ফাহাদ আহমদসহ সাতজনকে আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় মামলা করেন। এই মামলায় চারজনকে গ্রেফতার করলেও বাকিরা পলাতক রয়েছেন। ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে নগরীর শিবগঞ্জে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ছাত্রলীগের সুরমা গ্রুপের কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম। এ ঘটনায় তার মা আতিয়া বেগম শাহপরান থানায় এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা টিটু চৌধুরীসহ ২২ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ের শিকার হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান। গ্রুপ বদলানোর কারণে ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর শামীমাবাদে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাঠে ছাত্রলীগ নেতা হোসাইন মুহাম্মদ সাগর ও সোহেলের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ কর্মী তার ওপর হামলা চালায়। হাবিবকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হামলাকারীরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাবিবের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার ভাই ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কোতোয়ালি থানার ওসি গৌছুল হোসেন জানান, আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে জামিন নিয়ে তারা বাইরে আছেন। ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট মদন মোহন কলেজে নিজ দলের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল আলী (১৯)। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই ছাত্রলীগের দুই কর্মী খুন হন প্রতিপক্ষের হাতে। নগরীর কালীবাড়ি রোডের মদিনা মার্কেট অংশে ইজিবাইক স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা ইমরান আহমদ ও গোলজার আহমদ গ্রুপের সংঘর্ষে আবদুল্লাহ ওরফে কচি নিহত হন। এ ঘটনায় কচির ভাই আসাদুল হক ভুঁইয়া বাদী হয়ে আটজনের মামলা করেন। একই বছরের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের পার্থ ও সবুজ গ্রুপের সঙ্গে অঞ্জন-উত্তম গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী সুমন চন্দ্র দাস। এ ঘটনায় সুমনের মা প্রতিমা দাস বাদী হয়ে ছাত্রলীগের অজ্ঞাতনামা শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা করেন। জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুর রহমান জানান, দুটি মামলা সিআইডিতে তদন্তাধীন। ২০১০ সালের ১২ জুলাই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন পলাশের বাবা বীরেশ্বর সিংহ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!