বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সামনে বৈরাগী বাজার (তিন)

ময়নূর রহমান বাবুল: লন্ডন থেকে এমিরেটস্ এয়ারলাইন্সের যে হাওয়াই জাহাজ বা এয়ারক্রাপ্টখানা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আসা-যাওয়া করে তা’হলো A380 – 800 দুতলা বিমান। বিশালকায় দেহ। নিচ এবং উপরতলা মিলিয়ে যাত্রী সংকোলানের ব্যবস্থা হাজার খানেক। লন্ডন থেকে যারা দুবাই যান আবার দুবাই থেকে আসেন তারা একটু অন্যরকম যাত্রীতো বটেই। তাদের জন্য এই সাত / সাড়ে সাত ঘন্টা ভ্রমনে এয়ারলাইন্সের আয়োজনও আলাদা।

অন্যদিকে দুবাই থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিমান বন্দর পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য এই একই এয়ারলাইন্সের এয়ারক্রাপ্ট ব্যবহার হয় Boeing 777 – 300 ER, দূরত্ব কম তাই সময় লাগে মাত্র সাড়ে চার ঘন্টা। ৯৯% যাত্রী বাংলাদেশী। তাও আবার পরিশ্রমী খেটে খাওয়া প্রবাসী লোকেরই আধিক্য। তারা দুবাই থেকে যখন বিমানে চড়েন সাথে থাকে দুবাই থেকে নিজের এবং আত্মীয় স্বজনদের জন্য নেয়া কাপড় চোপড়, কম্বল এবং অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর গাট্টী। এগুলো বিমানের মালামাল বহন অংশে নিলেও তাদের সাথে নিয়ে আসা হ্যান্ডব্যাগও থাকে বেশী। নিয়মের কোন বালাই নেই এখানে ! এয়ারলাইন্সের নিয়ম, যাত্রী প্রতি সর্বোচ্চ সাতকেজি ওজনের ছোট সাইজ একটা মাত্র হ্যান্ডলাগেজ নিয়ে বিমানে আরোহন করতে পারবেন। কিন্তু দুবাই থেকে ফেরা বাংলাদেশী যাত্রী তা মানবেন কেন ! তার বাড়িতে নিতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের উলের কম্বল। দুবাইয়ের ডিউটিফ্রি দোকানের নীডো গুড়োদুধ মশলাপাতি, আরো কতো কি ! অতএব কাঁধে ঝুলানো একটা ভারী ব্যাগ, হাতেটানা একটা ট্রলি তার উপর ভারী পলিথিনের তৈরী দুবাই ডিউটিফ্রি দোকানের বড় বড় কারিয়া ব্যাগ এবং কারো কারো সাথে পলিথিন ব্যাগে প্যাকেট করা একখানা রঙিন কম্বলও। বিমানের ভিতরে লকারে যা আর স্থান সংকোলানের কোনও উপায় নাই। বিমানের অভ্যন্তরে কর্মরত এয়ার হোস্টেস্ কর্মীগন এগুলো সামাল দিতে হীমসীম খান। বাইরে বোর্ডিং যারা দিচ্ছেন, সেই কর্মচারীগনও নানামূখী সমস্যার মধ্যে এসব লোকগনকে হ্যান্ডল করেন। যাত্রী মানেইতো কাস্টমার। আর কাস্টমার তো ভাগ্যলক্ষী। অতএব কী বলা বা কী করা যায় তাদের ! সম্ভবত: এভাবেই চলছে বিশ্বের প্রথম শ্রেণীর একটি পাঁচতারকা এয়ারলাইন্সের দুবাই ঢাকা যাতায়াত। এরকম যাতায়াতকালে এই এয়ারলাইন্সের যাত্রায় এখন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রা বিলম্বিত হয়। এটা অনেকটা নিয়মিত বিষয়ে পরিনত হয়েগেছে। ‘নটার গাড়ি ক’টায় ছাড়ে’ অবস্থা।

দুবাই ঢাকা যাত্রী সেবাটা যেন যাত্রীদের সাথে তাল মিলিয়েই ব্যবস্থা করা হয়। যাত্রীদের এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই। থাকার কথাও নয়। তারা ঢাকা পৌঁছতে হবে তাদের মাল সামানা সমেত। যে যত বেশী সামানা সাথে নিতে পারেন ততই খুশী। উড্ডয়নের পর থেকে অবতরনের পূর্ব পর্যন্ত যে যাত্রী সেবা দেয়া হয় তাতে দুবাই ঢাকা যাত্রীগনের কোন অভিযোগ নাই। যদিও লন্ডন বা আমেরিকা থেকে আসা সহযাত্রীদের কাছে সে সেবা অত্যাচারের পর্য্যায়েই পড়ে। যদিও একসময় এই লন্ডন আমেরিকা প্রবাসীদের পূর্বসূরীগনও এরকম মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আজকের প্রবাসীদের পথ সুগম করে দিয়ে গেছেন। খাবার এবং পানীয়তে দুবাই যাত্রীগন খুবই সন্তুষ্ট। অনেকেই এই সুবাদে অনেকদিন পর একটু নেশাজাতীয় পানীয়ের ছোট বোতল ফ্রি পেয়ে খুবই কৃতার্থ মনে করেন।

এর মধ্যে দু’চারজন আবার সাধারন জল বা পানি চেয়ে নিয়ে পান করেন। সেও এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ! কোন এক যাত্রী এয়ার হোস্টেস্ এর কাছে চাইলেন তিনি ‘মাম’ পান করবেন। গিভমী মাম’ – তার এ জাতীয় উচ্চারনে এয়ার হোস্টেস্ বেয়াক্কেল বনে যান। দাঁড়িয়ে থাকেন অথবা অঙ্গ ভঙ্গি করে ‘মাম’ জিনিষটা কি তা বুঝার চেষ্টা করেন। তার ভাগ্য-লক্ষী যাত্রীটির মনের কথাটি পড়তে চেষ্টা করেন। আমাদের যাত্রী ভাইটির কাছে বোতলে রাখা মিনারেল ওয়াটার বা বোতলের সাদা জল যে ‘মাম’ই হয় এটা এয়ার হোস্টেস্ বুঝবেন কিভাবে ? আমাদের যাত্রীর যেদিন থেকে বোতলে পানি দেখেছেন, বোতলের পানি পান করেছেন, সেদিন থেকেই বোতলের গায়ে ‘মাম’ লেখা এর নাম পড়েছেন। অতএব পৃথিবীর সকল বোতলের পানিই ‘মাম’ই হবে !

এয়ার হোস্টেস্ দেরীতে হলেও ‘মাম’ যে বোতলের পানি এটা বুঝতে পারেন, তখন উৎফুল্ল চিত্ত্বে বোতল থেকে ঢেলে এক গ্লাস পানি দিয়ে তার ভাগ্যলক্ষী যাত্রীকে অতি আদরের সাথে বলেনঃ এই নিন আপনার মাম। আর ইউ হ্যাপী উইথ ইয়র মাম ?

জলখাবার শেষে এক গ্লাস পানি এক ঢুকে পান করে আমাদের যাত্রী পরম তৃপ্তীর সাথে একটা ঢেকুর তুলেন আর বিমানের ডিম্বাকৃতির ছোট উইন্ডো দিয়ে তাকিয়ে মেঘের সাদা সাদা পেঁজা তুলার স্থুপ দেখে দেখে অনুমান করতে চেষ্টা করেন ঢাকা আর কতো দূর ? ঢাকা নেমে বিদেশ থেকে আনা তার রশিদিয়ে সুন্দর করে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে বাঁধা লাগেজ বাক্স পেটরা গাট্্ির বোচকাগুলো নিয়ে তাকে আবার বাস ধরে যেতে হবে অনেক দূর। রাস্তায় থেমে থেমে সে বাস এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। যেতে যেতে এক সময় রাস্তার পাশে জংধরা ঝড়ে হেলে পড়া টিনের সাইনবোর্ডে লিখা দেখা যাবে ‘সামনে বৈরাগী বাজার’। তখন খুব খুশীতে, পরম তৃপ্তীতে গাড়ির কাঠের তক্তার সিঁড়িতে পা রেখে নামবেন বৈরাগীর বাজার। ফুলবানুকে রেখে গিয়েছিলেন এক কুঁড়েঘরে মা-বাবার সাথে আজ থেকে তিন বছর আগে, এই বৈরাগী বাজারে…

ময়নূর রহমান বাবুলঃ কবি ও গল্পকার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!