রবিবার, ২৪ জুন, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

জনবল সংকটে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক

সুরমা নিউজ:
জনবল সংকটের কারণে মৌলভীবাজারের বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। প্রায় নয়শত একর আয়তনের এই ইকোপার্কটির দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতে বনাঞ্চল অনেকটাই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে প্রাকৃতিক বনে গড়ে তোলা হয়েছে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক। বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের আকর্ষন করতে ২০০৬ সালের জুলাই মাসে সংরক্ষিত এই বনভূমিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়েছে। ৮৮৭ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা এই পার্কে ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে দুটি দু’কক্ষবিশিষ্ট ইকো কটেজ, চারটি পিকনিক স্পট, দুটি পর্যবেক্ষণ (নিরাপত্তা) টাওয়ার, চারটি নিরাপত্তা পোস্ট, পাঁচটি গণশৌচাগার, একটি টিকেট কাউন্টার ও একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

কিন্তু অবকাঠামোগত কাজ শেষ হওয়ার পরও পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। জনবল সংকটের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়নি ইকোপার্কটি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। কটেজ দুটির দরজা জানালা ও কাঠের ছাদ নষ্ট হয়ে গেছে।

গণশৌচাগারেরও একই অবস্থা। পর্যটকরা ইচ্ছেমতো ইকোপার্কে আসা যাওয়া করছেন। প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিরিবিলি স্থান হিসেবে এবং শহরের পাশে হওয়ায় অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। এতে প্রায়ই বখাটে ও ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে হয় তাদের। বর্তমানে এই ইকোপার্কটির দায়িত্বে আছেন একজন বিট কর্মকর্তা ও একজন বাগান মালি। এই বিট কর্মকর্তা আবার হাকালুকি বিটেরও দায়িত্বে। তাঁকে (বিট কর্মকর্তা) বর্ষিজোড়া ও হাকালুকি এই দুই জায়গাতেই ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

বর্ষিজুরা ইকোপার্কের ভেতরের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী কড়ালি টিলার বাসিন্দারা জানান, অনেকে বেড়াতে পার্কে আসে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বাইরে থেকে কিছু ছেলে ভেতরে এসে পর্যটকদের বিরক্ত করে। ছিনতাই করে মোবাইল ফোন টাকা পয়সা। এছাড়া রাতেও এখানে অনেক খারাফ মানুষ মদ গাঁজা খায়।

ইকোপার্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ইকোপার্কের প্রধান উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে আছে শাল, গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, আউয়াল, সেগুন, বনাক, চিকরাশি, বহেড়া, আমলকি, হরতকি, লোহাকাঠ, জারুল, অর্জুন ইত্যাদি। প্রধান বন্য প্রাণীর মধ্যে আছে বানর, হনুমান, বড় বাঘডাশা, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, সজারু, বেজি, শিয়াল, গুইসাপ ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। ছোট ছোট টিলা ও ছড়া (খাল) সমৃদ্ধ মিশ্র-চিরহরিৎ এই প্রাকৃতিক বনটিকে ১৯১৬ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেস্ট) ঘোষণা করা হয়েছিল। বনের আশপাশে মানুষের বসতি বেড়ে যাওয়ার কারণে একসময়ের এই গভীর বনাঞ্চল থেকে চিতাবাঘ, মায়া হরিণ, উল্কলুকসহ বিভিন্ন রকমের প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বর্ষিজোড়া ইকোপার্কে সচরাচর বানর, বনবিড়াল, মেছোবাঘ ও বিভিন্ন ধরণের সাপ চোখে পড়ে। পাখির মধ্যে প্যাঁচা, ঘুঘু, বক, কাক ইত্যাদির দেখা মিলে বেশি।

বন্য প্রাণী গবেষক ও বন্য প্রাণীর আলোকিচিত্রী তানিয়া খান বলেন, ‘এই পার্কটি প্রাণীবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি বন। এখানে অনেকরকম স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। খাদ্যের অভাবে এরা অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে। মানুষের হাতে মারাও যায় অনেক সময়। ইকোপার্কে বন্য প্রাণীর খাদ্যের জোগান বাড়ানো গেলে এরা হয়তো আর বনের বাইরে আসবে না। এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।’

বর্ষিজোড়া ইকোপার্কের বিট কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ফরেস্টার মোনায়েম হোসেন বলেন, পার্কটির সুব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার জন্য নুন্যতম আটজন লোক দরকার। আছি মাত্র দু’জন। তাছাড়া আমাকে হাকালুকি বিটও দেখতে হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে এখনো বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা যায়নি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!