বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
টাঙ্গাইলের কিশোরীকে বিশ্বনাথে এনে ধর্ষণের পর হত্যা  » «   থানা পুলিশের প্রেসব্রিফিং বর্জন করল বিশ্বনাথ সাংবাদিক ইউনিয়ন  » «   ‘ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর অনুভূতি’ রচনা প্রতিযোগিতায় ওসমানীনগরের রিমা প্রথম  » «   সন্ধান মিলেছে নিখোঁজ এমসি কলেজ শিক্ষার্থী সাজ্জাদের  » «   সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার, থানায় জিডি  » «   কমলগঞ্জে বিশ্বকর্মা পুজায় দুষ্কৃতিকারীর হামলায় মহিলাসহ আহত ৬  » «   নবীগঞ্জে কুশিয়ারা বুকে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত  » «   বিশ্বনাথে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের আতঙ্ক ‘ভূতুড়ে বিল’  » «   বিশ্বনাথে ১২ দিনেই জমি নামজারির সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসীরা  » «   মৌলভীবাজারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক রাজাকার আনিছের মৃত্যু  » «  

সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা

সৃজন পাল:
পুণ্যভূমি সিলেট সৌন্দর্যের এক অপূর্ব উদাহরণ। বাংলার ভূখন্ডে এই অঞ্চল ভিন্ন নামে পরিচিত। কারো কাছে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ আর কারো কাছে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও মনোরম-উত্তরে মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে ত্রিপুরা, পূর্বে আসাম আর পশ্চিমে নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ। পৌরাণিক যুগে এই অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর পর জয়ন্তিয়া, গৌড়, লাউড় নামে তিনটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। ইতিহাসবিদগণের ধারণা, বর্তমান সিলেট বিভাগীয় শহরই ছিল আদি গৌড় রাজ্য। খ্রিস্টীয় ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রা.) যখন এখানে আসেন তখন নাম পরিবর্তিত হয়ে জালালাবাদ নামকরণ করা হয়। ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সিলেট চারটি জেলার (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ) সমন্বয়ে বিভাগে উন্নীত হয়। জেনে রাখা ভালো যে- সমুদ্র পৃষ্ট থেকে সিলেট বিভাগ ৫৫ ফুট উপরে অবস্থিত। ভৌগলিক অবস্থান যেমন উপরে তেমনি সিলেটের হাকডাকও বিশ্বব্যাপী। আলাদা করে এগুলো লিখে কলমের খালি ক্ষয় বৃথা। এই অঞ্চলের বিশেষ বিশেষ খ্যাতি আছে। আছে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যও। সিলেট দর্শনে এসে মায়ায় পড়ে কবিগুরু সিলেটকে বলেছেন-“সুন্দরী শ্রীভূমি’। পন্ডিত জহরলাল নেহেরু লিখেছেন-“ঝুষযবঃ রং ইবহমধষ রিঃয ধ ফরভভবৎবহঃ”. সিলেট বিভাগের আয়তন ১২,৫৯৬ বর্গকিলোমিটার। এই পুরো আয়তন জুড়েই মনে হয় স্বর্ণশোভিত। তাইতো, সিলেটে ঘুরতে আসা ভিন্নজন সিলেটে এসে জড়িয়ে পড়েন এক অদৃশ্য মায়ায়। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, সিলেটের সবকিছু ভালো হলেও একটা জিনিস নাকি তাদের কাছে একটু অন্যরকম লাগে এবং সেটি হলো সিলেটের ভাষা। হ্যাঁ, সিলেটের ভাষা একটু ভিন্ন। এই বিষয়টা নিয়ে ভিন্নজনের কাছে পাওয়া যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সিলেট আর চট্টগ্রাম এই দুই অঞ্চলের ভাষা সর্বসাধারণের দূর্বোধ্য। এজন্য লোকমুখে প্রচলিত আছে প্রমথ চৌধুরীর উক্তি-‘বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে আর নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে। ‘এই উক্তির সত্যতা কেবল তারাই জানবে কেবল যারা দুই অঞ্চলের ভাষার স্পর্শ পেয়েছে।
এবার দেখি কিছু বাস্তবতা।
দৃশ্যপট-১ : বাংলা সংস্কৃতির কোন এক অনুষ্ঠানে এক বিরাট রম্য বিতর্কের আয়োজন করা হয়েছে। বিতার্কিক হিসেবে আছেন দেশের ভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন প্রতিনিধি। বিতর্কের প্রস্তাবনা-‘আমার ভাষাই সবার সেরা’। প্রত্যেকে তাদের অঞ্চলের ভাষা নিয়ে ইতিবাচক এবং অন্যান্য অঞ্চলের ভাষা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। কোন এক পর্যায়ে সিলেটের ভাষা নিয়ে বলা হয়েছে-‘সিলেটিরা তো বাঙ্গালী না এরা ছিলটি!!!’ এরপরেও ঘটনা তো পুরো ইতিহাস। কারণ, বিতর্কের মাধ্যমে সিলেটের প্রতিনিধি বুঝাচ্ছিলেন বাঙ্গালী ও বাংলাদেশী’র তফাৎ। এজন্য বলি, বিতর্কগুলো আমাদের ভিন্ন জ্ঞান দেয়।
যাকগে, এটা স্রেফ রম্য বিতর্ক ছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছিল।
দৃশ্যপট-২:গুরুত্বপূর্ণ ফরমে জাতীয়তা লিখার একটা অংশ থাকে। সে অংশে যে যে জাতীয় সে দেশের জাতীয়তা লিখতে হয় (যেমন-বাংলাদেশি,ব্রিটিশ,আমেরিকান ইত্যাদি।) আমাদের দেশে তেমনি এক ফরম পূরণ করতে প্রার্থী দের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার পরামর্শ- ‘তোমরা জাতীয়তা লিখার অংশে বাংলাদেশি লিখবা। সিলেটিদের মতো সিলেটি লিখলে হবে না!!!
উনাকে প্রশ্ন করা হলো-‘সিলেটিরা কেন বাংলাদেশি না?’ এর উত্তর তিনি না দিয়ে বললেন তোমাদের সাথে আমি মজা করলাম আরকি!
অবশ্য উনার মজার মাধ্যমে কিছু শিক্ষনীয় বার্তা ছিল। পরে অবশ্য গল্পের ছলে এ বিষয়ে কিছু কথা বলেছিলেন।
দৃশ্যপট-৩:আমার প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষকের সাথে আড্ডা হচ্ছিল আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে। তিনি এ সম্পর্কিত নানা তথ্য উপস্থাপন করলেন। সিলেট প্রসঙ্গে তিনি আমাদেরকে একটা পরামর্শ দিলেন-‘তোমরা সিলেট গিয়ে পুরী খাওয়ার চেষ্টা করবা না!সিলেটিরা মেয়েদেরকে পুরী বলে!!‘কথা প্রসঙ্গে তিনি আমার কাছে আমার অঞ্চলের ভাষা শুনতে চাইলেন। আমিও শুনালাম পুরি আর ফুরি সম্পর্কিত তথ্য। এরপর তিনি বললেন-তুমি যে সিলেটি সেটা আমি জানতাম না। তবে তোমার কথার মধ্যে সাধারণত সিলেটি টানটা আসে না!
দৃশ্যপট পড়ে বুদ্ধিমান পাঠক ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন এখানে কি আলোচনা হবে। তবে এখান থেকে চলে গেলেই মজার কিছু তথ্য হয়তো আপনার না জানই থেকে যাবে এটা বলতেই হবে।
হ্যাঁ, বলছিলাম সিলেটের ভাষা নিয়ে। একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষার নির্দিষ্ট ইতিহাস থাকে। ভাষা পরিবর্তনশীল। একটা নির্দিষ্ট অংশ থেকে বিকৃত হতে হতে কোথায় যে এসে পড়ে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এগুলো নিয়ে ভিন্ন মতবাদ কিংবা বিতর্কও থাকে। যেমনটা পাওয়া যায় বাংলা ভাষার উৎপত্তিগত ইতিহাসের তথ্য থেকে। আপনাকে যদি বলা হয় বহু ভাষাভাষীদের একটা দেশের নাম বলুন-আপনি চোখের পলক পড়ার আগেই আমাদের পাশের দেশ ভারতের নাম উল্লেখ করবেন নির্দিদ্বায়। এখন আপনাকে যদি বলা হয় বাংলাদেশ কেন বহুভাষার দেশ নয়?বাংলাদেশে তো বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার প্রচলন আছে। এক্ষেত্রে আপনি হয়তো বলবেন বাংলা ভাষা ছাড়া বাংলাদেশে প্রচলিত বাকি সব ভাষাই আঞ্চলিক ভাষা। হ্যাঁ, আপনার কথাগুলো সত্য। কিন্তু আপনি ছাড়া বাকি সবাই জানে যে, ‘বাংলাদেশে দুইটি স্বতন্ত্র ভাষার প্রচলন আছে।’ একথা আমার একার নয় এটি বলছে সারাবিশ্ব। ফ্রান্সের বিখ্যাত ভাষা জাদুঘরে বিশ্বের সব ভাষার উদৃতি আছে। সেখানে বাংলাদেশের ভাষার বিবরণে উল্লেখ আছে- ‘বাংলাদেশে দুটি ভাষা প্রচলিত আছে। এর একটি বাংলা অপরটি ছিলেটী।’ একটু অবাক লাগলেও এটাই সত্য। পৃথিবীতে প্রায় আট হাজারের মতো ভাষা আছে যার ৩০০০ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাহলে ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণতা বলতে কি বুঝায়?যে ভাষার পূর্ণাঙ্গ লিপিসহ ইতিহাস জানা যাবে এবং এর ব্যুৎপত্তিগত দলিল-দস্তাবেজ আছে সেগুলোই স্বয়ংসম্পূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ ভাষা।
সিলেটি নাগরী এক অনন্য ধারার লিপি ও সাহিত্য:
সিলেটীদের ভাষা নিয়ে আপনার হয়তো কিছু ভাবনা তৈরী হয়েছে, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে কিছু প্রশ্ন। কেন সিলেটীদের ভাষা ভিন্ন?এই ভাষার কেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আছে?সিলেটীরা কি আসলেই বাঙ্গালী না? ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রথমেই জেনে নেওয়া প্রয়োজন বাঙ্গালী আর বাংলাদেশী এই দুই শব্দের ব্যাখ্যা।
বাঙ্গালী-বাংলা ভাষাভাষী সকল লোকজনকে বাঙ্গালী বলা যাবে।
বাংলাদেশী-বাংলাদেশের নাগরিকতা প্রাপ্ত সকলকে বাংলাদেশী বলা যাবে।
সিলেটীদের ভাষা বাংলা ভাষা থেকে একটু ভিন্ন। তাই সিলেটী ভাষার উৎপত্তি আর বাংলা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস এক নয়। সিলেটী লোকজন একই সাথে বাংলা আর সিলেটী ভাষা বুঝতে পারেন। বাংলা বা অন্য আঞ্চলিক ভাষাভাষী লোকজনের সিলেটী ভাষার প্রতি একটু দুর্বোধ্যতা আছে। বাংলা ভাষার উৎপত্তিতে যেমন ব্রাহ্মী লিপির উল্লেখ আছে। সিলেটি ভাষার ক্ষেত্রে উল্লেখ আছে নাগরী লিপির। নাগরী লিপি একটি স্বতন্ত্র লিপি যার কারণে সৃষ্ট সিলেটী/ছিলটী ভাষা। এই লিপির অন্য নাম- সিলেটী নাগরী,জালালাবাদী নাগরী,ফুল নাগরী,মুসলমানি নাগরী,মোহাম্মদী নাগরী কিংবা ছিলটী নাগরী। জাতিসংঘ স্বীকৃত ৩০০০টি পূর্ণাঙ্গ ভাষার মধ্যে নাগরী লিপি তথা ছিলটী ভাষা একটি। এই লিপির মোট বর্ণ সংখ্যা ৩২ যার মধ্যে ৫ টি স্বরবর্ণ। (মতান্তরে বর্ণ সংখ্যা ৩৩ এবং স্বরবর্ণ ৬)। তাহলে এই ভাষার উৎপত্তি কোথায়?এই প্রশ্নের উত্তরটা ভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন ধরণের। নাগরী লিপি নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যের আছে এমনটা উল্লেখ আছে। প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের লোকজন এই ভাষায় কথা বলতো,রচনা করতো ভিন্ন সাহিত্য কর্ম। এই লিপি বা ভাষায় রচিত ৮৮ টি গ্রন্থ পাওয়া গেছে। এসব গ্রন্থকে বলা হতো নাগরী পুঁথি। পুঁথিগুলো ‘বর্ণনামূলক গীতিকবিতা’ বা ‘বয়ান’ নামে পরিচিত ছিল এবং এগুলো পয়ার ছন্দ,ত্রিপদী বা রাগ সমন্বয়ে গঠিত। অধিকাংশ পুঁথিতে সৃষ্টিকর্তাকে আরাধনার উপায় লিখার প্রমাণ আছে। গবেষকদের সংগৃহিত তথ্যমতে, নাগরী হরফে রচিত প্রথম গ্রন্থ- ‘তালিব হুসন(১৫৪৯)’ রচয়িতা-গোলাম হুসন। আর জনপ্রিয় গ্রন্থ- ‘কিতাব হালাতুন্নবী’ রচয়িতা-মুন্সী সাদেক আলী। উল্লিখিত দুই গুণীজন ছাড়াও নাগরী পুঁথি রচয়িতাদের মধ্যে- মুন্সী ইরপান আলী,দৈখুরা মুন্সী,আব্দুল ওহাব চৌধুরী,আমান উল্ল্যা,ওয়াজিউল্ল্যা,শাহ হরমুজ আলী,শিতালং শাহ,হাজী ইয়াসিনসহ মোট ৫৬ জনের নাম পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এই ভাষার উৎপত্তি গঠেছে প্রায় ত্রয়োদশ-চতূর্দশ শতাব্দীতে। তাই নাগরী লিপি ছয়শত বছরের পুরনো। সুফি-দরবেশদের আগমনে এই ভাষায় উৎপত্তি,আগমন কিংবা প্রচলন। আরবি+সংস্কৃত+বাংলা=নাগরী এটা বলেছেন অনেকে।
নাগরী গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন-‘সুফি-ফকির,দরবেশদের আগমনে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ছয়শ বছর আগে এই নাগরী লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। এই লিপি সে সময়কার সমাজ ও সংস্কৃতির অনবদ্য দলিল,অতিত ও ঐতিহ্য।’
গবেষক অধ্যাপক মো. আসাদ্দর আলী পীরের মতে-‘হযরত শাহজালাল (রাঃ) তাঁর ৩৬০ আউলিয়া নিয়ে শ্রীহট্ট (সিলেট) বিজয় করে ইসলামি রাষ্ট্র তথা খেলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের পর নতুন ভাষা সংস্কৃতি চালু করেন মুসলমানদের মধ্যে তখন এটি ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করে। বেশিরভাগ গবেষক এই মতবাদটিকেই সত্য মনে করেন।’
ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এই ভাষা চতূর্দশ শতাব্দীতে প্রচলিত হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে মোঘলদের দ্বারা তাড়িত হয়ে সিলেটে আগত আফগান পাঠানরা এই ভাষার প্রচলন শুরু করে।
আরেক গবেষণা মতে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সৃষ্ট সংস্কৃতবহুল বাংলার বিকল্ল রূপে সিলেটীরা এই লিপির জন্ম দেন।
সকল বিষয় পর্যালোচনা করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জফির সেতু বলেন-‘নাগরী কোন আঞ্চলিক কিংবা উপভাষা নয়। এটি স্বতন্ত্র ভাষা। তবে বাংলা ভাষার সাথে এর মিল আছে।’
সুতরাং সিলেটীদের ভাষা যে আলাদা আরেকটি ভাষা এটি নিয়ে কারো দ্বিমত পোষণ করার কোন কারণ থাকার কথা না।
বৃহত্তর সিলেট, কাছাড়,করিমগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় নাগরী লিপি সমাদৃত ছিল। নাগরী লিপির জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় ভারতের শিলচর,কলকাতা,আসামের কিছু এলাকায় কিংবা যুক্তরাজ্যের কিছু অংশে। বর্তমানেও ঐসব এলাকায় ছিলটী ভাষার প্রচলন আছে। বাংলা লিপি থেকে তুলনামূলক সহজ পাঠ্য নাগরী লিপি। এ লিপির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল যে নাগরী লিপি সম্পূর্ণ যুক্তাক্ষর বিবর্জিত। সিলেটের প্রবীণ লোকদের মতে, এই ভাষা পুংখানুপুংখভাবে আয়ত্তে আনতে সময় লাগতো মাত্র আড়াইদিন।
নাগরী লিপি সৃষ্টির পর সিলেটে এর মুদ্রণের প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমান সিলেট শহরের হাওয়াপাড়া নিবাসী মৌলভী আব্দুল করিম বন্দর বাজারে ১৮৭০ সালে ‘ইসলামিয়া প্রেস’ এ নাগরী ভাষার মুদ্রণ শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেটি উড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর মুদ্রণ হয় সিলেটের নাইওরপুলের ‘সারদা প্রিন্টিং পাবলিশিং’এ। ১৯৪৭ পূর্ববর্তীকালে কলকাতা ও শিলাইদহে নাগরী লিপির প্রেস ছিল। এরপর সিলেটের কয়েকজন লন্ডনে গিয়ে নাগরী লিপির সফ্টওয়্যার নিয়েও কাজ করেন। দুইজন বিদেশী নাগরী গবেষক নাগরী লিপির সুরমা ফন্টের কথা উল্লেখ করেন তাদের গবেষণায়। তাদের গবেষণা এবং বহির্বিশ্বে নাগরী লিপির প্রচারের জন্য তাঁরা এই লিপি বা সাহিত্যের জন্য ‘সুরমা ফন্টের’ উন্নয়ন করেন।
নাগরী লিপি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে অনেক গবেষণা হয়েছে। উদ্ধার ও সংগ্রহ করা হয়েছে নানা তথ্য। এগুলোর পেছনে ছিলেন দেশী-বিদেশী নানা গুণীজন, নানা প্রতিষ্ঠান। এজন্য আমরা নাগরী নিয়ে কিছু তথ্য পাচ্ছি, হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছি আরেকটি ভিন্ন ভাষাগত সংস্কৃতিকে। নাগরী লিপি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাধর্মী ইস্যু। কারণ এই লিপি থেকেই পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন দেশী-বিদেশী ভাষা গবেষক।
নাগরী লিপির উপর প্রথম যিনি পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি হলেন ড. গোলাম কাদির। তার গবেষণা শিরোনাম ছিল- ‘সিলেটী নাগরী লিপি ভাষা ও সাহিত্য’ এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক এই ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর নাগরী লিপির উপর ভারতের গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী নেন ড. মো. আব্দুল মোসাব্বির ভূঁইয়া এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন ড. মোহাম্মদ সাদিক।
এরপর নাগরীর উপর লন্ডনের সোয়াম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি নেন এক ব্রিটিশ দম্পতী ড. জেমস লয়েড উইলিয়াম ও ড. সু লয়েড উইলিয়াম। এরপর সম্মানসূচক পিএইচডি অর্জন করেন সাংবাদিক ড. মতিয়ার চৌধুরী, কলকাতার ড. রূপা চক্রবর্তী। এছাড়া বর্তমানে এই নাগরী নিয়ে গবেষণা করছেন আরও অনেকে। গবেষকরা নতুন করে তৈরী করছেন নাগরী সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্ম।
আগে নাগরী শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান ছিল কিন্তু এখন আর সেগুলো চোখে পড়ে না দেশের কোথাও। দেশের একমাত্র নাগরী প্রতিষ্ঠানটি হলো- ‘রাগীব-রাবেয়া নাগরী ইনস্টিটিউট’। তবে বিদেশের মাটিতে রয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
১) সিলেট একাডেমী ইউকে এন্ড ইউরোপ, ২) সিলেটী ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, বার্নিংহাম ৩) শ্রীহট্ট সম্মিলনী, কলকাতা, ভারত।
সিলেটী এই লিপির সংগ্রহ ও উদ্ধারকাজে বর্তমান প্রজন্মের একজন যিনি ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি লেখক ও গবেষক মোস্তফা সেলিম এবং তাঁর সাথে আছেন মো. আব্দুল মান্নান। যিনি তার সংগ্রহের নাগরী লিপির তথ্য নিয়ে ২৫ খন্ডের একটা সিরিজ বের করেছেন। এছাড়া তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান উৎস প্রকাশনী থেকে নতুন করে বের করেছেন নাগরী বিষয়ক ভিন্ন ও ঐতিহ্যবাহী বইসমূহ।
একবার চট্টগ্রামের এক ছোট বোনের সাথে কথা হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে সে আমাকে প্রশ্ন করলো- আমার কথায় কি চট্টগ্রামের টান আসে? আমার প্রতুত্ত্যর ইতিবাচক শুনে সে একটু প্রশান্তি পেল। আমার ইতিবাচক উত্তরটা মেকি ছিল বটে তবে তাকে খুশি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। বাংলাদেশের যে অঞ্চলের মানুষই হোক না কেন তার কথাবার্তার ধরনে আপনি কিছুটা হলেও তার আঞ্চলিকতার আন্দাজ করতে পারবেন। শুধু চট্টগ্রাম আর সিলেট নয় বাংলার ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভাষার প্রচলন আছে। এগুলো লোকমুখে বিকৃত বাংলা রূপ। এগুলো একেকটা অঞ্চলের প্রাণ। ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে এখান থেকে পাওয়া যাবে অমূল্য রতন। যেমনটা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে দেখা যায়। তাই কোন ভাষাকে ছোট করে দেখা কিংবা অবজ্ঞা করা নিজেকে অবজ্ঞা করার সামিল। তাই, আসুন আমরা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধরে রাখার নিমিত্তে এগিয়ে চলি।- সিলেটের ডাক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!